এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারত: তানজিনা হোসেনের গল্প

“আরে আপনি?”

ধানমন্ডি লেকের পাড় ধরে জোরে জোরে হাঁটছিলেন নাজমা নাসরিন।  ডাক্তার বলেছেন হাঁটা এমন হওয়া চাই যেন হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, ফুসফুসের কাজ বাড়ে।  ঘাম ঝরতে শুরু করে। তা না হলে সুগার কোলেস্টেরল কমবে না।  ক্যালরিও বার্ন হবে না।  শব্দ দুটি শুনে তাই গতি কমিয়ে থামতে সময় লাগলো।  বিরক্তও হলেন একটু। হাঁটার সময় গল্পগুজব করলে লাভ হয় না। মনোনিবেশ ও একাগ্রতা নষ্ট হয়।লেকে একমাত্র তাঁরই কোন হাঁটার পার্টনার নেই। এত বছর ধরে হাঁটছেন, তবু কারও সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে নি।  এখানে সকাল বিকাল হাঁটা লোকেদের আলাদা আলাদা গ্রুপ আছে, ক্লাব আছে। সমিতি আছে। তারা একসাথে গল্প করে, আড্ডা দেয়, মিলিয়ে শাড়ি বা জামা পরে, কখনো পিকনিক পিঠা উৎসবও হয়। নাজমা নাসরিন এই সব দলে নেই। তিনি হাঁটেন স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। নিয়ম মেনে, প্রার্থনার মত করে। আর হাঁটা শেষে একটুও সময় নষ্ট করেন না।  হন হন করে ধানমন্ডি পাঁচ নম্বরে তাঁর বাড়ি ফিরে যান।  এই সব ফালতু আলাপে তাঁর তেমন আগ্রহ নাই। সেই তাঁকে কে পেছন থেকে ডাক দেবে এই অবেলায়?

পেছন ফিরে তাকিয়ে নাজমা অবশ্য একটু খুশিই হলেন।  গত পরশু সোনালী ব্যাংকে দেখা হয়েছিল ভদ্রলোকের সঙ্গে।  সঞ্চয়পত্রের টাকা তুলতে গিয়ে ভয়ানক ভিড়ের মধ্যে পড়েছিলেন নাজমা। বরাবরই ওখানে এমন ভিড় হয়, কিন্তু সেদিন বৃহস্পতিবার ছিল বলে ভিড়টা একটু অস্বাভাবিক রকম বেশি ছিল। নাজমার শরিরটা খারাপ লাগতে শুরু করেছিল বারোটার দিকে। বসার জায়গা ছিল না কোন, সবগুলো চেয়ার বয়স্ক বৃদ্ধ মানুষ দিয়ে ভর্তি।  আসলে তাঁর মতো অবসরপ্রাপ্তদের ভরসার জায়গা এই সঞ্চয়পত্র অফিস। পেনশনের বা প্রভিডেন্ড ফান্ডের সব টাকা সঞ্চয়পত্র করে মাসে মাসে তার মুনাফা দিয়েই বেশির ভাগের সংসার চলে। মাসের শেষে তাই এই অফিসে ভিড় হয় প্রচন্ড।  তো মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠার কারণে নাজমা টেবিলের কোণা ধরে বসে পড়ার চেষ্টা করছিলেন। দর দর করে ঘাম বেয়ে পড়ছিল কপালের দু ধার দিয়ে। হাইপো হচ্ছে-বেশ বুঝতে পারছিলেন তিনি। এগারোটার সময় কিছু না খেলে তার হাইপো হয়। সকালে ইনসুলিন নিয়েছেন। কেন যে ব্যাগে কোন খাবার আনা হয় নি তাড়াহুড়ায়। ঠিক সেই সময় ভদ্রলোক একটা চকলেট এগিয়ে দিলেন-আপনার মনে হয় খারাপ লাগছে। এটা খান।

চকলেটটা মুখে পুরে ভাল লাগলো একটু।  ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিতে না দিতেই পরের টেবিলে তাঁর ডাক পড়লো সই দেবার জন্য।  ফিরে এসে দেখেন ভদ্রলোক নেই, চলে গেছেন। যাক, এবার তাহলে ভাল করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার সুযোগ মিললো। তিনি হাসিমুখে বললেন-ওহ আপনি। আপনি এখানে হাঁটেন? কখনো খেয়াল করি নি।

ভদ্রলোক হেসে বললেন-ডায়াবেটিসের রোগিদের ব্যাগে সব সময় চকলেট রাখতে হয়।

একটু লজ্জা পেলেন নাজমা-জানি। সেদিনই নেয়া হয় নি ভুল করে। আপনি না থাকলে মনে হয় অজ্ঞান হয়ে যেতাম! আপনারও ডায়াবেটিস আছে নিশ্চয়।

-থাকবে না? বয়স প্রায় পয়ঁষট্টি হতে চললো। এখন তো আমার তেতাল্লিশ বছরের ছেলেরই ডায়াবেটিস।

ওড়নার খুঁট দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন নাজমা-চলেন ওদিকে গিয়ে একটু বসি। খুব গরম লাগছে।  আজ একটুও বাতাস নাই।

গাছের ছায়ায় একটা বেন্চিতে বসলেন দুজন। নাজমা নাসরিন ইডেন কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলা সাহিত্য পড়াতেন। আর রায়হান অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ। নাজমার একটিই মেয়ে, সুমি, আমেরিকার ফ্লোরিডায় থাকে। মেয়ে জামাই দুজনই বুয়েট থেকে পাশ করেছে। আর রায়হান সাহেবের ছেলেমেয়ে দুজন। মেয়ে থাকে অষ্ট্রেলিয়ায়, আর রায়হান সাহেব থাকেন ছেলের সাথেই। ছেলে ব্যারিস্টার। পরিচয় পর্ব শেষ হলে দুজনে এক ঠোঙা বাদাম কিনলেন। বাদাম ছিলে খেতে খেতে অনেক গল্প করলেন তাঁরা। সবই অপ্রয়োজনীয় আলাপ। যেমন-রায়হান বললেন যে এই বাদামগুলোর অর্ধেকই থাকে নষ্ট, বাঙালির আসলে ব্যবসার বুদ্ধি বা নীতি কোনটাই নাই। আর নাজমা বললেন এই যে শিশুগুলো পার্কে বাদাম বেচে, আসলে এদের বাপ মা এত গরিব নয় যে তাদের স্কুলে পাঠাতে পারবে না। আর বিনা পয়সার স্কুলও তো আছে। কিন্তু এদের বাবা মার সেই সদিচ্ছাটাই নেই। রায়হান বললেন যে তিনি তাঁর গ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুল দিয়েছিলেন, কিন্ত ভিলেজ পলিটিক্স এর জন্য বেশিদিন চালাতে পারেন নি। এই দেশে ভাল কিছু করতে গেলেও লোকে পেছনে লাগে।  নাজমা তখন জিজ্ঞেস করলেন রায়হানদের গ্রাম কোথায়। রায়হান বললেন-মানিকগন্জ। তারপর একই প্রশ্ন করলেন তিনিও। নাজমা বললেন-ময়মনসিংহ। শুনে বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন রায়হান। জানালেন যে ময়মনসিংহে তাঁর এক সময় পোস্টিং ছিল। ময়মনসিংহের জাম আলুর ভর্তা আর চ্যাপা শুঁটকি-উফ, তার স্বাদ এখনও জিভে লেগে আছে! দু:খ করে তিনি বললেন যে ঢাকা শহরে জাম আলু পাওয়া যায় না। শুনে নাজমা বললেন-আমার বাড়িতে জাম আলু আছে। কবে খাবেন বলেন। তার উত্তরে রায়হান হে হে করে হাসতে হাসতে বললেন-আমি যে খেতে ভালবাসি তা নিশ্চয় আমার ভূঁড়ি দেখেই বুঝতে পেরেছেন। খাওয়ার ব্যাপারে আমার কোন না নাই। যখন বলবেন তখনই হাজির হব।  এই ভাবে তাঁদের দুজনের বেশ ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তাঁরা পরস্পরের ফোন নম্বর বিনিময় করলেন। ফেসবুকে যুক্ত হলেন। সেদিনের পর থেকে এত বছর পর নাজমার একজন হাঁটার পার্টনার জুটলো।  পরদিন থেকে তাঁরা দুজনে এক সাথে হাঁটা শুরু করলেন।  আমাদের গল্পের শুরুও এখান থেকে।

তো গল্পের ভূমিকা পর্ব শেষে লেকে হাঁটতে হাঁটতেই একদিন রায়হান নাজমার কাছে তাঁর স্বামীর কথা জানতে চাইলেন। তিনি কি করতেন, কেমন মানুষ ছিলেন, কবে মারা গেলেন ইত্যাদি। নাজমা তাঁর বিখ্যাত অর্থপেডিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক স্বামীর গল্প বললেন। কী ভীষণ ব্যস্ত মানুষ ছিলেন তিনি। মেডিকেল কলেজের ক্লাস, পরীক্ষা, সভা সেমিনার, চেম্বার, রাউন্ড তাঁর সমস্ত জীবন ভরে রেখেছিল। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের সেখানে বেশি স্থান ছিল না।  নাজমার জীবন তাই মেয়ে সুমিময়। মেয়েরও তাই। আমেরিকা যাবার পর থেকেই মেয়ে তাই অস্থির হয়ে আছে। মাকে ছাড়া থাকা তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। মায়ের জন্য গ্রিনকার্ডের আবেদন করে রেখেছে।  নাজমারও এখানে ভীষণ একা লাগে। আবার মেয়ের সংসারে গিয়ে থাকতেও মন চায় না। মেয়ে শুনে বকে-এই সব পুরনো দিনের কথাবার্তা বলো না তো আম্মু। মেয়ের সংসার আর ছেলের সংসার আবার কি? কী ব্যাকডেটেড কথা!

রায়হান তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন-আপনি কিন্তু মূল প্রসঙ্গ থেকে দূরে চলে গেছেন!

নাজমা অবাক হয়ে বললেন-কি?

-আমি আপনার স্বামীর কথা জানতে চাইছিলাম।

-বললামই তো।

-এইটুকু?

-আশ্চর্য! আর কি জানতে চান?-নাজমা বিরক্ত হলেন একটু।

-তাঁর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?

-মানে? এটা কি রকম প্রশ্ন?

রায়হান হা হা করে হাসলেন অনেকক্ষণ-বাহ। এত বছর একসাথে সংসার করলেন, এটা বলতে পারবেন না? আচ্ছা আপনি তাঁকে ভালবাসতেন?

নাজমা চুপ করে গেলেন। কখনো ভেবে দেখেন নি। ভালবাসা? লোকটা কি ভালবাসার অর্থ জানতো? ছাত্ররা তাঁকে ঈশ্বরতুল্য জ্ঞান করতো। ডাক্তার সমাজ অভিভাবক মানত তাঁকে। শ্রদ্ধা, সম্মান, সমীহ এই সব তিনি নিজের প্রাপ্য বলেই ধরে নিয়েছিলেন।  যাকে ইংরেজিতে বলে গ্রান্টেড। কিন্তু ভালবাসা? নাজমার ভালবাসাও কি তিনি গ্রান্টেডই ধরে নিয়েছিলেন?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি-জানেন, আমি তো বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী ছিলাম। আমি ভাবতাম বিয়ের পর স্বামীরা স্ত্রীদের নাটক দেখতে নিয়ে যায়।  বৃষ্টিমুখর বিকেলে স্বামী স্ত্রী বসে চা খেতে খেতে রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনে।  মাঝে মাঝেসমুদ্রে বেড়াতে যায় আর নীল শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়িয়ে ছবি তোলে।  হি হি হি।  মফস্বলের কলেজের বাংলার ছাত্রী হলে যা হয়।  সব ন্যাকা ন্যাকা চিন্তা ভাবনা!

-কখনো বেড়াতে যান নি ওঁর সাথে?-আগ্রহ ভরে জিজ্ঞেস করেন রায়হান।

-অনেক বার। ইউরোপ। আমেরিকা। ভারত।  থাইল্যান্ড। কিন্তু উনি থাকতেন সেমিনার আর বক্তৃতা নিয়ে। আমরা মা মেয়ে ঘুরতামনিজেদের মত করে।  শপিং করতাম।  জানেন, মেয়েই আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু।

কথা বলতে বলতে ধানমন্ডি লেকের বিকেলের বাতাস কেমন বিষন্ন হয়ে উঠল।  পায়ের কাছে ঝরে পড়ল কয়েকটা মরা পাতা।  একটা পেট মোটা গর্ভবতী বাদামি বেড়াল হেঁটে গেল তাঁদের সামনে দিয়ে হেলেদুলে। রায়হান সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন-আমার সাথে নাটক দেখতে যাবেন? হ্যামলেট?

নাজমা অবাক হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর হেসে বললেন-কেন নয়?

সেদিন সকাল থেকেই রায়হানের উৎকন্ঠা চোখে পড়ছিল তাঁর ছেলের। বাবা যেন কোথায় যাবেন, গাড়ি দরকার। কালই বলে রেখেছেন, মুবিন ড্রাইভারকে সেকথা বলেও রেখেছে।তবু বাবা সকাল থেকে তিন চার বার জিজ্ঞেস করে ফেলেছেন ড্রাইভার কখন আসবে।ময়নার মা এখনও তাঁর নতুন আড়ং এর পান্জাবিটা কেন ইস্ত্রি করে নি তা নিয়েও এক পশলা রাগ করে ফেলেছেন। শেষ পর্যন্ত মুবিন বাধ্য হয়ে জিজ্ঞেস করল-কোথায় যাবে বাবা? দাওয়াত? কার বাসায়?

-না না দাওয়াত না। অন্য একটা কাজ। উফ দেরি হয়ে যাচ্ছে। মুন্নি আমার কাশ্মিরী শালটা দেখছো? ওই যে যেটার বর্ডারে সিল্কের সূতার কাজ করা।

ওদিকে নাজমারও সকাল থেকেই কেমন অস্থির লাগছিল। কোন শাড়িটা পরবেন ঠিক করতে পারছিলেন না। শেষে হালকা নীল একটা শাড়ি বের করলেন।  এই শাড়িটা সুমির পানচিনি উপলক্ষে কিনেছিলেন কলকাতার দক্ষিণাপন মার্কেট থেকে।  মাদ্রাজি কটন নীলশাড়িটা পরে আয়নায় নিজেকে দেখলেন অনেকক্ষণ।  পার্কে নিয়মিত হেঁটে কয়েক কেজি ওজন কমেছে। গলার নিচে আর কোমরের কাছে যে বিশ্রি চর্বি জমেছিল তাও দূর হয়েছে।  ড্রেসিং টেবিল থেকে ভিকটোরিয়া সিক্রেট এর দামি পারফিউম নিয়ে গলার কাছে স্প্রে করেভ্যানিটি ব্যাগ হাতে নিতেই সুমি হোয়াটস আপ এ কল করল। মাকে দেখে অবাক হয়ে বলল-তুমি কি কোথাও যাচ্ছ আম্মু?

বিব্রত ভঙ্গিতে হাসলেন নাজমা-হ্যাঁ। পুরনো কলিগদের একটা গেট টুগেদার।

শুনে খুশি হল মেয়ে-খুব ভাল। আমি তো তোমাকে বলি একটু সোশালাইজ করো। বন্ধুদের সাথে মিশো। এই দেশে বয়স্করা যে তাদের রিটায়ার্ড লাইফকে কীভাবে এনজয় করে বিশ্বাস করবে না। আম্মু, ইউ আর লুকিং গ্রেট।

-থ্যাংক ইউ।

-ওকে। তোমার দেরি করাবো না। একটা গুড নিউজ দিয়ে রেখে দিচ্ছি। তোমার কাগজ এসে গেছে আম্মু। আর তোমাকে একা থাকতে হবে না। আগামী মাসের ষোল তারিখ আমার ফুফুশ্বাশুড়িকে আনতে ওনার ছেলে ঢাকা যাচ্ছে। ওদের সাথেই তোমার টিকিট বুকিং দিয়ে দিচ্ছি। তুমি বেড়াতে যাও এখন। কাল কথা বলব।  শুনব কেমন মজা করলে।  ছবি দিও কিন্তু।  বাই।

সেদিন হ্যামলেট দেখতে দেখতে বার বার আনমনা হয়ে পড়ছিলেন নাজমা। ব্যাপারটা রায়হানের চোখ এড়ায় নি। নাটক শেষে বাইরে এসে রায়হান জিজ্ঞেস করলেন-আপনার নাটক ভাল লাগে নি?

-ভাল লেগেছে।

-কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন।

-আচ্ছা এই যে লেডি হ্যামলেট তার স্বামীর হত্যাকারীকে ভালবেসেছিলেন, এটা কি তার পাপ?

রায়হান হাসলেন-পাপ কেন হবে। এটা তার ডেসটিনি। শেক্সপীয়ারের নাটকে ডেসটিনি সবচেয়ে বড় নায়ক। কঠিন কঠোর নির্দয় ডেসটিনি।

নাজমা মন খারাপ করে বললেন-আমাদের সকলের জীবনেই তাই।

-কি হয়েছে আপনার আজকে? এত বিষন্ন কেন!

-আপনাকে জাম আলুর ভর্তা খাওয়ানো হল না। বলেন কবে খাবেন।

-মঙ্গলবার।দুপুরে। রাতে আমি কার্ব খাই না।  রায়হান উৎসাহিত হলেন।

-আর কি কি পছন্দ।

-গরুর মাংস খুবই পছন্দ। কিন্তু হার্টে রিং পরা যে! তবু দুয়েক টুকরো খেতে পারি।  চর্বি ফেলে দিয়ে রান্না করবেন।  আরপাবদা মাছের ঝোল। সাথে বেগুনের টক। আর কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি। ব্যস।  শুঁটকি খাওয়া বারণ।  লবণ বেশি তাই প্রেশার বাড়ে।

নাজমা হাসলেন-বেশ, সব হবে।

রায়হানের উৎসাহের কমতি নেই-আমি আপনাকে বাজার করে দিতে পারি। আমি খুবই ভাল বাজার করি। বাজারের সেরাটা আমার নজর এড়ায় না।  আর মোহাম্মদপুর বাজারের সব দোকানিও আমাকে চেনে।  বিশেষ করে গরুর মাংস ভাল করে চিনে কিনতে না পারলে সর্বনাশ!

-তাহলে তো খুবই ভাল হয়।

-বাহ। তবে সেই কথা রইলো। আমি সকালবেলা বাজার করবো। আপনার বাসায় আমার ড্রাইভার সেই বাজার পৌঁছে দিয়ে আসবে। আমি পরে ধীরে সুস্থে দুপুরবেলা সেজেগুজে খেতে আসবো। ঠিক আছে?

এইভূঁড়িভোজের পর দুই দিন নাজমা ধানমন্ডি লেকে হাঁটা মিস করলেন। চিন্তিত হয়ে পড়লেন রায়হান। অতিরিক্ত পরিশ্রমে অসুস্থ হয়ে পড়লেন না তো? নাহ, ভদ্রমহিলার ওপর অত্যাচারই হয়ে গেল।  কিন্তুকী আশ্চর্য, নাজমা নেই বলে এই দুদিন ধানমন্ডি লেক কেমন সাদাকালো বর্ণহীন মনে হতে লাগল রায়হানের।  ঝরা পাতাগুলোর রং কেমন বিবর্ণ।  লেকের ধার ঘেঁষে তরুন তরুণীদের কোলাহল কেমন বিরক্তিকর।  শেষ পর্যন্ত দ্বিধা দ্বন্দ ছুঁড়ে ফেলে ফোন করলেন তিনি রাতে-কী হল? আপনি কি অসুস্থ নাকি?

-আর বলবেন না।এম্বেসির কাগজপত্র রেডি করতে হল এক গাদা।  অনেক ছোটাছুটি গেল।  পরশুদিন দাঁড়াবো। আর শরিরটা একটু খারাপও বটে।

-কি হয়েছে? -রায়হানের উৎকন্ঠিত স্বর। নাজমা একটু ইতস্তত করলেন প্রথমে। তারপর বলেই ফেললেন-ইউরিনে ইনফেকশন মনে হয়। গত দুদিন পানি একটু কম খাওয়া হয়েছে।  খুব অস্বস্তি হচ্ছে।

রায়হান ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন-ডায়াবেটিস এর রোগীদের ইউরিন ইনফেকশন মোটেও ভাল নয়। ঠিক সময় এন্টিবায়টিক না পড়লে সেপটিসেমিয়া হয়ে যায়। কাল আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। আমার ডাক্তারটি খুব ভাল। আমি এখনই এপয়েন্টমেন্ট করে নিচ্ছি।

তরুণ ডাক্তার বেশ কিছু টেস্ট করতে দিল নাজমাকে।  সিবিসি, সুগার, ইউরিন কালচার। বলল যে এন্টিবায়টিক টেস্ট করতে দেবার পর শুরু করে দিতে হবে। আর কালচারের রিপোর্ট পাবার পর আসল সিদ্ধান্ত।  তারপর একটু হেসে বলল-রিপোর্ট আপনার হাসবেন্ডকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেও হবে।

নাজমা একটু চুপ থেকে বললেন-উনি আমার হাসবেন্ড নন।

-তাহলে? ডাক্তারটির চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

-আমরা বন্ধু-এবার উত্তরটা দিলেন রায়হান। ডাক্তারের চোয়াল ঝুলে পড়ল এবার। তাড়াতাড়ি  নিজেকে সামলে নিয়ে বলল-ও আচ্ছা। যে কেউ এসে রিপোর্ট দেখিয়ে নিলে হবে। আর পানি খাবেন অনেক।  রেস্ট নেবেন।

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে রায়হান খুব করে হাসলেন-দেখলেন তো ছোকরা কেমন চমকে গেল? আরে ওদের যদি বন্ধু বান্ধব থাকতে পারে, ওরা যদি এক সাথে ঘুরতে পারে, তাহলে আমরা কেন নয়? বলেন দেখি।  নাকি বন্ধুত্ব জিনিসটা খালি কমবয়সীদের সম্পত্তি?

নাজমা গাড়িতে বসে একটু গম্ভীর হয়ে বললেন-আমরা কি সত্যি শুধু বন্ধু?

এবার রায়হানের চোয়াল ঝুলে পড়ার পালা। খানিক ক্ষণ চুপ থেকে হা হা করে হাসলেন তিনি-আপনি তো সাংঘাতিক মানুষ! পুরাই ভড়কে দিলেন আমাকে।

-উত্তর পাই নি কিন্তু।

-একথার উত্তর দেবার সময় এখনও আসে নি নাজমা ম্যাডাম। -আবারও হা হা করে হাসলেন রায়হান।

সেরাতে নাজমা অনেকক্ষণ বারান্দায় বসে রইলেন। কত কিছু মনে পড়ল তাঁর। সুমির জন্মের পর খুব কমই হাসনাত তাঁর সাথে শুতেন।  অনেক রাত অব্দি অপারেশন করে ক্লান্ত হয়ে ফিরে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়তেন হাসনাত।নাজমাকে সচরাচর ডাকতেন না। কারণ তাঁকে আবার ভোরবেলা উঠে মেডিকেলে যেতে হত। খুবই ডিসিপ্লিনের মানুষ ছিলেন তিনি, ঘড়ি ধরে অন্তত ৬ ঘন্টা ঘুম তাঁর দরকার।  অথচ নাজমা জেগেই রইতেন তাঁর ডাকের জন্য।  কালে ভদ্রে কখনো একটু আগে আগে এসে পড়লে নাজমাকে ডাকতেন হাসনাত। তড়িঘড়ি করে কাজ সেরেই পাশ ফিরে শুয়ে পড়তেন নাক ডেকে। হাসনাতের সঙ্গে ব্যাপারটা কখনোই এনজয় করেন নি নাজমা। অথচ গল্প উপন্যাস সিনেমায় এই জিনিস নিয়ে কত রোমাঞ্চ। কত আদিখ্যেতা।

কিন্তু এই বয়সে এসে এসব কী উল্টা পাল্টা ভাবনা হচ্ছে তাঁর? আচ্ছা, আজ শিল্পকলায় নাটক দেখার সময় রায়হান কি এক মুহুর্তের জন্য তাঁর হাতে হাত রাখতে পারতেন না? তিনি কি সরিয়ে নিতেন হাত? রায়হান কি তাঁকে কেবল বন্ধুই ভাবেন? আর কিছু নয়? লেকের পাড়ে দেখা হলে রায়হানের কি বুকটা ধক করে ওঠে না কখনই, যেমনটা তাঁর হয়?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নাজমা।  তারপর ঘুম না আসায় কল দিলেন মেয়েকে। সুমি অবাক হল-আম্মু! এত রাতে জেগে আছ? শরির খারাপ?

-নারে। ঘুম আসছিল না।  আচ্ছা সুমি, আমি যদি আমেরিকায় না যাই?

শুনে সুমি কাঁদতে শুরু করে দিল-এসব তুমি কি বলছ আম্মু? সব কিছু গুছিয়ে এনেছি, টিকিটও কাটা হয়ে গেছে। তুমি ঢাকায় একলা থাকো, আমার যে কি টেনশন হয় তুমি বুঝো না।

নাজমা ফিসফিস করে বললেন-আমি এখানে একা না সুমি।

-মর্জিনা বুয়া আর ম্যানেজার কাকা তোমার আপন মানুষ হল? আমার চেয়ে? আম্মু প্লিজ এসব কথা মাথায় এনো না। দেখো এখানে এলে তোমার ঠিক ভাল লাগবে। তুমি আসার পর আমি বাচ্চা নেবো ভাবছি। আম্মু প্লিজ কনসিডার মি।

নাজমা ফোন রেখে সারারাত এপাশ ওপাশ করলেন।  তাঁর ঘুম এল না।  পরদিন সে কারণে যখন শরিরটা পরিশ্রান্ত লাগছে খুব, হাঁটতে যেতে ইচ্ছে করছে না তেমন, চোখ জুড়ে ঘুম না হবার ক্লান্তি,  তখনই রায়হান ফোন করে খুশি খুশি গলায় বললেন-আমার ছেলে বউমা আমার পয়ঁষট্টিতম  জন্মদিন পালন করবে। পুরনো বন্ধু বান্ধব কলিগদের লিস্ট করেছে। আমি আপনার নামও বলেছি। ওরা আপনাকে দাওয়াত করবে।

নাজমা চিন্তিত হয়ে বললেন-এটা কি ভাল হল?

-ভাল মন্দ জানি না। আপনাকে আসতে হবে। এটাই আমার কথা।

সেই জন্মদিনের অনুষ্ঠানটিই কাল হল। গোটা অনুষ্ঠানে রেস্টুরেন্টে নিজেকে অবাঞ্চিত মনে হতে লাগল নাজমার। রায়হাননাজমাকেপরিচয়করিয়েদিলেনতাঁরবন্ধুহিসেবে। আসরের প্রত্যেকে আড়চোখে তাকাল তাঁর দিকে, ফিসফিস করল নিজেদের মধ্যে। রায়হানের দুয়েকজন বন্ধু হাসাহাসি রসিকতাও করতে ছাড়ল না। গোটা সময় মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর করে রাখল মুবিন। নাজমা পরে শুনেছেন, পরদিন সকালেই নাকি ছেলে চড়াও হয়েছিল বাবার ওপর-বাবা এর মানে কি? ড্রাইভার মিজান বলল তুমি নাকি ওই মহিলাকে নিয়ে নাটক দেখতে গেছিলা?

-হুম-গম্ভীর স্বরে বললেন রায়হান।

-ওর বাসায় খেতে গেছ একদিন? ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছ?তাকে বাজার করে দাও মাঝে মাঝে?

-হ্যাঁ।

-বাবা তুমি বুঝতেছ না এই টাইপের এই বয়সী একটা মহিলা কি চায়? নিশ্চয় তোমার এই বাড়ি! আর ব্যাংকের টাকাগুলা। সঞ্চয়পত্র। এই তো।  আর কী চাইবে?তোমার পিছনে লাগছে, সব হাতিয়ে নিয়ে পালাবে।  এই তো ধান্দা।

-একজন ভদ্রমহিলা সম্পর্কে না জেনে এভাবে বল না মুবিন। -রায়হান গম্ভীর স্বরে বললেন।

-ভদ্রমহিলা? এই রকম মহিলাকে তুমি ভদ্রমহিলা বল?-মুবিন চেঁচিয়ে ওঠে।  এক পর্যায়েমুন্নি এসে তাকে থামায়-আহ চুপ কর।

-কেন চুপ করব? একটা বাজে মহিলা বাবার পেছনে লাগছে সম্পত্তির লোভে, দেখ এই মহিলার জন্য বাবা আমাদের সবাইকে বঞ্চিত করবে, বুড়ো বয়সে এসে…..ইত্যাদি ইত্যাদি।

রায়হানের তখন আজ থেকে একুশ বছর আগের কথা মনে পড়ে। মুবিন তার বন্ধুর বোনের প্রেমে পড়েছিল। ওরা ছিল গরিব, মেয়েটার বাবা গ্রামে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক।  মেয়েটা রোকেয়া হলে থাকত।  খুবই সাধারণ একটা মেয়ে, কিন্তু মেধাবী, আর খুবই লক্ষী।  ব্যাপারটা জানতে পেরে রেগে গিয়ে মুবিনের মা ঠিক এই সব কথা বলছিল। তুই বুঝতে পারছিস না পাজি মেয়েটা সম্পত্তির লোভে তোর পেছনে লেগেছে। ওদের সাথে আমাদের কখনো মিলবে না।মুবিন।

মুবিনও গোঁ ধরে ছিল এই মেয়েকেই বিয়ে করবে। কিন্তু মুবিনের মায়ের সাথে পেরে ওঠা মুশকিল। তিনি মহা হট্টগোল সৃষ্টি করলেন। রোজ কান্নাকাটি, সিন ক্রিয়েট।  ঝগড়া ঝাঁটি।  তারপর তাঁর পালস ইররেগুলার হয়ে যেতে থাকল। রায়হান তাঁকে নিয়ে চেন্নাই গেলেন চিকিৎসা করতে।  তার বুকে পেসমেকার বসানো হল। অবশেষে মুবিনকে হার মানতে হল। মুবিনের জন্য জাস্টিস সোবহানের সুন্দরী কন্যা মুন্নিকে পছন্দ করে আনলেন তিনি।  খুবই ধুমধাম করে বিয়ে হল মুবিনের। কিন্তু বিয়ের আগের দিন বাবার পায়ের কাছে বসে মুবিন হু হু করে কেঁদেছিল। বাবা হিসেবে তিনি কেবল তার মাথায় হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দিয়েছিলেন।,

এত বছর পর মুবিন তার মায়ের কথাগুলোই হুবহু রিপিট করে যাচ্ছে। আশ্চর্য।! রায়হানের ইচ্ছে করল তাকে সেকথা মনে করিয়ে দেন, কিন্তু মুন্নি মেয়েটা বড় ভাল। ওকে শুধু শধু কষ্ট দিয়ে কি লাভ?

নাজমারও আমেরিকা যাবার তারিখ এগিয়ে এসেছে। রায়হান পরদিন লেকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন-আমি কি আপনাকে বিদায় দিতে এয়ারপোর্ট যেতে পারি?

নাজমার সুমির কথা মনে পড়ল। কাল রাতেই মেয়ে কঠিন গলায় বলেছে-আম্মু, ওই ভদ্রলোককে কিন্তু এয়ারপোর্ট যেতে নিষেধ করবে। আমার ফুপুশ্বাশুড়ি থাকবেন। কি না কি ভাববেন।  প্লিজ আম্মু।

নাজমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-না, থাক।

-আমি কাছে যাব না। দূরে দাঁড়িয়ে থাকব। রায়হান আকুল হয়ে বলেন।

নাজমার চোখ জলে ভরে যায়। ধানমন্ডি লেকের পানি ঝির ঝির করে বয়ে চলে। পাখিরা ডানা ঝাপটে বাড়ি ফিরছে। সন্ধ্যা নেমে আসায় একে একে জ্বলে উঠছে হলুদ বাতি। বাতাসে ঝরা পাতার শব্দ।  দুয়েকটা অন্ধকার কোণে জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে তরুণ তরুণীরা। কারো হাত আরেকজনের পিঠ জড়িয়ে, কারো মুখ গোঁজা সঙ্গীর কাঁধে।  বয়স্করা এসব না দেখার ভান করে কেডস পায়ে সামনের দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগে হেঁটে চলেন। নাজমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন-ফেরার সময় হল।  উঠি।

রায়হান তখন তাঁর হাতের ওপর নিজের হাত রাখলেন। দুজনের হাতের চামড়ায় বয়সের ছাপ।  রগ বেরিয়ে আসছে, ত্বক কুঁচকানো।  কিন্তু রায়হানের স্পর্শে যেন কারেন্টের শক খেলেন নাজমা। মুখ কপাল ঘেমে উঠল তাঁর।  মেনপোজের পর থেকেই তাঁর হট ফ্লাশ হয়। কিন্তু এই ঘেমে ওঠাটা অন্যরকম।  রায়হান তাঁর হাতে চাপ দিয়ে কোমল স্বরে বললেন-আপনি আমার কাছে বন্ধুর চেয়েও কিছু বেশি।  আজকে আমি কি আপনাকে একটা চুমু খেতে পারি নাজমা? একবার?

 

আরও পড়ুন- অপরুপ দোজখ- সাঈদ কামালের গল্প

ফলো করুন- দিব্যপাঠ সাহিত্য পত্রিকা