সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গল্প- অসময়

বলেছিল যে কোনও দিন চলে আসতে পারে। সত্যি সত্যি যে আসবে কে জানত! দেবাদিত্যের

ডাকাডাকিতে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে আমি একেবারে হাঁ। ঠিক দেখছি তো? আমার ঘরে আমারই সােফায় বসে আছে শৈবাল! হ্যাঁ শৈবালাই। মুখে সেই চিরন্তন কলগেট মাকা হাসি,

— কী রে, চমকে গেলি তাে ?

— তা তাে গেছিই। বিশ্বাস হচ্ছে না, কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না।

— ওভাবে দেখছিস কী ? আমি রে আমিই। তাের সেই গ্রেট হিরাে।

কথার ছিরি দ্যাখাে ! দেবাদিত্য রয়েছে না সামনে !

তা দেবাদিত্য অবশ্য নির্বিকার। উলটে হ্যা হ্যা করে হাসছে।

— আরে কী কান্ড! এত বড় খবর তাে জানতাম না ?

— সে কী রে ?বরের কাছে আমার কথা বেমালুম চেপে গেছিস ?

— ই। জোর করে হেসে উঠলাম এবার — কী আমার উমকুমার ছিলেন রে যে সবাইকে ওর কথা বলতে হবে !

— যাহ। আমি উমি হলে তােকে তাে সুচিত্রা সেন হতে হয়। তাের অত গ্ল্যামার ছিল না। ছিল কি ?

শৈবালের সঙ্গে দেবাদিত্যও জোরে হেসে উঠল। মুখটা কেমন বােকা বােকা হয়ে গেল আমার। হাসি তাে পাচ্ছেই না, বরং প্রশ্ন জাগছে মনে। কেন এ শৈবাল? শুধু আমার পেছনে লাগতে? বিয়ে বাড়িতে সেদিন বলেছিল বটে আমার ঘর সংসার দেখতে আসলে৷ ঠিকানাও নিয়েছিল। তবে…

ওদের হাসির মাঝেই বলে উঠলাম এবার, — যাক গে, ফাজলামি ছাড়াে।…কী খাবে বলে এখন ? চা? সরবত? কফি ?

— চাফা তাে হবেই। তার আগে একটু জল খাওয়া।

— শুধু জল খাবে ? একটু সরবত করে দিই ?

— দিবি ? দে। বেত না আসা পর্যন্ত কানমলাই চলুক।

সঙ্গে সঙ্গে আমি ঘর ছেড়ে সােজা ডাইনিং স্পেসে। ফ্রিজের ভালা খুলে দাঁড়িয়ে রইলাম একটু ক্ষণ। কেমন যেন একটা নিশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে, গলা শুকিয়ে মরভূমি। ঠান্ডাজলের বােতল খুলে একক ঢাললাম গায়। কেন এমন হচ্ছে ? এতদিন পরেও? কোনও মানে হয়?

তুলতুলির বিয়ের দিনও ঠিক এরকমটাই হয়েছিল। সবে তখন উপহার তুলে দিচ্ছি তুলতুলির হাতে, মালা এসে একটান, — এই, এদিকে আয়, এদিকে আয়।

— কেন?

— আয় না আগে। ছােড়দাভাই তােকে কখন থেকে খুজছে।

ছােড়দাভাই শব্দটাতে এখনও এত যাদু আছে কে জানত! চার বছর পরেও শিরদাঁড়া বেয়ে হিমস্রোত, — শৈবালদা এসেছে নাকি? কবে এল ?

— কাল। হঠাৎই। আমরা তাে ভেবেছিলাম তুলতুলির বিয়েতেও বােধহয় আসতে পারল না। আমার বিয়েতে তাে পারেনি জানিসই।

জানি তাে। অনেক দূরে উড়ে গেলে ফেরা যে বড় কঠিন।

মালা আবার টান, — চল চল। ছােড়দাভাই আসার পর থেকেই বার বার তাের খোঁজ করছে। তুই কেমন আছিস, বিয়েতে আজ আসবি কি না…। বলতে বলতে মালা চোখ পাকাচ্ছে, — কেসটা কী বল। তাে ? ছােড়দাভায়ের সঙ্গে তাের কোনও ব্যাপার স্যাপার ছিল নাকি ? গভীর…? গােপন…?

— থাকলো তুই জানতে পারতিস না?

এ ছাড়া আর কীই বা বলতে পারতাম মালাকে? গােপনীয়তা কিছু থাকলেও সে যে শুধু আমারই। সম্পূর্ণ নিজস্ব। কাউকে বলা যাবে না। ভালবাসায় হেরে যাওয়ার মত লজ্জা কি আর কিছুতে আছে ?

নিজেকে প্রকাশ করতে না পারার যন্ত্রণা বােধহয় আরও বেশি কষ্টের। আমি জানি।

তবু অবশ্য চেষ্টা একবার করেছিলাম। বেহায়ার মত। শৈবালের নিউ ইয়র্ক যাওয়ার তারিখ তখন একেবারে কাছে, ঠিক দু দিন পরে।

শৈবালের কাছে সােজাসুজি চলে গিয়েছিলাম,

–তুমি তাহলে সত্যি চলে যাচ্ছ ?

— কেন, তাের এখনও সন্দেহ আছে নাকি?

— তা নয়, চলেই যাবে ?

— ইউনিভার্সিটি স্কলারশিপটা যখন পাইয়েই দিল.. ঘুরে আসি।

— একা একা তােমার ওখানে খুব খারাপ লাগবে, দেখাে।

অল্প সময়ের জন্য হলেও একটু যেন উদাস হয়েছিল শৈবাল। মুহুর্তের জন্য স্থির হয়ে গিয়েছিল সময়। ব্যস, এই টুকুনই। তারপরই দুনিয়া ওড়ানাে হাসি,

— যাওয়াটা তাহলে ক্যানসেল করে দিই, কী বল ?

— আমি কী তাই বলছি? নিশ্বাস চেপে বলে ফেলেছিলাম,

— নাটকের গ্রুপ তাে ভেঙেই যেতে বসেছে। আমিও হয়তাে চলে যাব…

— তুই কোথায় যাবি? বলেই বুঝি মনে পড়ে গেছে শৈবালের। ওমনি হই হই করে উঠেছে,

— ও গড়, তাের তাে বিয়ের কথা চলছে ! মা বলছিলা বটে| কত দুর পাকা রে ব্যাপারটা ? ডে ফাইনাল হয়। গেলে কিন্তু জানাস আমায়। আসতে না পারি, শুভেচ্ছা তাে পাঠাতে পারব।

এর পর আর কত নির্লজ্জ হওয়া যায় ?প্রাণপনে শুধু নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি, কিছুতেই যেন কেদে না ফেলি।

কান্নাটা কি তবে এখনও জমে আছে বুকে? গলার কাছে এত বাষ্প জমছে কেন ? গ্লাসে জল ঠেলেও স্কোয়াস দিতে ভুলে গেছি। বাইরের ঘর থেকে ডেকে ডেকে সাড়া না পেয়ে দেবাদিত্য যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সে হুশও নেই আমার।

— কী হল, সরবত দিতে এত দেরি ?

দেবাদিত্যর মুখে বিস্ময় ? নাকি সন্দেহ ? তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নিলাম নিজেকে,

— দ্যাখাে না, কী বিশ্রী ব্যাপার ! কৌটো খুলে দেখি চিনি নেই। কী করি বলাে তাে?

দেবাদিত্য বিশ্বাস করল কিনা কে জানে! ভুরু কুচকে তাকিয়েছে,

— এনে দেব ?

— দরকার নেই। তুমি বরং ততক্ষণ কথা চালিয়ে যাও, আমি চট করে পেছনের দরজা দিয়ে কল্পনাদির কাছ থেকে…

চিনির বাটি হাতে টেবিলের কাছে ফিরেও হাঁপাচ্ছি। ছি ছি, আর একটু হলেই দেবাদিত্যর কাছে ধরা পড়ে যেতাম! কী ভাবত আমায় দেবাদিত্য ? তৎ, এ ধরনের যুক্তিহীন আবেগের এখন আর কোনও অর্থই হয়। না। সুখী সংসার আমার | নির-দ্বেগ। সুন্দর। কোথাও ফাঁকি নেই এখানে। দেবাদিত্যের সঙ্গে সম্পর্কে ও না। আর একজনও এসে যাচ্ছে শিগগিরিই। মাস খানেক আগে তার আসার সূচনা হয়েছে আমার শরীরে। আমি তাকে প্রতি পলে অনুভব করি।

সরবত নিয়ে যাওয়ার আগে আটপৌড়ে শাড়ির আঁচলখানা ভাল করে সাজিয়ে নিলাম কাঁধে, হাত দিয়ে সাপতে নিলাম মুখ| আর যেন একটুও অগােছালাে দেখায়।

শৈবাল যথারীতি জমিয়ে গল্প করে চলেছে দেবাদিত্যর সঙ্গে,

— দিন সাতেক আছি আর! আসলে কামিং উইকে মুম্বাইতে একটা ইন্টারভিউ আছে…

— তার মানে ওদেশে আপনি সেটল করছেন না?

— মাথা খারাপ! দেশ ইজ দেশ। এখানে না ফিরে…

— হ্যাঁ হ্যাঁ, এবার এসে একটা বিয়ে থা করে ফ্যালাে। ঝটপট হাসি ঝুলিয়ে নিলাম ঠোঁটে, আমরা বেশ পাত পেড়ে নেমন্তন্ন খাব…

— দাঁড়া দাঁড়া, তাের বিয়ের খাওয়াটা খাওয়া আগে।।

— এনি ডে| এসাে। করে খাবে বলাে?

— ওরেব্বাস, এক গ্লাস সরবত খাওয়াতে যা করলি… পাক্কা আধ ঘন্টা! খেতে ডেকে হয়তাে…

— না মানে… আসলে কী হয়েছে জানেন তাে? দেবাদিত্য সহসা eণকতার ভূমিকায়। বউয়ের দোষ ঢাকতে চাইছে,

— বাড়িতে চিনি ছিল না।

— সাে হােয়াট ? তাের আঙুলটা একবার ডুবিয়ে দিলেই পারতিস।।

— উফ, শৈবাল তুমি না…। কপট ভাজ আনলাম ভুরুতে,

— নাও, খেয়ে নাও।

 

আরও পড়ুন- সোনালি কাবিন – আল মাহমুদ

 

— দরকার নেই। তাের বর প্লেন জলে আমার তেষ্টা মিটিয়ে দিয়েছে।

অর্থাৎ আমি যখন চিনি আনতে গেছি, দেবাদিত্য আবার ভেতরে ঢুকেছিল ? রান্না ঘরে গিয়ে চিনির কোটো খুলে দেখেনি তাে? দেখলেও এখন আর কিছু করার নেই।

অস্বস্তি চাপা দিতে কথা ঘােরালাম,

–তারপর কী খবর বলাে ? মালা শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেছে ?

— এই তাে কালই গেল। শৈবাল সরবত শেষ করে সিগারেট ধরিয়েছে। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে চারদিকটা। বলল,

— তুইও তাে বেশ চুটিয়ে সংসার করছিস !

তাড়াতাড়ি চোখ বােললাম ঘরটায়। এখনও ঝাড়পোঁই হয়নি,

— সেন্টার টেবিলে সকালের চায়ের দাগ, টিউব লাইটের কোণে পাতলা ঝুল, বইয়ের ব্যাকে ধুলাে। রীতিমত এলােমেলাে হয়ে আছে সব কিছু। ইশ, শৈবাল আজ আসবে জানলে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা যেত।

ােদিত্য আর শৈবাল আবার গল্পে মেতেছে। আমেরিকা থেকে রাজনীতি ঘুরে ভারতে এটা। বিলা। ক্লিন্টন থেকে অটলবিহারী। আবার ঘুরে পােল্যান্ড, জার্মানি, রাশিয়ায়। ওদের বিশ্ব পরিমায় মাঝে মাঝে ফুট কাটছি আমিও পেট্রোলিয়াম সমস্যা নিয়ে বেশ খানিক মতামত ও দিয়ে ফেললাম। মে শান্ত হয়ে আসছে মনটা। শৈবালের আকস্মিক আগমনও সয়ে যাচ্ছে।

এক সময় দেবাদিত্যই দেশ বিদেশ ছেড়ে দুম করে ঘরে ফিরে এল,

— এই, তুমি বসে বসে গল্পই করে যাচ্ছ? শৈবালবাবুকে কিছু খাওয়ালে টাওয়াবে না?

অপ্রত মুখে বললাম,

–শৈবালদাকে না খাইয়ে ছাড়ব নাকি? আজ দুপুরে এখানেই খেতে হবে। না হয়। আমার পাল্লায় পড়ে দুপুরের খাওয়া আজ সন্ধ্যেবেলাই…

— ওরে বাবা। কথা পুরাে শৈষ হওয়ার আগেই শৈবাল মাথা ঝাকাচ্ছে,

— বউদি আজ দুপুরে হেভি অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছে। ওটা মিস করে এখানে রিস্ক নিতে আমি মােটেই রাজি নই।।

ব্যস হয়ে গেল। বলার ধরনই এমন যেন শেষ রায় দেওয়ার অধিকার শুধু এরই, তার ওপর কোনও আপিল চলবে না।

দেবাদিত্য তবু গৃহকর্তার সেজন্য দেখিয়েই চলেছে,

— ওসব বললে তাে চলবে না। কিছু তাে খেতেই হবে, প্রথম দিন এসেছেন…

— সুদে বাড়ুক না। পরে একদিন উশুল করা যাবে।

— তা কী করে হয় ? আপনি বরং ওর সঙ্গে কথা টথা বলুন আমি এক্ষুনি…

দেবাদিত্য উঠে পড়েছে। কী কান্ড, সত্যি সত্যি বেরােবে নাকি? আমাকে একা ফেলে ? একটু আগের সহজ ভাল পলকে উধাও। দেবাদিত্য কি ইচ্ছে করে…

ঝটিতে উঠে দাঁড়িয়েছি,

— দোকানে যাওয়ার দরকার কী ? বাড়িতে যা আছে…। শৈবালদা, ওমলেট খাবে ? কিমা দিয়ে করে দিতে পারি। কথা দিচ্ছি সাড়ে পাঁচ মিনিটে বানিয়ে দেব।

— আরে, তােরা হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়লি কেন? এক কাজ কর, ভাল করে এক কাপ চা খাইয়ে দে।

— শুধু চা ? নাে, চলবে না। দোদিত্যও খাওয়াবেই,

— একে শ্বশুরবাড়ির লােক, তার ওপর বোয়ের হিরাে। নিজের মুভুটা তাে বাঁচাতে হবে, না কী ?

বলতে বলতে দোদিত্য শােওয়ার ঘরে। মানিব্যাগ নেবে।

দেবাদিত্য বেরিয়ে যাবার পর একদম স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছি। সহজ গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

— শুনলাম তুমি ওখানে রিসার্চটাও শেষ করাে নি ? চাকরিতে ঢুকে…

— বা রে, রােজগারপাতি করতে হবে না ?

— তা এখান থেকে চলেই বা আসতে চাইছ কেন ?

— বললাম যে, আর ওখানে ভাল লাগছে না!

শৈবাল উত্ন দিল না। নতুন সিগারেট ধরিয়ে হেলান দিয়েছে সােফায়।

একটু যেন অন্যমনস্ক হঠাৎ| আমার বুকটা ঢিপ ঢিপ করে উঠল। শৈবালদার ওই উদাস উদাস মুখ চুম্বকের মত টানছে। এক্ষুনি কি আমার পালিয়ে যাওয়া দরকার ? এখান থেকে ?

শশব্যস্ত মুখে বললাম,

–শৈবালদা, এক সেকেন্ড| চায়ের জলটা বসিয়ে আসি। ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছি, পিছনে এক অপরিচিত স্বর,

— দাঁড়া।।

খােলা জানলা দিয়ে ফ্যানের বাতাস আসছে, ঘরের পদগুলাে দুলে উঠল। দোলনার মত। বাইরের প্রখর আলো ঘরে ঢুকে মৃদু জ্যোতি। শৈবাল সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

হাসার চেষ্টা করলাম আলগা,

— কিছু বলছ ?

— এদিকে আয়। তাের সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।

এমন তাে হওয়ার কথা ছিল না। ওই স্থির তাকিয়ে থাকা মুখও যে আমার একদম অচেনা!

— কী হল ? আয় এখানে এসে বােস।।

শৈবাল নয় যেন সাপুড়ের বাঁশি ডাকছে আমাকে। সব কেমন ওলােট পালােট হয়ে গেল। মন্ত্রমুগ্ধের মত শৈবালের দিকে এগিয়ে চলেছি। এগােনাে, না পিছােনাে ? চতুর্দিক আবছা হয়ে এল। বিশ্বসংসার, দোদিত্য, গর্ভের সন্তান, সব।

— একটা কথা জিজ্ঞেস করব, সত্যি কথা বলবি ?

— কী কথা ? আমার গলা দুলে গেল।

— কথাটা আমার জানা খুব দরকার রে। চার বছর ধরে কথাটা আমায় উন্মাদের মত তাড়া করে চলেছে। শৈবালেরও গলা কাঁপছে,

— বল, সত্যি বলবি ?

আমার চোখ বিবশ। পলক ফেলতেও ভুলে গেছি।

— তুই কি আমাকে কোনও দিন কিছু বলতে চেয়েছিলি ? ঠিক করে বল তাে? বিদেশে গিয়েও আমার সারাক্ষণ খালি তাের কথা মনে পড়ে কেন ?

শরীরের সমস্ত রােমকপ যেন খুলে গেল আচমকা। লক্ষ সরােদ বেজে উঠল শিরায় উপশিরায়। আজ শৈবাল এত দিন পর…সেই শৈবাল…

শৈবালের দীর্ঘ সুঠাম দেহ ঝুকে আছে আমার দিকে। নিষ্পলক দৃষ্টি আমাতেই স্থির। চেতনা অবশ হয়ে আসছে আমার। সম্বিতে ফিরতে পৃথিবীর বয়স বুঝি বেড়ে গেল কয়েক হাজার বছর। অথবা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লাম। প্রবল ভূমিকম্পের পর মেদিনী যেন শান্ত হচ্ছে। গলাটাকে প্রাণপণে অকম্পিত রেখে বললাম,

— না তাে শৈবালদা। সে ভাবে তাে কিছু বলতে চাই নি কখনও ! তােমার কেন মনে হয় এ কথা ?

সমুদ্রে মেঘের ছায়া পড়েই মিলিয়ে গেল। আবার সেখানে উচ্ছল ঢেউ। স্থলিত মুহর্তটাকে কী অবলীলায় যে ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিল শৈবাল। বুঝলই না সমস্ত কথারই একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে, সময় চলে গেলো সে কথার মৃত্যু হয়। আমার সেই কথাটাও তাে কবেই মরে গেছে। যা আছে সে তাে শুধুই স্মৃতি। স্মৃতিই। তাকে আর বাঙময় করে কী লাভ?

শৈবাল আবার আগের মতই হাসছে,

–এত কাঁপছিস কেন বােকা? তাের সঙ্গে তাে একটু ঠাট্টা করছিলাম!

আমার চার বছর আগের সব স্বপ্নই তাে ঠাট্টা এখন। মাগাে, দেবাদিত্য কেন এখনও ফিরছে না? এক্ষুনি আসুক| এই মুহুর্তেই। নতুন করে আর কোনও প্রলয় ঘটার আগে। তার তাে এবার আমার কাছে ফিরে আসা উচিত। নয় কি?

 

আরও পড়ুন- প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প- কাঁটা