রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি Review

সৃজিত মুখার্জী মানেই অন্যরকম কিছু! কিছুটা থ্রিল, কিছুটা রোমান্স, কিছুটা একশন, সব মিলিয়ে চমৎকার ফিকশন- পর্দায় সৃজিতীয় স্বাদের এক শৈল্পিক উপস্থাপন। অটোগ্রাফ, বাইশে শ্রাবণ, জাতিস্মর, চতুষ্কোণ, এক যে ছিল রাজা, উমা, দ্বিতীয় পুরুষ, গুমনামি’র মতো সৃজিতীয় স্বাদের সিনেমা উপহার দেয়া পাকা হাত থেকে এবার এসেছে ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি।’ এটি অবশ্য সিনেমা নয়- ডিজিটাল প্লাটফর্ম হইচই’র ওয়েব সিরিজ।

 

বাংলাদেশি লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন-এর সাড়া জাগানো থ্রিলার উপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’অবলম্বনে নিমার্ণ করা হয়েছে এই ওয়েব সিরিজ। উপন্যাসটির মতোই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে ওয়েব সিরিজটিও।

ওয়েব সিরিজটির প্রথম পর্যায়ে সাসপেন্স তৈরি হয়। হঠাৎ কিছু মানুষ উধাও হয়ে যেতে থাকে। কী ভাবে হচ্ছে উধাও! কে করছে! কেন করছে! এসবের অনুসন্ধানে মাঠে নামে সিবিআই এর দুঁদে গোয়েন্দা অফিসার নিরুপম চন্দ। গোয়েন্দার হাত ধরে কাহিনি সামনে এগোয়। একপর্যায়ে উধাও রহস্য উন্মোচিত হয়। তবে এই উন্মোচন দর্শককে আবারো নতুন সাসপেন্সের গোলকধাঁধাঁয় আটকে ফেলে। সিরিজটির সিজন ২ (যদি আসে!) হয়তো দর্শকের রহস্যপ্রবণ মনকে প্রশান্ত করবে!

 

রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি সিরিজের পরতে পরতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সদ্ব্যহার করেছেন সৃজিত মুখার্জী। যেন প্রতিটি রবীন্দ্রসঙ্গীত আর তার ব্যাকগ্রাউন্ড সিনারি মিলে আলাদা আলাদা মিউজক ভিডিও! বিশেষ করে মুশকান জুবেরী মধ্যরাতে যখন ঝোঁপের ভেতর চাকরদের নিয়ে খোঁড়াখোখুঁড়ি করছিলেন তখন গোয়েন্দা নিরুপম পাশের ঝোঁপ থেকে উঁকি দিচ্ছিলেন। তখন মুশকানের কণ্ঠে-

“যে জন দেয় না দেখা, যায় যে দেখে

ভালোবাসে আড়াল থেকে

আমার সকল নিয়ে বসে আছি…”

রবীন্দ্রসঙ্গীতখানা যেন উৎকর্ষতার ঘোরলাগা আবহ তৈরি করে।

 

বাংলাদেশের নায়িকা আজমেরী হক বাঁধন মুশকান জুবেরীর চরিত্রে পারফর্ম করেছেন। বাঁধনের অভিনয় ক্যারিয়ারের তালিকায় এই ওয়েব সিরিজটিকেই সবার আগে রাখতে হবে। বাঁধন এখানে সর্বসত্বা উজার করেই অভিনয়কলা প্রদর্শন করেছেন। সংলাপে, ভঙ্গিমায়, উপস্থাপনে মুশকান জুবেরী চরিত্রের সফল রুপায়ন করেছেন বাঁধন। তার কলকাতাযাত্রার ১ম কাজ স্মরণীয় থাকবে নিজের কাছে এবং তার দর্শকদের কাছেও।

‘অন্তহীন’সিনেমায় নায়ক ও গোয়েন্দা চরিত্র দিয়ে বাঙালি দর্শকদের হৃদয় জয় করা মুম্বাইয়ের বাঙালি অভিনেতা রাহুল বোস সিবিআই অফিসার নিরুপম চন্দ চরিত্রের জন্য সৃজিতের পারফেক্ট চয়েজ। তার অভিনয়, উপস্থাপন, সংলাপ ওয়েব সিরিজটিকে সার্থক করেছে।

রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি ওয়েব সিরিজটির মুখ্য চরিত্রগুলোর মাঝে আতর আলী অগ্রগণ্য নান্দনিক ও দর্শকপ্রিয় চরিত্র। সৃজিতের পছন্দের অভিনেতা, ইদানিং যাকে ছাড়া সৃজিত কোনো কাজ করেন না বললেই চলে- সেই অনির্বাণ ভট্টাচার্য এখানে আতর আলীর চরিত্রে এই সিরিজের সব চাইতে সুনিপুণ অভিনয় উপহার দিয়েছেন ভক্ত দর্শকদের। দাঁড়ি-টুপিঅলা পূর্ববঙ্গ থেকে আগত চরিত্র হিসেবে আতর আলী উপস্থাপিত হয়েছে। আতর আলীও পুলিশের সোর্স হিসেবে একধরনের গোয়েন্দাগিরিই করেছেন। প্রায় সারাক্ষণ হাসি হাসি মুখ, পান চিবোনো, পিক ফেলা, পূর্ববাংলার ভাষায় কথা বলা সব মিলিয়ে অনির্বাণ অনন্য, অতুলনীয়। গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে জীবন হারাতে বসেছিল আতর। তবে আতর আলীর বেঁচে থাকাটায় খটকা লাগছে! ঘাস চাপা নাকি মাটি চাপা ভাবাচ্ছে!

 

সিবিআই এর সাবেক সিনিয়র গোয়েন্দা অফিসার খরাজ খাসনবিশ চরিত্রে অঞ্জন দত্তকে মাস্টারপিস লাগলো। তাঁর ক্ল্যাসিক্যাল অভিনয়, ঢং, সংলাপ বরাবরই মুগ্ধ করে দর্শকদের। অন্যান্য পার্শ্বচরিত্রগুলো যেমন: OC  চরিত্রে অনির্বাণ চক্রবর্তী, রমাকান্ত কামার চরিত্রে প্রদীপ মুখোপাধ্যায়, ডাক্তার সেন চরিত্রে রজত গাঙ্গুলী, শেফালী চরিত্রে শ্রেয়া এবং ফালু চরিত্র প্রত্যেকেই ভালো অভিনয় করেছেন।

 

রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ ওয়েব সিরিজটি কাকাবাবু ফেলুদা ব্যোমকেশ কীরিটী রায়ের মতো হয়তো গোয়েন্দাগল্প হিসেবে কালজয়ী হবে না কিন্তু বিজ্ঞানপ্রযুক্তির এই জমানায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি রহস্য এখানে জট পাকিয়েছে যা হয়তো সায়েন্স ফিকশনে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। সিজন ২ এ এই রহস্য উন্মোচন দেখার প্রত্যাশায় রইলাম!

ওয়েব সিরিজটির IMDB রেটিং- 6.5/10

আরও পড়ুনচাঁদের পাহাড় সিনেমা রিভিউ