রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি

সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল ১৮৯৫ সালে তার সম্পত্তি উইল করে যান। উইলের শর্তানুযায়ী ১৯০১ সাল থেকে বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবলের নামানুসারে ‘নোবেল পুরস্কার’ প্রদান শুরু করা হয়। বাঙালি তথা উপমহাদেশে সর্ব প্রথম নোবেল জয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান। এশীয়দের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম সাহিত্যে নোবেল জয়ী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির পর পেরিয়ে গেছে শতবর্ষ- তাঁর নোবেল প্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যে এক উজ্জ্বল ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভের পর আরো দুজন বাঙালি ড. মুহম্মদ ইউনুস এবং ড. অমর্ত্য সেন শান্তি ও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেও সাহিত্যে আর কেউ এ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার লাভের সম্মান অর্জন করতে পারেনি। তাঁর নোবেল পুরস্কার লাভের ঘটনাটিও কিছু বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। অনেক ঘটনাবহুল ছিলো রবীন্দ্রনাথের এ প্রাপ্তি।

বিশ্বখ্যাত চিত্রকর উইলিয়াম রোটেনস্টাইন ১৯১০ সালে কলকাতা ভ্রমণে আসেন। ঠাকুর পরিবারের দুই চিত্রকর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পকর্ম দেখতে রোটেনস্টাইন জোড়াসাকোঁর ঠাকুরবাড়ি বেড়াতে যান। সেখানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হয় উইলিয়াম রোটেনস্টাইনের। রোটেনস্টাইন সেখানে বসেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ছবি আঁকেন। এরপর থেকে রবীন্দ্রনাথ ও রোটেনস্টাইনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

১৯১২ সালে ‘মডার্ণ রিভিউ’ পত্রিকায় স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা সিস্টার নিবেদিতার অনূদিত রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হলে তা রোটেনস্টাইনের নজরে আসে। উইলিয়াম রোটেনস্টাইন  কাবুলিওয়ালা গল্পের ইংরেজি অনুবাদ পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি আরো মুগ্ধ হয়ে যান। এর আগে উইলিয়াম রবীন্দ্রনাথে সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে এতোটা ওয়াকিবহাল ছিলেন না। এরপর উইলিয়াম রোটেনস্টাইনের অনুরোধে তৎকালীন কলকাতার বিখ্যাত শিক্ষাবিদ অজিত চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথে আরো কিছু সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করে পাঠান। উইলিয়াম ঠাকুরের লেখার প্রতি আরো মুগ্ধ হয়ে পড়েন। লন্ডনে উইলিয়াম রোটেনস্টাইনকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সম্পর্কে বিশদে জানান প্রমথলাল সেন ও ব্রজেন্দ্রনাথ শীল।

এর কিছু পরই উইলিয়াম রবীন্দ্রনাথকে লন্ডনে আমন্ত্রণ জানান। যাত্রাকালে জাহাজে বসে অনুবাদ করেন গীতাঞ্জলি গ্রন্থের কবিতাগুলো। গীতাঞ্জলি বইয়ের অ্যাধাত্মিক কবিতাগুলোর অনুবাদ পড়ে অভিভূত হয়ে পড়েন উইলিয়াম। এরপর তিনি বিখ্যাত কবি বাটলার, ইয়েটস, জর্জ বার্নাড’শকেও চিঠি লিখে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জানান।

পরে লল্ডনে এক সাহিত্য সভায় কবি বাটলার ইয়েটসদের সাথে মিলিত হন রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যসভার পর লন্ডন নগরীজুড়ে রবীন্দ্রনাথে লেখক-খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। লন্ডনে বিশ্বকবির কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন নোবেল সাহিত্য পুরস্কার কমিটির সদস্য স্টার্জমুর। স্টার্জমুর নিজে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে না জানিয়ে গীতাঞ্জলি গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ ‘Song Offerings’ এর মনোনয়ন পাঠান নোবেল কমিটির কাছে।

সে বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মিলিয়ে ২৮ জনের নামে মনোনয়ন জমা পড়ে। তৎকালীন নোবলে সাহিত্য পুরস্কার জুরি বোর্ডের সভাপতি হোয়ানে রবীন্দ্রনাথের মনোনয়নের বিরোধীতা করে বলেন, ‘একটি মাত্র বইয়ের উপর বিচার বিবেচনা নোবেল পুরস্কার দেয়া সম্ভব নয়।’ এরপর নোবেল জুরির আরেক সদস্য এসাইস টেঙ্গার বাংলা জানতেন। তিনি প্রাচ্য গবেষক ছিলেন। তিনি গীতাঞ্জলির সুইডিশ অনুবাদ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে নোবেল সাহিত্য জুরি বোর্ডের সদস্যদের প্রভাবিত করেন। সে বছরই ১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর নোবেল সাহিত্য পুরস্কার কর্তৃপক্ষ সাহিত্য শাখায় নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম ঘোষণা করেন।

 

আরো পড়ুন: বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত রচনাবলি