পলিয়ার ওয়াহিদের কবিতা

আমাদের ইছামতি

 

হিয়া, কেমন দেখলে ইছামতি?

ওর তীরে ছোটাছুটি করে আমাদের আশৈশব?

তুমি কি দেখতো পাও?

 

এখনো কী সেই কিশোরী পায়ের তালুর শব্দ

মনকে করে এফোঁড়ওফোঁড়

অথচ আমি একটা আবন্ধ দেয়াল ঘড়ির মতন

বেঁচে আছি অনিঃশেষ!

 

তোমার হাসি হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘ

ঠিক ঝরঝর জলবিন্দু এক- যেন টলে পড়ে এক্ষুণি!

 

তোমার ছায়া কী ইছামতির জলে সেইভাবে ঢেউ তোলে?

কাঁপে?

যেমন তোমার ঠোঁট কম্পনে কম্পনে তাকিয়ে থাকত

বলো হিয়া?

কেমন আছে আমাদের ইছামতি?

ওর শরীর ভালো তো?

ওর দু’পাড়ে যারা ঘুমত!

এখন তারা কোথায়?

নাকি আমাদের সকল না থাকার মতো তারাও উধাও!

 

কেমন আছে তাদের ঘর?

তারাও নিশ্চয়ই নদীর মতো শুকিয়ে গেছে?

নাকি প্রশস্ত উন্নতির পাশে তারা এখনো জটলাবাধা ফুটপাত?

যদিও তারা বলত- দুনিয়া তাদের একেট্টা পর!

আমরা কি সত্যি পর হয়ে গেছি হিয়া?

 

তোমার খবর পায় না আজকাল

‘গতকাল’-এর স্মৃতিগুলো ‘আগামীকাল’-এর দিকে চলে যায়

ফিরবে বলে!

তবু ‘আজ’কে ফাঁকি দিতে পারে না

কারণ অপেক্ষার কোনো অতীত ও ভবিষ্যৎ নেই

আমার কাছে স্মৃতিই বর্তমান।

 

ইছামতিতে ঘোমটা দেয়া নৌকা চলে?

যে নৌকায় তোমাকে বউ করে আনব বলে কথা দিয়েছিলাম

আহ… কত কত কথারা

কত কত পথের মানুষ

তাদের সম্পর্কে কতটা জানতাম আমরা?

তবু সকলকে নদীর মতো আপন মনে হতো

আমি সেই কথা রাখতে পারিনি হিয়া

রাখতে পারিনি!

আমি কাপুরুষ

আমি তোমাকে কামনা করতে করতে নাম দিয়েছি প্রেমিকা

তোমাকে নিজের ভাবতে ভাবতে নাম দিয়েছি বউ

এভাবে আমি আমি করতে করতে আমি তুমি হয়ে গেছি।

 

বাদ দাও বিচ্ছেদ আর দুঃখের কথা

আচ্ছা কেমন আছে ইছামতির সেই বটতলা?

কূলগাছ?

লম্বা তালগাছিটি?

বাবুই কি বাসা বাঁধে এখনো?

রাখালের বাঁশি শোনা যায়?

তুমি না কোন এক রাখালের প্রেমে পড়েছিলে

মনে আছে?

কালো কুচকুচে

কিন্তু কি নিঃপাপ ডাগর চোখ তার

সারাদিন ছাগল গরু তাড়িয়ে তাড়িয়ে সে তোমাকে ভুলেই যেত

ভাবা যায়

পশুপ্রেম কতটা আদুরে

মিষ্টি প্রেমিকাকেও সে তোয়াক্কা করে না।

 

তারপর থেকে আমিও দিন দিন পশু হয়ে গেলাম

মৌমাছির মতো টইটই বেড়ে গেল

নতুন পানির মতো ভাসিয়ে নিল অঢেল স্রোত

আমাকে আর কে সামলায়

তবু গোল্ডলিফে চুমুক দিয়ে কল্পনার ধোঁয়ায় হাতড়ে বেড়াতাম

তোমার ছবি।

ছেলেটা গুল্লায় গেছে- বলত সবাই

পরে সত্যিই আমার এম্বিশন হলো গোল্লায় যাওয়া।

 

তোমার সেই মেটে রাখালের জামাটা

আকাশী রঙ মাখানো মেঘ যেন

মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখি তাকে

কালো মোটা ঠোঁটে কি মধুর হাসি

পুরুষপাখিরা এমনভাবে হাসতে পারে!

আমি বিশ্বাসই করতাম না।

 

আচ্ছা তুমি কি এখনো ঈশ্বরকে অবিশ্বাস করো?

অথচ আমি আগের মতো আল্লাকে খুঁজি না!

যেমনটা তোমাকে খুঁজি

 

তুমি হিন্দুর মেয়ে

আমি জবন

তবু আমাদের ভাব আর ভবের মিলনে জন্মাচ্ছিল দুনিয়ার তাবৎ আদম।

 

আচ্ছা, আমরা মেয়ের নাম কি রাখতে চেয়েছিলাম?

তুলশি তাজ

নিশ্চয় বিটিশ রানীর প্রতি ক্ষোভ ছিল তোমার

নাকি লোভ ছিল মুকুটের প্রতি?

তা না হলে মেয়ের নাম তাজ কেন?

আমি তোমাকে তাজমহলই দিব!

 

মুসলমানের বউ হবে বলে-

বুকে হাত গুজে পাতাদের মতো গর্ব করতে।

আমার আনন্দ হতো।

 

জানো যেদিন

ইছামতিকে সাক্ষী রেখে তোমাকে জড়িয়ে ধরলাম

ভয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিলাম আমি

এতো ভয় নারীদেহে

নাকি প্রথম ছোঁয়ায়?

 

ভাবতেই পারি না কীভাবে এই কাঠকয়লার রাখাল তোমাকে চুমু খেয়েছিল

আর তুমি মুখে হাত রেখে কি বিস্ময়ে না তাকিয়ে ছিলে আমার চোখে

সারাটা জীবনে আমি

সবকিছু অবিশ্বাস্য করে তুলতে চায়তাম

এমনকী মরণকেও

আমরা তা পারিনি

কিন্তু ইছামতি?

কি অবিশ্বাস্যভাবেই না আমাদের গড়ে তুলেছিল

সেই তুলতুলে গভীরতা

সেই অন্ধ হাওয়ার মতো বিশ্বাস

আমাদের দুমড়েমুচড়ে গেল

আমাদের আর জলের মতো দেখা হলো না

হলো না স্রোতের মতো মেলামেশা

কোথায় সেই একাকার হওয়ার হাহাকার?

কোথায় সেই দামাল বৈঠা

কোথায় প্রথম প্রেম

আমি সব হারিয়ে ফেলেছি হিয়া

সব

সকল কিছু

আমার নিজের বলে কিছু নেই

আমার সংসার ইছামতি

আমার স্বপ্ন ইছামতি

আমার স্মৃতি ইছামতি

বদলে গেছে

খুবই বদলে গেছে।

 

চুপ করে থেকো না

বলো?

সেই মাঝি

সেই জেলে

সেই তুতেন কাকার বউ

সেই বেদেপল্লি

তাদের পিছু পিছু যেতাম বলে তোমার কি অভিযোগ

কিন্তু আমি কবে শরীর বিদ্বেষী ছিলাম?

ওদের মেদবহুল বাহু

উন্মুক্ত ভরাট নাভিমূল

কাকে না করত উন্মুল।

 

তবু আমি তোমার আছি

জলের কসম

কসম মাছের

কসম মাংসের

আমি তোমাকে ভুলিনি

 

তবু তো বিজয়াকে দেখেছি

নারীকে ভালোবেসে কীভাবে পুরুষ

অসংসারী নদী হয়ে রয়।

 

আরো পড়ুন: জারিফ আলমের কবিতা

                   জামিল হাদীর কবিতা