সুশান্ত হালদারের একগুচ্ছ কবিতা

কথা ছিল পতাকা উঁচিয়ে ধরবে

অভিমান ভুলেই যখন কাছে এলে

আমিও তো ছিলাম হৃদয় পোড়া কষ্টে গত জীবনের ইতিহাস ভুলে

কিছু চাইনি বলেই কি আজ দেবে না নিজেকে উজার করে?

জলে জল পড়ে,পাহাড়ে পাহাড় টানে

আমিও তো চেয়েছি কেউ নিঃশেষ করুক হৃদপিণ্ড ধরে

যতক্ষণ না জলের মাছ ডাঙায় ওঠে আসে

 

কথা ছিল দেশে দেশে যুদ্ধ হলে পতাকা উঁচিয়ে ধরবে

বলবে

হে আমার দুঃসাহসিক অদম্য সাহসী প্রেমিক

যেভাবে খামচে ধরেছিলে বুকের পাটাতন সহ কামপিয়াসী নদীর তৃষ্ণার্ত বদ্বীপ

সেভাবেই শত্রুর রক্ত চুষে ফিরে আসবে ড্রাকুলা বেশে

অথবা

জীবনানন্দের হিম কুয়াশায় ভোরের লক্ষ্মীপেঁচা বেশে

 

বলেছিলাম

বিজয় উল্লাসে যদি পেয়ে যাই আরও একবার

কবর খুড়ে নিজেই নিজের সমাধি দেব তোমাকে ভুলে থাকবার

মনে যদি পড়ে,আসিও;চিত্ত উতলা বাতাসে

নিজেকে যদি পোড়াতে চাও টার্বাইন ঘেরা মধ্যরাতে!

 

আরো পড়ুন- জামিল হাদীর কবিতা

 

ইচ্ছে

ইচ্ছে তো করে

বেণিবান্ধা যুবতী পেলেই বলে ফেলি হানিমুনের কথা

কিন্তু দেশ কালের যে অবস্থা

মুসলমান যদিওবা করে

হিন্দুতে কিন্তু মানা ।

 

আমি নাকি হিন্দু শ্রেণি; গোত্র আছে বহু

তবুও কাশ্ব বলে পুরোহিত হয়েছে প্রভু

এমনই দেশ

আন্ধা কানন আশ্রয়ে মন্ত্রী হয়েছে বহু, ধর্মের ষাঁড়ে চড়ে

পুরুষের পৌরুষ যদি থাকে

এখনই থাপ্পড় মারো সুবিধাবাদী ধর্মের ষাঁড় পেলে ।

 

ইচ্ছে তো করে

জ্বলে ওঠুক আগুন আবার বীরভোগ্যার রক্তে

বিজয় যদি হয় হবে; না হয় পড়ে থাকব স্বাধীন পতাকাতলে

আগুন যদি নিভে যায় কখনও কোন হঠাৎ আসা ঝড়ে

জ্বলে উঠবেই সে আগুন পাতাঝরা মৌসুম পেলেই

 

তোমাকে-ই যদি বলি ‘ভালোবাসি’ নারী

কটাক্ষ দৃষ্টি নিয়ে কি তাকাবে গেরুয়া বসন পরে আছি বলে আমি?

দ্বিধাদ্বন্দের এই প্রশ্নে যদি তুমিও বিভাজিত হও নারী

নারী জন্মই বৃথা;সৃষ্টি তো তোমার থেকেই আমি!

 

বেহুদাই বসেছি রাজসিংহাসনে

জরাজীর্ণ এই দেশে

বেহুদাই বসেছি রাজসিংহাসনে

সেই ভিক্ষুকের মতই উস্কোখুস্কো চুলে দীনতার মুখে

সলাজ হাসি নিয়ে বলেছি

তুমি আমার জাকিয়া জেসমিন কিম্বা কৃষ্ণচূড়া বাসন্তী

ভালো যদি বাসো কাফ্রি পুরুষের মত আমিও বন্য হরিণ তাড়া করতে পারি

সব ছেড়েছুড়ে আমিও শরৎচন্দ্রের দেবদাস হতে পারি

ভালো যদি বাসো জখমী আগুনে আমিও উল্কাপিণ্ড হতে পারি

ভালো যদি বাসো

শত প্রণামে আমিও পূর্বপুরুষের রক্তস্নাত মাটির উত্তরসূরী হতে পারি

অথচ

জরাজীর্ণ এই দেশে

ভালোবেসে কেউ মমতাজের শাহজাহান হতে পারেনি!

 

আরো পড়ুন- প্রত্যয় হামিদের একগুচ্ছ কবিতা

মৃত্যু কিম্বা বেঁচে থাকার কসরত

মৃত্যু কি হয়েছে আমার?

সেদিন দিব্যি হেসে বলেছিলাম ‘শতবার’

এখনও মৃত্যু হয় ঘন্টা চুক্তি দিনে ও রাতে কতবার

সেকথা শুনে হেসেছিলে বহুবার

আসলে মৃত্যু কি দেহ থেকে প্রাণ ‘পরিত্রাণ’

নাকি বেঁচে থেকেই বাঁচার জন্য দীর্ঘ এক সংগ্রাম?

 

কেউ বাঁচে রুটি আর মদে

কেউ বাঁচে জবুথবু এয়ারকন্ডিশনে

কেউ বাঁচে প্রেমে অপ্রেমে

আবার কেউ বাঁচে যুদ্ধে নয়ত শান্তিতে

কেউ বাঁচে সুদে ঘুষে

কেউ বাঁচে গুম খুন রাহাজানিতে

কেউ বাঁচে ধর্ষণে নয়ত জোরজবরদস্তিতে

কেউ বাঁচে অসুখে বিসুখে

কেউ বাঁচে ইতিহাস ঐতিহ্যে

কেউ বাঁচে রং তুলির আঁচড়ে

আবার কেউ বাঁচে একাত্তরে নয়ত রাজাকার নিধনে

কেউ বাঁচে কবিতায় অকবিতায়

কেউ বাঁচে বৈশাখে কিম্বা আষাঢ়ে

কেউ বাঁচে হিংসায়, কেউ বাঁচে প্রতিহিংসা পরায়ণে

কেউ বাঁচে সঙ্কটে,কেউ বাঁচে মজুদে

কেউ বাঁচে লোনে কিম্বা ব্যাংক লুটের কসরতে

কেউ বাঁচে ছলে বলে কৌশলে

কেউ বাঁচে তেলে কিম্বা রাজ্য শাসনে

কেউ বাঁচে বস্তিতে,কেউ সোনায় মোড়ানো সিন্দুকে

কেউ বাঁচে মদে নয়ত নারীতে

কেউ বাঁচে গাঁজা ভাং আফিমে

কেউ বাঁচে কেনা ও বেচাতে,কেউ চুরি কিম্বা লুটেতে

কেউ বাঁচে রাজার কোলে বসে রাজ্য পোড়াতে

কেউ বাঁচে ধর্ম অধর্মে নিজের হিস্যা বুঝে নিতে

 

এভাবেই যদি বেঁচে থাকতে হয় মরার ভয়ে মৃত্যুতে

তাহলে

নিজের মৃত্যু নিজেই লুকিয়ে রেখেছি শান বাঁধানো বুকের অস্থিতে!