ছেলেটি বেঁচে গেল: পলাশ মজুমদারের গল্প

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া— কোথায় চাকরি করিনি। এই করতে করতে আমার অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। এমন কত ঘটনার সাক্ষী আমি, যা আপনারা, মানে ভদ্রসমাজের লোকজন কল্পনাও করতে পারবেন না।

বয়স আমার প্রায় চল্লিশ। গল্প-উপন্যাস পড়তে ভালোবাসলেও কখনো লিখিনি। বলতে পারেন সাহস করিনি; কারণ লেখার কলাকৌশল না জানা। তবে এই বয়সেও ছাত্রজীবনের পড়ার অভ্যাসটি রয়ে গেছে। এত কর্মব্যস্ততার মধ্যেও সুযোগ পেলে পড়ি। না পড়তে পারলে সব কেমন যেন শূন্য শূন্য মনে হয়।

পড়তে পড়তে একসময় মনে হলো— এতই যখন পড়লাম এবার লিখলে কেমন হয়। পুলিশের চাকরিতে কত রকম পরিস্থিতির মোকাবিলা করছি, সেসব অভিজ্ঞতার কথা লিখলে ‘বিষাদসিন্ধু’র চেয়ে বড় উপন্যাস রচনা সম্ভব; কিন্তু উপন্যাস লেখার জন্য যে দম লাগে, তা আবার আমার নেই।

 

দুই.

গল্পটি এক ডেলিভারি তরুণের; যে বাসায় বাসায় অর্ডার করা পণ্য পৌঁছে দেয়। ছেলেটির নাম সুজন। বয়স আঠারো-উনিশ হতে পারে।

আমি ওকে বললাম, ইতিমধ্যে তোমার সম্পর্কে অনেক তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। তুমি যে কাজটি করছ, তা অনেক দেশে স্বীকৃত। টাকার বিনিময়ে নারীদের সঙ্গ দেওয়া ও শারীরিক চাহিদা মেটানো উন্নত দেশে অনেক আগে থেকেই চলে আসছে; গোপনে চলছে আমাদের দেশেও।

আমার মুখে এমন কথা শুনে সুজন কিছুটা স্বাভাবিক হয়। চেহারায় এতক্ষণ আতঙ্কের যে ছাপ ছিল, তা কেটে যায় নিমেষে। ও বলল, যদি অভয় দেন আপনাকে সব কথা বলব। কিছু লুকাব না।

আমি ওকে আশ্বস্ত করতে বললাম, তোমার কোনো ক্ষতি হবে না; আমাকে শুধু সত্য কথা বলো।

অবশ্যই বলব। বলুন, আপনি কী জানতে চান। ছেলেটির কণ্ঠস্বর বেশ স্পষ্ট।

 

সুজনকে আমি জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলাম একটি খুনের মামলার সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে। বনানীর একটি ফ্ল্যাটে নুসরাত আমিন নামের মধ্যবয়সী এক নারী খুন হয়েছিলেন তখন। সন্দেহের তির ওই নারীর স্বামীর দিকে ছিল; তবে তার ফোনের ডায়াল লিস্টে সুজনের নম্বর অনেকবার থাকায় ওর সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন পড়ে। তাছাড়া আমার কাছে তথ্য ছিল ওই ফ্ল্যাটে সুজনের যাতায়াতের ব্যাপারে। পুলিশ হিসেবে অপরাধ স্বীকার করানোর জন্য আসামিকে মারধরের চেয়ে আমি মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগে বিশ্বাসী। কৌশলটি অনেকবার বেশ কাজে দিয়েছে; ঠিক চিহ্নিত করেছি প্রকৃত অপরাধীকে। অপরাধী নিজের মুখে সব স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। এ জন্য আমার বেশ সুনাম আছে বাহিনীতে।

 

নুসরাত আমিনকে তুমি কীভাবে চিনতে? সুজনকে প্রশ্ন করলাম আমি।

চাকরির সূত্রে। অর্ডারের পণ্য পৌঁছে দিতে গিয়ে পরিচয়। তিনি প্রায়ই কল দিয়ে তার ফ্ল্যাটে যেতে বলতেন। আমি তাকে সঙ্গ দিতাম। আনন্দে সময় কাটাতাম দুজন। তিনি আমাকে ভীষণ পছন্দ করতেন। ভালোবাসতেন।

কেবল কি সঙ্গ? অন্য কোনো সম্পর্ক ছিল না?

ছিল। আমাকে তিনি সেক্স পার্টনার হিসেবে ব্যবহার করতেন।

এই সম্পর্ক কত দিনের?

বছরখানেক হবে।

তিনি তোমাকে কেমন টাকা দিতেন?

যখন যা চাইতাম। কখনো ফেরাতেন না। সব সময় আমাকে খুশি রাখার চেষ্টা করতেন।

নুসরাত আমিন কি তোমার প্রথম?—আমি জানতে চাই।

তা বলা যায়। তার হাত ধরে আমি এই লাইনে আসি। আগে এ বিষয়ে কিছু জানতাম না। এখন আরও ক্লায়েন্ট আছে। তবে তার চাওয়াকে আমি অগ্রাধিকার দিই।

কোথায় থাকেন তোমার এসব ক্লায়েন্ট?

বিভিন্ন জায়গায় থাকেন। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বারিধারা, বনানী, গুলশান, উত্তরা, মিরপুর, মহাখালী।

কল দিলেই কি চলে যাও?

না। সেটা সময় ও সুযোগের ওপর নির্ভর করে। তবে আমার রেট ফিক্সড।

কেমন টাকা পাও?

এক রাতের জন্য পাঁচ হাজার টাকা। হাতে সময় থাকলে ডাকলেই চলে যাই। খুশি হয়ে অনেকে বকশিশ দেয়। ভালো ভালো জিনিস খাওয়ায়। আমারও চেষ্টা থাকে কাস্টমারকে খুশি রাখার; তাদের খুশি রাখলে লাভ আমার। বারবার ডাক পড়ে। তবে নিজে থেকে কাউকে আমি কল দিই না। তারাই প্রয়োজন ও সুবিধামতো ডেকে পাঠান।

নুসরাত আমিনের স্বামী রফিকুল আমিন সাহেব কি তোমাকে চিনতেন? মানে তোমাকে কি কখনো দেখেছেন?

না। দেখেননি। পরিচয় ছিল না। তবে ম্যাডাম মাঝে মাঝে বলতেন, তার স্বামী আমার বিষয়টি জানতে পারলে তাকে হয়তো খুন করে ফেলবেন। এ জন্য আমাকে তিনি ডাকতেন ভদ্রলোক বাইরে থাকার সময়।

স্বামীর সঙ্গে তার বনিবনা ছিল না বলে অনুমান করতাম। তার কোনো সন্তান ছিল না; সেজন্য মনে অনেক কষ্ট ছিল। সেই কষ্টের কথা আমার কাছে বারবার প্রকাশ করতেন। অনেক সময় আফসোস করে বলতেন, স্বামীর কাছ থেকে টাকা ছাড়া তিনি কিছুই পাননি। আরও বলতেন, আমার কাছে নাকি তিনি সুখ পেয়েছেন। তাই আমাকে ভালোবাসেন।

তিনি তোমাকে কেমন কেয়ার করতেন?—আমি জানতে চাই।

আপনি বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আমার জন্য তিনি পাগল ছিলেন। আমার ভালো-মন্দের দিকে ভীষণ খেয়াল রাখতেন। কথাগুলো বলার সময় সুজনের কণ্ঠ একটু কেঁপে ওঠে।

 

সুজনের সঙ্গে সেদিন আরও কথা হয়। আমার কৌশলের কাছে হার মেনে কোনো ধরনের সংকোচ ছাড়াই ওর আদ্যোপান্ত শোনায়।

 

তিন.

সুজন ওর বাবাকে কখনো দেখেনি। বাবার প্রসঙ্গ মা কখনো তুলতেন না। ওর জন্মের তিন মাস আগে বাবা মারা যায় বলে মা জানিয়েছেন। তবে ওর ধারণা, মা ওকে সত্য কথা বলেননি। তাদের ডিভোর্স হয়েছিল কিংবা বিয়েই হয়নি। মা হয়তো কোনো বড়লোকের রক্ষিতা ছিলেন; প্রয়োজন শেষে ভদ্রলোক ছুঁড়ে ফেলেছিল মাকে। ওর চেহারায় যে আভিজাত্যের ছাপ, এটা তার সাক্ষ্য বহন করে।

ছোটবেলায় সুজন খেয়াল করত, ও যখন স্কুলে কিংবা বাইরে থাকত তখন ওদের বাসায় অন্য লোক আসত; মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যেত ওর সঙ্গে। মা সেজেগুজে কখনো একা একা বাইরে যেতেন। কখনো রাতে বাসায় ফিরতেন না।

একটু বড় হওয়ার পর চারপাশের লোকজন মায়ের নামে যখন খারাপ কথা বলত, ও প্রতিবাদ করত না। ওর মনে হতো, তারা যা বলছে, তা একটুও মিথ্যে নয়। না হলে ওদের সংসার চলছে কীভাবে! কে জোগায় দুজনের খরচ। তবে প্রশ্নটি করে ও মাকে কখনো বিব্রত করতে চাইত না।

যেসব লোক ওদের বাসায় আসত, তারা সুজনকে আদর করত। তাদের আঙ্কেল বলে ডাকত ও। এমন একজন আঙ্কেল, যার নাম মাখন, ওর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। মাখন আঙ্কেল পিতৃস্নেহে ওকে আগলে রাখতে চাইতেন। কাছে-দূরে বিভিন্ন জায়গায় তিনি ওকে ঘুরতে নিয়ে যেতেন; দিতেন ওর হাতখরচের টাকাপয়সা। এভাবে মাখন আঙ্কেল জয় করে নিয়েছিলেন ওর ছোট্ট মন। মাঝে মাঝে তিনি ওর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতেন। জড়িয়ে ধরতেন। চুম্বন করতেন। তবে সেসব কথা সুজন মাকে কখনো বলত না। কারণ আঙ্কেল নিষেধ করেছিলেন।

সুজন যৌনতার বিষয়গুলো মাখন আঙ্কেলের কাছেই শিখেছিল। মেয়েদের বিষয়টি তিনি ওকে বুঝিয়েছিলেন। সেসব বোঝাতে একসঙ্গে থ্রিএক্স দেখতেন। ও বেশ মজা পেত মাখন আঙ্কেলের সাহচর্যে। তবে ওর আকর্ষণ ছিল মেয়েদের প্রতি; ওকে ব্যবহার করলেও আঙ্কেল সেটা বুঝতে পারতেন।

বড় হওয়ার পর বন্ধুদের কাছে জেনে ও বুঝতে পারে, মাখন আঙ্কেল বাই-সেক্সুয়াল। তবে ও কখনো আঙ্কেলকে অশ্রদ্ধা করেনি; বরং ভালোবেসেছে। মিশেছে বন্ধুর মতো। সাড়া দিয়েছে তার আহ্বানে। ডেলিভারি বয়ের চাকরিটা ও পেয়েছিল মাখন আঙ্কেলের সুপারিশে।

বয়ঃসন্ধির সময় থেকে বিভিন্ন বয়সী মেয়েরা যে ওর দিকে তাকাত, সুজন তা খেয়াল করত। সাড়াও দিত মেয়েদের আহবানে। দেখতে সুজন খুব সুদর্শন; চোখে পড়ার মতো। বুদ্ধিমানও। প্রয়োজনানুযায়ী কথাও বলতে পারে বেশ গুছিয়ে। কথার মধ্যে কোনো ধরনের জড়তা নেই। চেহারায় আছে আকর্ষণীয় ক্ষমতা। বিশেষত ওর মায়াবী চাহনি। ওই চাহনিতে মেয়েরা সম্মোহিত হয়ে পড়ত। তার সঙ্গে বডি ফিটনেস ও চুলের সৌন্দর্য ওকে এনে দেয় আলাদা ব্যক্তিত্ববোধ। চলাফেরায় সেই ব্যক্তিত্ববোধ ও বজায় রাখার চেষ্টা করত; কারও কাছে নিজেকে হালকা করত না।

এই বয়সে সুজন অনেকবার সম্পর্কে জড়িয়েছে। সম্পর্ক বলতে প্রেম নয়, কেবল শারীরিক মিলন। সহপাঠী থেকে শুরু করে প্রতিবেশী, সিনিয়র-জুনিয়র অনেক মেয়ের কাছ থেকে ও সুযোগ নিয়েছিল। সুযোগ তারাই করে দিয়েছিল। তবে ও কারও কাছে কখনো দায়বদ্ধ থাকতে চায়নি। তাই দ্বিতীয়বার যেত না।

চাকরিতে ঢোকার কয়েক দিনের মধ্যে প্রথম ঘটনাটি ঘটে। পণ্য ডেলিভারি দিতে গেলে নুসরাত আমিন সুজনকে ড্রয়িংরুমে বসতে অনুরোধ করেন। সেদিন বাসায় একা ছিলেন তিনি। আদর-আপ্যায়নে ও মুগ্ধ হয়ে একেবারে মোমের মতো গলে যায়। কারণ এমন আতিথেয়তা ও জীবনে কখনো পায়নি। বাসার খবর জানতে চান নুসরাত। ও প্রশ্নের উত্তর দেয় কেবল। নিজে কিছু জানতে চায় না। কথায় কথায় ওরা দুজন কাছাকাছি চলে আসে; বাড়ে ঘনিষ্ঠতা।

সুজন খেয়াল করে, কথা বলার সময় নুসরাত বারবার ওর মুখের দিকে চেয়ে থাকেন। একবার কাছে এসে আদর করে হাত বুলিয়ে দেন চুলে। নুসরাত হঠাৎ ওকে বললেন, তুমি যদি কিছু মনে না করো তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।

আমি কিছু মনে করব না। আপনি বলতে পারেন। আমি আপনার ছেলের মতো। সুজন বলল।

আমার শরীর একটু ম্যাসাজ করে দিতে পারবে?

সুজন ভূতগ্রস্তের মতো চমকে উঠে নুসরাতের দিকে তাকায়। কিছু না বলে চুপ করে থাকে।

ওর চাহনি দেখে নুসরাত ভয় পান; ফ্যাকাশে হয়ে যায় মুখ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, সরি। আমার এভাবে বলাটা ঠিক হয়নি।

না না। আমি কিছু মনে করিনি। আসলে আমি সংকোচ বোধ করছিলাম।

কেন?

সত্যি বলতে কি, ছোটবেলা থেকে মাকে আমি ম্যাসাজ করে দিতাম। তার ব্যাক পেইনের সমস্যা আছে। সুজন বলল।

নুসরাত তখন বললেন, যেহেতু তোমার অভিজ্ঞতা আছে, সমস্যা হবে না। ম্যাসাজ করে দিলে পারিশ্রামিক হিসেবে তোমাকে আমি টাকা দেব। প্রায়ই পার্লারে গিয়ে আমাকে ম্যাসাজ করাতে হয়; ব্যাক পেইনের ট্রিটমেন্ট হিসেবে। টাকা দিলেও কাজের কাজ কিছু হয় না।

টাকার কথা শুনে নড়েচড়ে বসে সুজন। সেদিন ওর টাকার খুব প্রয়োজন ছিল। এক বন্ধু ওর কাছে এক হাজার টাকা পেত; কয়েক দিন আগে ধার করেছিল মদ খাওয়ার জন্য। বন্ধুটি সকালেও টাকাটা ফেরত চেয়েছিল।

সম্মতি পেয়ে হাত ধরে নুসরাত বেডরুমে নিয়ে যায় ওকে।

রুমের পর্দা টেনে নীল বাতি জ্বালিয়ে দিলে সুজন সতর্ক হয়ে ওঠে; মনে কিঞ্চিৎ ভয় জাগে। একটি বড় কাঁচের গ্লাসে নুসরাত হালকা রঙিন পানীয় ওকে খেতে দেন। মুখে দিয়ে ও বুঝতে পারে পানিতে হুইস্কির মতো নেশাজাতীয় কিছু মেশানো।

চুমুক দিতে দিতে ওকে হাত-পা, পিঠ ও কাঁধ টিপতে বললেন নুসরাত। সুজন টের পায়, বডি ম্যাসাজ করতে গিয়ে ওর পুরুষাঙ্গ শক্ত হয়ে আছে। তা অনুভব করে নুসরাত ওকে বললেন, তুমি কিছু মনে না করলে তোমার শরীরটা একটু আমাকে দেখাও।

সুজন ততক্ষণে ঘোরের জগতে। প্রত্যুত্তর না করে মুহূর্তে দিগম্বর হয়ে যায়। ওর খালি গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে নুসরাত বিভিন্ন ধরনের যৌন-উদ্দীপক প্রশ্ন করতে থাকেন। জানতে চান কোনো মেয়ের সঙ্গে কখনো কিছু হয়েছে কি না।

ওর হ্যাঁ-বোধক উত্তর শুনে মোট কয়বার হয়েছে নুসরাত জানতে চান। ও কিছু গোপন না করে সব সত্য কথা বলে। তাতে নুসরাতের সাহস বেড়ে যায়। তিনি আরও একধাপ এগিয়ে আসেন; জড়িয়ে ধরেন ওকে। ওর নাকে লাগে নুসরাতের পারফিউমের কড়া গন্ধ।

সুজনের কাছে খুব ভালো লাগছিল। অন্য রকম এক অনুভ‚তি ছড়িয়ে পড়ছিল ওর সারা শরীরে। স্পর্শ আর এসব কথায় ওর শরীরে বিদ্যুৎ চমকে ওঠে। শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। হাত-পা কাঁপে, যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে ও।

ও নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; সঁপে দেয় নুসরাতের হাতে। পরবর্তী এক ঘণ্টা নুসরাত যা বলেন, ও বিনা প্রশ্নে তা করে।

বিদায়ের সময় পরিতৃপ্ত নুসরাত ওকে বললেন, মাঝে মাঝে তোমাকে কল দেব। এসে আমাকে এভাবে আনন্দ দেবে। তুমি কি আসতে পারবে? আপত্তি নেই তো?

ওর দ্বিধাবোধ দেখে নুসরাত বললেন, এলে তোমাকে টাকা দেব। যা চাও তা পাবে। এই কথা বলে ওর পকেটে কিছু টাকা গুঁজে দেন।

সুজন মনে মনে হাসে। মহিলা পাগল নাকি! কথা না বাড়িয়ে মোবাইল নম্বর দিয়ে বের হয়ে যায় ও। বাইরে এসে পকেট থেকে বের করে গুনে দেখে পাঁচ হাজার টাকা। খুশিতে ও লাফ দিয়ে ওঠে। বন্ধুটিকে ফোন দিয়ে বলল, রানাকে নিয়ে এক্ষুনি চলে আয় পিককে। আজকে খেলা দারুণ জমবে। তোদের কোনো টাকা লাগবে না। সব খরচ আমি দেব।

তারপর থেকে নুসরাত ওকে প্রায়ই ফোন দেন; একা থাকলে বাসায় আসতে বলেন। সপ্তাহে অন্তত তিনবার। সুজন ফেরাতে পারে না নুসরাতের আহ্বান। ওকে নুসরাত চুম্বকের মতো টানে; মদের মতো একরকম নেশা ধরে যায়।

সুজন ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। বদলে যায় বেশভূষা। মন-মানসিকতা। একদিকে শারীরিক পরিতৃপ্তি, অন্যদিকে মোটা অঙ্কের টাকা সম্পূর্ণ বদলে দেয় ওকে। শুরু হয় ওর অনিয়ন্ত্রিত জীবন। সন্ধ্যার পর বন্ধুদের নিয়ে ও প্রায়ই বারে সময় কাটায়। কখনো রাতে বাসায় ফেরে না। ওর এই পরিবর্তন মা ঠিক টের পান; কিন্তু কিছু বলেন না। বাধা দেন না ওর স্বাধীনতায়।

সুজন খেয়াল করে, যখন পণ্য পৌঁছে দিতে যায়, মহিলারা ওর দিকে বারবার তাকায়। তাদের চোখ দেখে ও বুঝতে পারে তারা কী চান। তখন ও ইচ্ছে করে আরও স্মার্ট হওয়ার ভাব দেখায়। মহিলার ভাবগতি ইতিবাচক মনে হলে সুজন বলে, আপা, আমাকে এক গ্লাস পানি দেবেন।

মহিলাটি যদি ওকে ড্রয়িংরুমে বসতে বলেন, সুজন ধরে নেয় যে, এই পাখি খাঁচায় ধরা পড়তে পারে। পানি দিতেই প্রশংসা করে ও বলে, আপা, আপনি তো খুব সুন্দর; দেখতে একেবারে ঐশ্বরিয়া রায়ের মতো।

এভাবে ও কথার পিঠে কথা ছুড়ে দেয় অনায়াস ভঙ্গিতে। এমন মনভোলানো কথা আর বাকপটুতায় ও দ্রুত পটিয়ে ফেলে নারীদের। খুশি হয়ে তারা ওকে এটা-সেটা খাওয়ান। আদান-প্রদান করেন মোবাইল নম্বর। তারপর হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো ও ফেসবুক মেসেঞ্জারে চ্যাট করে। এভাবে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া।

দিনে দিনে অনেক নারীর সঙ্গে সুজনের সম্পর্ক হয়ে যায়। যখন ওর স্থায়ী কাস্টমারের সংখ্যা দশে পৌঁছায়, ও চাকরি ছেড়ে দেয়। মাসে পনেরো হাজার টাকার জন্য চাকরি করে আর কী হবে! তবে এই চাকরির কাছে ও সব সময় কৃতজ্ঞতা বোধ করে।

মহিলারা সুজনকে ঘুরতে নিয়ে যায়। কেবল দেশের ভেতরে নয়, বিদেশেও। কত রকমের জিনিস উপহার দেয়। রঙিন পাখায় ভর করে ও যেন উড়তে থাকে আকাশে।

সুজনের মা ছেলের বুদ্ধিমত্তায় বেজায় খুশি। ছেলে যে তাকে সব দিক থেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তা দেখে মায়ের আনন্দের সীমা থাকে না।

তবে এতজন ক্লায়েন্ট থাকলেও সুজন বেশি সময় দিত নুসরাত আমিনকে; অন্যদের অ্যাপেয়ন্টমেন্ট দিত তার সঙ্গে মিলিয়ে।

 

চার.

নুসরাত হত্যা মামলার রহস্য বের করতে গিয়ে লেগে যায় জট। কোনো সুরাহা করতে পারছিলাম না। তার স্বামী, কাজের লোক, দারোয়ান থেকে শুরু করে অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ফ্ল্যাটে কারা কারা আসা-যাওয়া করত, সবার তথ্য সংগ্রহ করি। তাদের সঙ্গেও কথা বলেছিলাম।

সব মিলিয়ে আমি নিশ্চিত এই খুনের সঙ্গে সুজন কোনোভাবেই জড়িত ছিল না। যেদিন নুসরাত আমিন খুন হন, সেদিন সুজন ছিল নেপালে। এই তথ্য পাই জাহানারা পারভীন ও জাহাঙ্গীর আলম দম্পতির কাছে। এই নিঃসন্তান দম্পতি ওকে বেড়ানোর জন্য সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন।

সুজনের কথার সূত্র ধরে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আমি জাহাঙ্গীর আলমকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছিলাম।

 

সুজন কি গত পরশু আপনাদের সঙ্গে ছিল? জাহাঙ্গীর আলমকে প্রশ্ন করলাম আমি।

হ্যাঁ। আমরা পাঁচ দিনের ভ্রমণ শেষে গতকাল সকালে নেপাল থেকে ফিরেছি। জাহাঙ্গীর আলম উত্তর দিলেন।

ওর সঙ্গে আপনার পরিবারের কী সম্পর্ক?

আমার স্ত্রী ওকে খুব স্নেহু করেন। ছেলের মতো।

শুধু ছেলের মতো? তাদের মধ্যে কি অন্য কোনো সম্পর্ক নেই? জানতে চাই আমি।

এত কথা আপনাকে বলতে হবে কেন? আপনি যা জানতে আমাকে ডেকেছেন, তা যেহেতু জেনে গেছেন, এখন যেতে দিন। একটা কথা শুনে রাখুন, এই খুনের সঙ্গে সুজন কোনোভাবে জড়িত নয়। সে খুন করতে পারে না। কথা বলতে গিয়ে জাহাঙ্গীর আলম খানিকটা উত্তেজিত হয়ে যান।

খুন হয়তো সে করেনি; তবে খুনের নেপথ্যে ওর ভূমিকা আছে। সুজনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই নুসরাত আমিন খুন হয়েছেন। আমি বললাম।

ছেলেটাকে ছেড়ে দিন। জাহাঙ্গীর আলমের কণ্ঠে আকুতি।

সুজনের ব্যাপারে আপনার এত সফট কর্নারের কারণ কী? আমার কণ্ঠস্বর বেশ কর্কশ শোনায়।

আমার স্ত্রী ওকে ছাড়া থাকতে পারবে না।

 

 

লেখক পরিচিতি: পলাশ মজুমদার। জন্ম ১৯৭৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ফেনীর পরশুরাম উপজেলার কোলাপাড়া গ্রামে। বসবাস ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্সে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

‘জনৈক বিনিয়োগকারীর আত্মহত্যা প্রসঙ্গে’ তাঁর দ্বিতীয় প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। প্রকাশকাল ২০২২ একুশে বইমেলা। প্রকাশক বিদ্যাপ্রকাশ। ‘দিব্যপুরুষ’ তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। প্রকাশকাল ২০২১ একুশে বইমেলা। ‘হরিশংকরের বাড়ি’ তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। প্রকাশকাল ২০২০ একুশে বইমেলা। প্রকাশক বিদ্যাপ্রকাশ। প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ : বাংলা দেশে বাঙালির দেশে (ভ্রমণকাহিনি)। ২০১১ একুশে বইমেলা। প্রকাশক শুদ্ধস্বর।

প্রধান সম্পাদক: সম্প্রীতি সাহিত্য পত্রিকা।

ই-মেইল: pmazumder1979@yahoo.com

আরো পড়ুন: আকিব শিকদারের গল্প