আইতেন মুতলু’র অনুবাদ কবিতা: মহুয়া দাস

বাতাস

মহিলাটি একটি ছোট্ট বালুকণার

চেয়েও ছোট যেন,

আর তার যন্ত্রণা?

সমুদ্রের বিস্তৃতিও সে যন্ত্রণার কাছে কিছুই নয়।

 

সেই কবেকার পুরনো বাতাস

বয়ে যাচ্ছিল শনশন ,

সমুদ্র আর আকাশের ছায়াপথ

নির্বিশেষে

তার বয়ে যাওয়া।

 

আর মহিলাটি হেঁটে যাচ্ছিল গন্তব্যবিহীন,

যত বেদনার স্মৃতি বয়ে,

তার গন্তব্য কোন বালিয়াড়ির দিকে নয়,

নয় কোন তারার পানেও ।

 

 

 তোমার মুখ এবং ঘন্টাধ্বনি

তোমার সঙ্গে খুব হাসতে ইচ্ছে করছিল প্রাণ খুলে,

যেন সেই বসন্তের দিন আবার।

স্পর্শ করতে ইচ্ছে করছিল তোমার মুখখানি,

রুনুঝুনু শব্দে যেন বেজে উঠল বলে।

খোসা ছাড়ানো ডালিমের মত

রক্তাভ, অশ্লীল অথচ শান্ত

তোমার মুখ।

রোদেলা দুপুরের ইঙ্গিত যেন

তোমার মুখখানি।

 

বসন্ত এল বলে।

সেই সাক্ষাৎস্থলে  ,

তোমার মুখে আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম

এক আকাশ সমুদ্র যেন।

পাখিরা বিষাক্ত তীরের মত

উড়ে বেড়াচ্ছিল সেখানে।

গ্রীষ্ম যেন এক কানাগলির

দেওয়ালে মুখ থুবড়ে পড়ে।

 

তোমার মুখের বাকি অংশটুকু

জুড়ে এক জংধরা ছায়া,

ফিরে যাওয়া অরণ্য, শোকস্তব্ধ পুষ্পরাজি যেন,

ভেঙে যাওয়া কাচের মতো

বসন্তের রং যত।

 

পাখিরা তাদের আকাশকে হারিয়ে কিভাবে মেনে নেয় সব কিছু?

বুঝি না।

 

হায়,আমি বৃষ্টিকে বুঝতে

বড় দেরি করে ফেলেছি।

খোসা ছাড়ানো ডালিমের মতো

আমি পরাজিত ও বিক্ষুব্ধ  দাঁড়িয়ে ছিলাম।

বসন্ত তার বিলাপ শেষ করেছে,

তারই সঙ্গে উধাও হয়ে যাচ্ছিল তোমার মুখখানি

দূরাগত ঘন্টাধ্বনির মতো।

 

 

মৃত্যুর মতো

এখানে ভালোবাসার খেলা শেষ হয়েছে।

মৃত্যুর মতো থমথম করছে রাত্রি ।

 

ভালোবাসার রাজ্য ঘুরে দেখা

এখনও বাকি রয়ে গেল।

তুমি ঠিকই বলো,

যত দূরেই যাও,তুমি নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারো না।

যত কাছেই আসো না কেন,

তুমি তোমার তুমিত্ব থেকে বেরোতে পারো না কিছুতেই।

 

আমি স্থবির হয়ে বসে

নৈশপ্রহরের ঘন্টাধ্বনি শুনছি।

ঘন্টা তো নয়, যেন হৃদয়ের ক্ষত

খুঁচিয়ে হাঁ হয়ে যাচ্ছে।

তোমার কন্ঠের বুলেটে যেন প্রাণ দেবে কোন পশু।

 

আমি যতই নিজেকে দূরে সরাতে চেষ্টা করছি,

কিছুতেই পারছি না তোমাকে ছেড়ে বেরোতে।

আবার যতই তোমার নিবিড় নৈকট্য আমাকে তোমার কাছে আনছে,

আমি পৌঁছতে পারছি না তোমার কাছে কিছুতেই।

 

আমি জানি,

তোমার চোখে আমি সোহাগ, স্নেহ ও ভয়ার্ত এক কাঁপুনির সংমিশ্রণ।

এও জানি,

কোথায়, কোন মৃত সাগর সেচে

ঝিনুক থেকে মুক্তোর রক্ত

তুলে আনা যায়।

 

রাত্রি মৃত্যুর মতো বয়ে চলে,

হৃদয়ে আমার অবদমিত আগুন।

আমি এক নিভন্ত চুল্লীর পতাকা উত্তোলিত করতে চাইছি,

তোমার সব থেকে উঁচু মিনারে।

 

রাত্রির ভারী দরজা বন্ধ হচ্ছে।

আমার ভিতরে নীলাভ এক কাচের অন্তহীন ভাঙচুর।

 

আমি পাগলের মতো চুম্বন করছি,

যেন চুমো খাচ্ছি তোমার চোখের পাতায়।

শেষবারের মতো ভালোবাসার অশ্রু

মৃত্যুর মতো চুঁয়ে নামছে।

 

 

আইতেন মুতলু: আইতেন মুতলু – তুরস্কের বিশিষ্ট কবি ও লেখক তিনি। জন্ম বান্দির্মা শহরে। ১৯৭৫সালে স্নাতকোত্তর ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটি থেকে। সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে অবসরপ্রাপ্ত। মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্কুলে পড়াকালীন সময়েই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশ নিতে শুরু করেন। তাঁর গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধ,রচনা, অনুবাদ দেশ বিদেশের বহু পত্রপত্রিকা ও বইতে সমাদৃত। তাঁর ১৪ টি কবিতার বই ও ১৭টি অনুবাদ কবিতার বই পাঠকমহলে সমাদৃত। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন আইতেন মুতলু তাঁর সাহিত্য কীর্তির জন্য।

 

মহুয়া দাস – ভারতের কবি,লেখক, বাচিক শিল্পী ও চিত্রকর তিনি। সম্প্রতি দেশ বিদেশের বিভিন্ন ভাষার কবিতার অনুবাদ কর্মে রত। তাঁর কবিতাও দেশ বিদেশের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এক সময়ে “সানন্দা শ্রীমতী”র চূড়ান্ত পর্বের জন্যেও বিবেচিত হন। ১৪ বছর শিক্ষকতা, বহু টিভি চ্যানেলে সঞ্চালনা, নিউজ রিডিং, লন্ডনের একটি রেডিও চ্যানেলে কন্টেন্ট রাইটিং, খবরের কাগজে সাংবাদিকতা, ভয়েস ওভার সহ বহু কর্মে যুক্ত ছিলেন। ২০২২ সালের আমেরিকার বঙ্গ সম্মেলনের সাহিত্য আসরের শংসাপত্রও তাঁর ঝুলিতে। ৩২০০রও বেশি মঞ্চ অনুষ্ঠানে আবৃত্তি ও সঞ্চালনা তিনি করেছেন। মহুয়া দাসের জন্ম, বেড়ে ওঠা কলকাতায়। পড়াশুনো বেথুন স্কুল ও প্রেসিডেন্সি কলেজে।

 

আরও পড়ুন- আল-মাআরির অনুবাদ কবিতা