মানিক বন্দোপাধ্যায়ের গল্প :বিষাক্ত প্রেম

মানুষের মনের মিল তাে, যখন তখন যেমন তেমন অবস্থায় যার তার সঙ্গে অনায়াসেই হতে পারে। সত্য আর সরলার মনের মিল হতেও একমাসের বেশি সময় লাগল না। অপরে যেখানে বাদ সাধে, মাথা ঘামানােও দরকার মনে করে না, সেখানে সেই মিলন হাতে মনের মিলটাই সাধারণত যথেষ্ট যে মিলনটা মনের মিলের স্বাভাবিক পরিণতি। মনের মিলই তাে প্রেম। কিন্তু সত্য আর সরলার মনের মিলের জন্য প্রয়ােজনীয় মিলনটা যেন তারাই নিপ্রয়ােজনীয় বলে বাতিল করে রেখে দিল। পরস্পরকে না দেখে তাদের মন করতে লাগল কেমন কেমন, কিন্তু তারা কেউ টের পেল না যে একসঙ্গে বসবাস করতে আরম্ভ না করে তাদের আর উপায় নেই।

ঘটনাচক্রে মনের যে তাদের মিল হয়ে গেছে, সরলার চেয়ে এ বিষয়ে সত্যই যেন হয়ে রইল বেশি উদাসীন। একেই তাে লােকটা সে একটু চাপা, তার উপর তার ব্যাবসা হল চুরি—সরলার ঘরে আসা যাওয়াও সে আরম্ভ করেছে একদিন সুযােগমতাে তার গয়না আর টাকা নিয়ে পালাবার মতলবে। জীবনে কোনাে কিছুর অভিব্যক্তি না হওয়াটাই সত্যর পরম কামা। যা কিছু হবার গােপনেই হােক, জীবিকার্জন থেকে জীবনযাপন পর্যন্ত। নিজের মনটা চুরি গিয়েছে জেনে নিজেকে ধন্য মনে করবার মানুষ সত্য নয়।

অবশ্য সরলার ঘরে প্রথম রাত্রে সে এসেছিল প্রচলিত মন-চোরীর বেশে। মন-চোবার বেশটা কিছুদিন আগে সংগ্রহ করেছিল এক ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে। বাড়িতে পর্যন্ত চোরের ভয়ে ব্যবসায়ীরা কেন অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে থাকে তারাই জানে, ব্যবসায়ীটির নিজের ঘরে সত্য সুবিধা করতে পারেনি। তার বিগড়ে যাওয়া ছেলেটার ঘর থেকে কেবল সংগ্রহ করে এনেছিল রাত্রিচর বাবু সাজবাব সরঞ্জাম–ধুতি পাঞ্জাবি, সােনার ঘড়ি, সােনার বােতাম ইত্যাদি। একজোড়া নতুন জুতাে কিন্তু তাকে কিনতে হয়েছিল। তবে জুতো কেনার পয়সাটা জুটেছিল ব্যবসায়ীর বিগড়ে যাওয়া ছেলেটারই মনিব্যাগে। কিন্তু যতই হােক, এমনিভাবে পরের মনিব্যাগ থেকে পয়সা রােজগার করাটা যখন সত্যৰ জীবিকার্জনের উপায়, হাতে আসা পয়সা খরচ করে দামি জুতাে কিনতে হওয়ায় মনটা তার একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিল বইকী। মােটামুটি বলা যায়, জামাকাপড়ের সঙ্গে মানানসই জুতাে কেনার শখটাকে কাজে লাগাবার প্রয়ােজনেই সে সরলার ঘাড় ভাঙবার মতলব ঠিক করেছিল। পায়ের জুতাের মৃদু মসমসানি আওয়াজ কানে এলে মনের মধ্যে কেবলই মৃদু আপাশে আর অস্বস্তি জাগতে থাকবে, এ অবস্থার একটা প্রতিকারের ব্যবস্থা না করে মানুষ কদিন ঠিক থাকতে পারে ? রূপ বলে সরলার কিছু নেই। এ একটা অতি বড়া সম্পদ সরলার–অতি বড় আকর্ষণ। সবাই বুপসি বলবে এমন রুপ যার নেই, কয়েকজন রূপসি বলবে আর কয়েকজন কুরুপা বলবে এমন রূপও যার নেই, রুপ সম্বন্ধে কোনাে একটা মতামত ঠিক করে ফেলবাব অপরিত্যাজ্য দায়িত্ব যে নারীকে দেখে কোনাে পুরুষের পালন করবার প্রয়ােজন হয় না, ভীরু পুরুষেরা তাকে ভারী পছন্দ করে। মেয়েমানুষ কেনা যেসব পুরুষের স্বভাব, তার বড়াে ভীরু। সরলার গায়ে গয়না আর ঘরে আসবাব আছে তাই অনেক।

তবে গায়ের গয়না অধিকাংশই গিলটি করা, ঘরের আসবাব অধিকাংশই নিলামে কেনা। সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস। আসল সােনার গয়নাগুলি সরলা রেখেছে লুকিয়ে, গায়ে রাখার চেয়ে লুকিয়ে রাখলে গয়না যে নিরাপদ থাকে এ খবর জানা থাকায় গায়ের গিলটি করা গয়নার জন্য তার কোনাে আপশােশ নেই। আসবাবগুলি তার আদায় করা উপহার-আদায় করা উপহার যে সাধারণত সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস হয় এ খবরটাও জানা থাকায়, সেকেন্ড হ্যান্ড আসবাবের জন্যও তার কোনাে আপােেশ নেই। তা ছাড়া, তিন পুরুষের একটা ভাঙা খাট আর উইয়ে ধরা আলমারিতে সাজানাে স্বামীর ঘরখানার তুলনায় সাহেববাড়ি নিলামে কেনা আসবাবে সাজানাে ঘরের শােভাই কি কম মনােহর! খাটখানা সরলার নতুন এই ঘরে মদ খেতে খেতে সাতবছর আগে যে লােকটা হার্টফেল করে মরে গিয়েছিল, তার স্নেহের দান। সরলার স্বাধীন জীবনে সেই প্রথম স্নেহ, সেই প্রথম আসবাব। তা হােক। সাতবছরে অনেক স্মৃতি উপে যায়, কিন্তু দামি খাট পুরােনাে হয় না।

এই যে সত। আর এই যে সরলা, কিছুদিন অযাচিতভাবে তারা পরস্পরকে বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করতে লাগল যে, একজনের জন্য অপরের মনে ঘৃণা নেই, বিদ্বেষ নেই, বিতৃষ্ণা নেই, বড়াে ভালাে তারা, বড়াে সরল, আনন্দের নামে হইচই করতে তাদের পটুত্ব অসাধারণ, দুজনের মধ্যে মিল যা হয়েছে তার তুলনা নেই।

তারপর দুজনের হল মনের মিল।

কিন্তু কথাটা যতদিন মিথ্যা ছিল ততদিন বিশ্বাস করানাে গিয়েছিল সহজেই, এখন কে এ কথায় বিশ্বাস করবে? বিশ্বাস করিয়ে লাভও নেই, বিশ্বাস করবার উপায়ও নেই। সােজাসুজি মুখে বলে, আকারে ইঙ্গিতে প্রকাশ করে, বড়ো বড়াে প্রতিজ্ঞা করে দেবদেবীব নামে দিব্যি কেটে জানালেও ফল হবে সেই একই। সত্যর লুকানাে গয়না আবিষ্কারের ফন্দি-ফিকির-যাদের মতাে সরলাকে যেমন ফাপরে ফেলে রেখেছে তেমনি ফাপরেই ফেলে রাখবে, সরলার টাকা আর উপহার আদায়ের চেষ্টা সত্যকে যেমন বিপদগ্রস্ত করে রেখেছে তেমনি বিপদগ্রস্তুই করে রাখবে। মনের মিল হােক বা না হােক, কারাের জন্য সােনার মায়া বিসর্জন দেবার ক্ষমতা যে সত্যর নেই, টাকার মায়া বিসর্জন দেবার ক্ষমতা যে সবলার নেই!

সরলা ভাবে, লােকটা যদি চোর না হত। দাবিদাওয়া নিশ্চয় কিছু কমাম, আদরযত্নের পৰিমাণ নিশ্চয় কিছু বাড়াতাম, বেশি বেশি সময় কাছে রাখবর নিশ্চয় খুব চেষ্টা করতাম। লক্ষ্মীছাড়া যে চোর বদমাশ।

সত্য ভাবে, খুঁড়ি যদি ঝানু না হত! ঘাড় ‘ভাঙার মতলবটা নিশ্চয় বন্ধ রাখতাম, যা রােজগার করি নিশ্চয় সব এনে দিতাম, একটা বােঝাপড়া করে নিয়ে এখানে আস্তানা গাড়তাম; বজ্জাত যে। পাকা কাবলিওয়ালি!

এইসব ভাবে আর দুজনেরই গা জ্বালা করে।

গা জ্বালা করে আর দুজনেই মনে মনে আপশােশ কবে যে, আচ্ছা লেকের পাল্লায় পড়েছি বাবা, ভাবনায় চিন্তায় দেই গেল।

আপশােশ করে আর সত্য ভাবে, যত শিগগির সম্ভব কাজটা হাসিল করে পালাবে। আপশােশ করে আর সরলা ভাবে, আদায়ে একটু ভাটা পড়লেই লােকটাকে তাড়াবে।

একদিন বিকাল বিকাল হাজির হয়ে সত্য বলে, কতগুলাে টাকা পেয়েছি সরলি, আজ একটু ফুর্তি করা যাক, আঁ?

সরলা খুশি হয়ে বলে, কত টাকা পেয়েছিস? কোথায় পেলি? এক চোখ বুজে সত্য মুখের যে ভশি করে তার তুলনা নেই, পেলাম। জগতে পাওয়াটাই সত্য। কী উপায়ে কোথায় কী পাওয়া গেল তার বিচার করতে বসে কেবল তার্কিক। সরলা তাই খুশিতে গদগদ হয়ে বলে, জেলে যাবি বাপু তুই একদিন।

বিপদ মাথায় করে উপার্জন করে এনে পুরুষ যখন হাতে তুলে দেয়, তখনকার মতাে দুর্বল মুহর্ত মেয়েমানুষের জীবনে আর কখন আসে? সরলা গদগদ হয়েছে টের পেয়ে সত্যও গদগদ হয়ে বলে, যাই তাে যাব জেলে, তাের জন্য যাব তাে?—বয়ে গেল।

সরলা আরও গদগদ হয়ে বলে, ইস!

শুনে মনটা সত্যর যেন গলে যাবে মনে হয়। বিবেককে জ্ঞান হয়ে অবধি প্রশ্রয় দেয়নি, তবু কী যেন কামড়ায়। কামড়ায় অবশ্য সেই সাপের মতাে, যে সাপ কোনাে অঙ্গ ছােবল দিলেই সেই অগটা হায়ে যায় অবশ।

তাই মুখখানা বিমর্ষ করে সত্য বলে, এক কাজ করি আয় আজ, একটা বড়াে বােতল এনে রেখে বায়স্কোপ দেখতে যাই চল, ফিরে এসে ফুর্তি জমানাে যাবে। ভালাে করে সাজিস কিন্তু, সবাই যেন হাঁ করে চেয়ে থাকে তাের দিকে।

আশমানি রঙের শাড়িটা পরব? এই জটিল সমস্যার সমাধান করতে সত্যকে একটু ভাবতে হয়।

বেগুনিটা পরলে হত না?

–আচ্ছা পর, আশমানিটাই পর। বেগুনি আর আশমানি দুটোর যেটাই পরিস, এমন দেখায় তােকে মাইরি

–সত্যি যেন তুই কার বউ।

সত্য হাই তুলে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে বলে, গয়নাগুলাে বদলাস কিন্তু গিলটি দেখে লােকে হাসবে, আমার কিন্তু লজ্জা করবে।

এ সমস্যাটা সত্যসত্যই জটিল। সরলা কিন্তু চোখের পলকে মীমাংসা করে বলে, তুই বুঝি ভাবিস গিলটি পরে যেতে আমার লজ্জা হয় না? যা না, টিকিট কেটে আনগে না তুই, আমি এদিকে বােতল-ফোতল আনাই, সেজেগুজে ঠিক হয়ে থাকি।

সত্য সাত বছরের নতুন খাটে চিত হয়ে শুয়ে বলে, টিকিট কাটতে যাব কি, চার আনার টিকিট তাে নয়। দুজনে একবারে গিয়ে টিকিট কাটব।

কিন্তু এ ফিকিবও তার সার্থক হয় না, কখন কোন ফাকে সরলা আসল সােনার গয়নাগুলি গােপন স্থান থেকে বার করে আনে সত্য টেরও পায় না। মুখখানা তার গণ্ডীর হয়ে যায়।

তবু, সরলভাবেই জিজ্ঞাসা করে, কখন বদলালি গয়না? এই তাে মাত্তর। সত্যর বিস্ময় যেন সীমা ছাড়িয়ে যায়। এই মাত্তর!-কোথায় ছিল রে ?

আদায় করা উপহার নিলামে কেনা সেকেন্ড হ্যান্ড আলমারিটার দিকে সােজা আঙুল বাড়িয়ে বিনা দ্বিধায় সরলা বলে, ওই আলমারিতে, আবার কোথা?

এমন নিশ্চিন্ত, নির্বিকার তার স্কুবাব দেবার ভঙ্গি এবং এমন স্পষ্ট জোরালাে তার জবাব যে, এক বিষয়ে সত্য নিঃসন্দেহ হতে পারে। সরলার গয়না কোনােদিন আলমারিতে লুকানাে ছিল না, ভবিষ্যতেও কোনােদিন থাকবে না।

রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে ইচ্ছা হয় বলে সত্য সাত বার করে হাসে। সরলাকে ধরে মারতে ইচ্ছা করে বলে তাকে বেশিরকম আদর করে। একেবারে চরম পন্থা অবলম্বন করা ছাড়া উপায় নেই জেনে মনটা যত তার ভাবনায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে, রসিকতা করে ততই সে সরলাকে হাসায়। সিনেমা দেখিয়ে নিয়ে যায় দেশি ফিলিশি হােটেলে, পচা চপ আর দামি বিলাতি মদ খাওয়ায়। সরলা বলে, ঘরেই তাে ছিল, আবার এখেনে কেন? আজ একটু প্রাণ ভরে ফুর্তি করতে সাধ যাচ্ছে। কেন, আজ কী?

প্রশ্নের ভঙ্গিতে ক্ষীণ একটা সংশয়, মৃদ একটা ভয় ধরা পড়ে। সত্য সাবধান হয়ে বলে, অতগুলাে টাকা রােজগার করলাম যে আজ? বলে দাত বার করে হাসে না, সরলাকে আর বেশিরকম আদর করে না, বেশি বেশি রসিকতা করে হাসায় না।

ঘরে ফেরার কিছুক্ষণ পরে সরলা তাই জিজ্ঞাসা করে, হঠাৎ যে আবার মুখ ভার হল?

প্রশ্নের ভঙ্গিতে ভয় ও সংশয় স্পষ্টতর প্রকাশ পাওয়ায় সত্য আবার সাবধান হয়ে বলে, না মাইরি না। মুখ ভার হয়নি।

জবাবটা স্বাভাবিক হওয়ায়, বড়েরকম কৈফিয়ত না থাকায়, একটু নিশ্চিন্ত হলে সরলা স্মৃতি জমানাের আয়ােজন করে। বােতলের রসালাে বিষে কখন কোন ফঁাকে যে সত্য কাগজের মােড়কের খানিকটা গুঁড়াে বিষ মিশিয়ে দেয়, সে টেরও পায় না। সত্যকে ফাকি দিয়ে লুকানাে গয়না বার করতে সে যেমন পটু, ফাকি দিয়ে তাকে বিষ খাইয়ে দিতে সত্যও তার চেয়ে কম পটু নয়।

বিষে বিষক্ষয় হবার নিয়মটা এ ক্ষেত্রে বােধ হয বাতিল হয়ে যায় এ জন্য যে বােতলের বিশ্বকে লােকে সুধা বলে, মনে করে তাই। মুখ বিকৃত করে সরলা বলে, থুঃ, কী খাওয়ালি আমাকে তুই? কি বিচ্ছিরি স্বাদ।

তা অনুযােগ দিয়ে বলে, বললাম পচা চপ খাস না, তবু তুই খেলি। মর এবার!—নে, পান খা একটা। বলে সস্নেহে তার মুখে পান খুঁজে দেয়।

তারপর সরলা আরও খানিকটা বিষ পান করে আরও কাতর হয়ে বলে, গা কেমন করছে। মাথা ঘুরছে আর খাব না আমি।

সত্য আবাব অনুযােগ দিয়ে বলে, বললাম পান খাস না, তবু তুই খেলি। মর এবার—আয় মাথাটা টিপে দিই।

তারপর সত্যর কোলে মাথা রেখে সবল ছটফট করে, গােঙায়, মুখে গজলা তুলে মরে যাবার উপক্ৰম কবে, বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে সতার মুখের দিকে, দু হাতে সত্যকেই জড়িয়ে ধরে বিষক্রিয়ার হাত থেকে অব্যাহতি খোজে, অপমৃত্যুকে জয় করার চেষ্টায় সাহায্য চায়, আশ্রয় প্রার্থনা করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিথিল, অবসন্ন নিঃশব্দে নিশ্চেষ্ট হয়ে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সপে দেয় সতার হাতে, কিছু চেতনা কেবল থাকে চোখে আর চোখ দেখে মনে হয় ভেতরেও যেন একটা অদ্ভুত নির্বোধ চেতনার সৃষ্টি হয়েছে।

একেই বলে জীবনপাত করে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করা। যার সঙ্গে মনের মিল হয়েছে তাকে মরণাপন্ন করে কিছু গয়না আর টাকা সংগ্রহ করা। বিবর্ণ পাংশু মুখে সত। একে একে সরলার গা থেকে গয়নাগুলি খুলে নেয়, সরলার আঁচলে বাঁধা চাবির সাহায্যে লুকানো ও জমানাে টাকাগুলি খুঁজে খুঁজে বার করে। কিন্তু সব সংগ্রহ করে পালাবার সময় বিষাক্ত প্রেমের বিষক্রিয়ায় সত্যর পাও যেন অবশ হয়ে আসে, মাথা ঝিমঝিম করে। বন্ধ দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে সে মুখ ফিরিয়ে তাকায়। সরলার পড়ে থাকার ভগি দেখে কাৰ সাধ্য কল্পনা করে সে পাকা মেয়ে, জবরদস্ত কাবলিওয়ালি। তাড়াতাড়ি পালানােই ভালাে, কিন্তু সত্য জানে, সমস্ত রাত এ ঘরে কেউ আসবে না, দরজা বন্ধ থাকলে কাল অনেক বেলা পর্যন্ত সরলার খোজ পড়বে না। মুখের গাজলা মুছিয়ে মাথায় একটু জল দিতে কতক্ষণ লাগবে?

সরলার আশমানি রঙের শাড়ির আঁচলেই তার মুখ মুছিয়ে, মুখেচোখে জল ছিটিয়ে এবং অনেক যত্নে বাধা খোপা বাচিয়ে মাথার চুল ভিজিয়ে দিয়ে আব কতটুকু সেবা করা হয়? চুরি করে পালিয়ে যাবার সময় চোরের পর্যন্তু এইটুকু সেবা করে তৃপ্তি হয় না! এমনই আশ্চর্য সেবা করার নেশা!

পাখা দিয়ে বাতাস করতে আরম্ভ করে সত্যর হঠাৎ মনে হয়, মৰবার কথা নয় বটে, কিন্তু যদি মরে যায়? সব বিষের ক্রিয়া তাে সকলের ওপর সমান হয় না। যে বিষে একজনের কিছুই হয় না, সেই বিষে অন্য একজনের মরে যাওয়া আশ্চর্য কী? আর যদি তান না হয়, সরলার অপলক চোখে আর যদি দৃষ্টি না আসে, বক্ষস্পন্দন যদি চিরদিনের জন্য থেমে যায়। অনেকেই জানে সে সরলার সঙ্গে ছিল, খােজ তার পড়বেই। সরলাকে এই অবস্থায় ফেলে রেখে পালালে পালাবার সময়টা সে একটু বেশি পাবে বটে, কিন্তু এই অবহেলার জন্য সরলা যদি মরে যায়, চোরের চেয়ে খুনিকে আবিষ্কার করার জন্য পুলিশের মাথাব্যথাও হবে সেই অনুপাতে বেশি। ধরা পড়লে চোরেব চেয়ে খুনির শাস্তিটাও চিরদিন বেশিই হয়ে এসেছে।

সত্য জান সরলার কিছু হবে না, কাল অনেকবেলায় জ্ঞান হয়ে টাকা আর গয়নার শােকে সে যদি হার্টফেল না করে। যে বিষ যতখানি সরলার পেটে গিয়েছে তার তিনগুণ বিষ পেটে গেলেও সরলার কিছু হবে না, কিন্তু যদি হয়? খুব কি দুর্বল নয় সরলা, খুব নির্জীব? আজ পর্যন্ত যত মেয়েমানুষ সে দেখেছে, তাদের সকলের চেয়ে প্রাণশক্তি কি সবলার কম নয়? এমন কোমল এমন অসহায় জীব জগতে আছে?

ভয়ে সত্যর বুকের মধ্যে মােচড় দিতে থাকে, নিস্পন্দ সরলার দিকে চেয়ে জগতে কারও যে মরবার কথা নয় সেই বিষটুকু সহ্য করার মতাে শক্তসমর্থ সবলা নয় কেন ভেবে ক্ষোভে তাব চোখে জল আসে। এত বেশি রাগ হয় যে, সরলার শিথিল অবসন্ন দেহটা বুকে তুলে তাকে পিযেই মেরে ফেলতে ইচ্ছা হয়। এতদিনের মতলব যে এমনিভাবে ফাস করে দেয়, সেই তাৰ উপযুক্ত শাস্তি। রাগটা খুব বেশি হয় বলে বুকে পিষে মেরে ফেলবার কথাটাই সত্যের মনে আসে, গলা টিপে মেরে ফেলবার সহজ উপায়ের কথাটা খেয়াল হয় না।

একে একে গয়নাগুলি সরলাকে পরিয়ে দিয়ে, তার টাকাগুলি যথাস্থানে লুকিয়ে বেখে, আঁচলে চাবিটা বেঁধে দিয়ে সে সরলার আরও জোরালাে সেবা আরম্ভ করে দেয়। যে অবস্থা ফিরে এলে সে যে বাচবেই এ বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকবে না, সে অবস্থাটা ফিরে আসতে কাল বেলা হবে–মেয়ে কি সহজ ননীর পুতুল ! সত্য একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে। এবার আর সুবিধা হল। যাক কী আর করা যায়, চুরি কবার জন্য খুনি হবার বিপদটা তাে ঘাড়ে করা চলে না। পরের বার অন্য ব্যবস্থা করবে

–আর বিষটিষ নয়। কিছুদিন একসঙ্গে বসবাস কবলে, একদিন কি আর টের পাওয়া যাবে না সরলা গয়নাগুলি কোথায় লুকিয়ে রাখে? যতদিন তা টের না পাওয়া যায়, ততদিন সে এমন ভাব দেখাবে যে সরলাকে ছেড়ে সে একদণ্ড থাকতে পাবে না, সরলার প্রেমে হৃদয় তার টইটুম্বুর।

 

আরও পড়ুন- সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গল্প