প্রেমেন্দ্র মিত্র’র গল্প: কাঁটা

প্রেমেন্দ্র মিত্র’র গল্প: কাঁটা

লাল না সবুজ?

” রৈচ। লাল সিগন্যাল অমান্য যদি করাে তাে দুর্ঘটনা। সবুজ কোথায়? ফিকে-গােলাপী পর্যন্ত নয়। একেবারে শিবু যা বাধিয়েছে! সেই থেকেই ঘাের লাল।। খুনখারাপি ঘাের লাল যে এখন!

. কিসের এত ভয়!—শিবু মরিয়া হয়ে একদিন বলেছিল— হ্যাঁ, শুধু লাল আর সবুজ নিয়েই আছি ক’দিন ধরে। আমরা সব মেনে নিই বলে উনিও জো পেয়ে যান। এতদিন মাঝখানে হলদে টলদে নেই। আমাদের এখানে হয় এর তেঁজলাতে না পেরে পেট ফুলে ঢাক হয়ে গেছে এদিকে। নয় ওস্পার। হয় ধনধান্য পুষ্টে ভরা, নয় ধু-ধু বালির আমি গিয়ে খুঁচিয়ে মুখ খােলালে বর্তে যাবেন। তােরা দেখ চড়া।

না পনেরাে মিনিট বাদেই তােদের ডাকছি। আমার আওয়াজ | বাহাত্তর নম্বর বনমালী নস্কর লেনের কথা যে বলছি পেলেই সব ওপরে চলে আসবি। তা যাঁরা বুঝেছেন লাল সবুজের মানে বুঝতেও তাঁদের পনেরাে মিনিট অপেক্ষা করতে হয়নি। নিশ্চয় বাকি নেই।

পাঁচ মিনিট না হতেই আওয়াজ পেয়েছি। তবে শিবুর হ্যা, লাল সবুজ হল সিগন্যাল। রুখব না এগােবাে তারই গলার নয়, তার পায়ের। নিশানা।

শিবু চটপট সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। হলদের মত মাঝামাঝি না যযৌ ন তস্থৌ দোনামানা না, ভয়ে মুখ শুকনাে টুকনাে নয়, কিন্তু লজ্জায় যেন রঙের বালাই আমাদের নেই। লাল আর সবুজ নিয়ে কালি মেড়ে দেওয়া। আমাদের কারবার।

কি হল কি! —গৌর জিজ্ঞাসা করেছে,—আমাদের না| গােড়া থেকে লালই চলছিল। আমাদের অবস্থাও অতি ডেকে নিজেই নেমে এলি যে? করুণ। দোতালার আড্ডা ঘরে জমায়েৎ হই, কিন্তু আসর গৌরের সরল প্রশ্নের আড়ালে সামান্য একটু ঠাট্টার জমে না। হতাশ নয়নে টঙের ঘরের সিঁড়িটার দিকে তাকাই, খোঁচা হয়ত ছিল কিন্তু সেটা অত তেলে বেগুনে জ্বলে কিন্তু ওই পর্যন্তই। ও সিঁড়িতে আমাদের পা বাড়ানাে নৈব ওঠার মত কিছু নয়।

হ্যাঁ, এলাম! —শিবুর ক্ষুব্ধ চাপা গুমরানি শােনা লেট’ পংক্তি দাগাচ্ছেন, গােড়াতেই তা জানা গেছে। অজানা গেছে—আমায় কি বলেছেন জানাে?

থাকবার জো কি! শিবুর কাছে নিজস্ব সংবাদদাতার বিবরণ তারপর ঘনাদার পড়া হয়ে যাবার পর কাগজগুলাে আমাদের। পাওয়া গেছে।

আড্ডাঘরেই এনে রাখা হয়। এখন আবার তাতে ভুল কি শিবু রীতিমত হৈ চৈ করে টঙের ঘরে গিয়ে ঢুকেছিল। গাফিলি করবার উপায় নেই বনােয়ারীর। ঘনাদার জরুরী যেন মাঝখানে কোথাও কোনাে সুতাে ছেড়েনি। ইয়ালটা নির্দেশটা প্রতিদিন টঙের ছাদ থেকে বেশ জোরালাে সম্মেলনের গলাগলিই চলছে, নাটো-র নামই জানা নেই। গলাতেই ঘােষিত হয়।  আরে কি খবরের কাগজ পড়ছেন অবেলায় বসে আরে বনােয়ারী কোথায় গেলি। কাগজগুলাে নিয়ে যা। বসে!—শিবু খবরের কাগজটা প্রায় টেনে নিতেই গেছে— শেষে কাগজগুলাের ওপর মৌরসী পাট্টার দায়ে না পড়ি! নিচে চলুন। সবাই বসে আছে হাপিত্যেশ করে। আর একটু এ ঘােষণাটা সকালে দুপুরে নয়, ঠিক বিকেল বেলা জোরে নিঃশ্বাস টানুন না। গন্ধ পাবেন। ফ্রয়েড় প্রন্ তাে আড্ডা ঘরে আমরা এসে জমায়েৎ হবার পরই শােনা যায়। নয় যেন মুনি ঋষির প্রতিজ্ঞা ভাঙা প্রলােভন!

বনােয়ারীর যেটুকু দেরী হয় কাগজ নামিয়ে আনতে| যার উদ্দেশ্যে এই বাবিস্তার তিনি কি কালা বােবা আমাদের সেটুকু সবুরও যেন সইতে চায় না। কাগজ এলেই হবার ভান করেছেন?

একটি বিশেষ পাতার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি। না। পেন্সিল হাতে নিয়ে খবরের কাগজটার যে পাতায় বেশী খোঁজাখুঁজি করতে হয় না। ঘনাদার লাল তিনি দাগ দিচ্ছিলেন সেটা শিবুর প্রায় কোলের ওপরেই পেন্সিলের দাগ সূক্ষ্ম-টুক্ষ্ম তাে নয়, একেবারে লাঙ্গলের ফলা যেন নিজের অজান্তে সরিয়ে রেখে তিনি গম্ভীরভাবে শিবুরু দিয়ে যেন টানা। দিকে চেয়ে বলেছেন, আপনাদের ভাবনা করবার: কিছুক্ল রকম বাসা ঘনাদা খুঁজছেন তার একটু নমুনা নেই। যাবার আগে এ ঘরের ভাড়া আমি চুকিয়ে দিয়ে বাগমারা:টু-লেট-এর বিজ্ঞাপন থেকে অবশ্য পাই। যাব। দেখতেই তাে পাচ্ছেন বাসা খুঁজছি।

ঘনাদার বড় খাঁ-টাই নেই। চাহিদা তাঁর যৎসামান্য।  দেখতে শিবু খুব ভালাে রকমই তখন পেয়েছে। মাথা গোঁজবার একটু ঠাই হলেই তিনি যে খুশি, দাগানাে কাগজের বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞাপনের কলমে ঘনাদা তঁার লাল বিজ্ঞাপন পড়লেই বােঝা যায়। পেন্সিলে মােটা মােটা করে দাগ মেরেছেন।  : “এক বিঘা জমিতে বাগান ঘেরা একটি ত্রিতল হাল কিন্তু সে দাগরাজি বা তাঁর টঙের ঘরের ভাড়া মিটিয়ে ফ্যাশানের বাড়ি। আগাগােড়া মােজেইক। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দেবার আশ্বাসে যতটা নয়, তার চেয়ে তুমি’ থেকে উপরে নিচে চারটি শয়নকক্ষ আচ্ছাদিত বারান্দা। গ্যারেজ আপনি’র চূড়ােয় আচমকা চালান হয়েই শিবুর তখন ও অনুচরদিগের পৃথক ব্যবস্থা। ভাড়া মাসিক বারােশত টলটলায়মান অবস্থা।

টাকা।” আমাদের সকলেরও তাই।

কিংবা। ঘনাদা আপনি বললেন তােকে? —শিশিরের চোখ “নবনির্মিত বিশ তলা টাওয়ার বিল্ডিংসের উপর কপালে তােলা প্রশ্ন।

তলার দুটি সংযুক্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যথােচিত আনুষঙ্গি তুই ঠিক শুনেছিস! —আমার সন্দিগ্ধ প্রশ্ন। ক সহ তিনটি করিয়া শয়নকক্ষ ফ্ল্যাট। একটি স্বয়ংক্রিয় হ্যাঁ, হ্যাঁ শুনেছি। একবার নয় অন্ততঃ দশবার।—শিবু ও আরেকটি অনুচর চালিত লিফট।” উত্তেজিতভাবে বলেছে, শেষে হ্যান্ডনােটই না লিখে এর বেশী উঁচু নজর ঘনাদার নেই।দেবার কথা বলেন, তাই পালিয়ে এসেছি।

প্রতিদিন এ লাল পেন্সিলে দাগান বিজ্ঞাপন তাে পড়তেই হ্যাঁ, লাল নিশানা খুনখারাপির রাঙা চোখে পৌঁছােবার হচ্ছে। তার ওপর দুবেলা বড় বড় দুটি টিফিন কেরিয়ারের পর সেটাও অসম্ভব নয়।

সঙ্গে থালা বাটি গেলাসের ঝােলা আর জলের জাগ বয়ে খবরের কাগজের দাগরাজিই প্রথম লাল নিশানা। নিয়ে যাওয়ার মিছিল দেখেও ধৈর্য ধরে ছিলাম। কিন্তু ঘনাদা যে নিত্য নিয়মিতভাবে খবরের কাগজের টু- শিবুর সঙ্গে আমাদের হঠাৎ আপনি হয়ে ওঠাটা ভাবনা ধরিয়ে দিলে। রামভুজের কাছে গােপনে খবরটা তাই নিতে হবে। হল।

গ্র্যান্ড গ্রেট ইস্টার্ন রামভুজ বােঝেনি। কিন্তু হােটেল বড়বাবুর সেবা ঠিক হচ্ছে তাে রামভুজ?

থেকে খাবার আনাবার কথাতেই শঙ্কিত হয়েছে। জি, হ্যাঁ। রামভুজ জোরগলায় জানালে।

আপনি হােটেল কেনাে যাবেন বড়াবাবু শশব্যস্ত হয়ে টিফিন-কেরিয়ার দুটো দুবেলা ঠিক মত ভর্তি হয়ে যাচ্ছে বলেছে রামভুজ,—আপনার খানা তাে আমি ইখানেই লায়ে তাে?

দিচ্ছি। রামভুজ সে বিষয়েও আশ্বস্ত করলে। টিফিন-কেরিয়ার ঘনাদা রামভুজের দিকে স্নেহ ভরেই তাকিয়েছেন এবার। বােঝাই করে পাঠাবার ব্যাপারে কোনাে ত্রুটি নেই। নিত্য তা তুমি আনতে পারাে রামভুজ, কিন্তু এখানকার কিছু নতুন পদ সে নিজে হাতে বেঁধে টিফিন-কেরিয়ারে ভরে নয়। এখানে আমি আর খাব না। বনােয়ারিক দিয়ে পাঠাচ্ছে। টিফিন-কেরিয়ার দুটোয় অরুচির খাইবেন না ইখানে! মুখটা পুরােপুরি হাঁ হয়ে যাবার প্রমাণও পাওয়া যায়নি। এখনাে পর্যন্ত। উঁছা-পোঁছা হয়েই আগে ওইটুকু বলতে পেরেছে রামভুজ। তাে ফিরে আসছে প্রতিদিন।

উত্তর দেওয়াও বাহুল্য মনে করে ঘনাদা শুধু মাথা তাহলে উপায়?

নেড়েছেন দুবার। উপায় ভাববার আগে টিফিন-কেরিয়ারের রহস্যের ঘনাদার এ চরম ঘােষণার পর প্রায় বিহুল অবস্থায় নেমে একটু ব্যাখ্যা বােধহয় প্রয়ােজন।

এসে রামভুজ আমাদের সব জানিয়েছে। ঘনাদা বেশ কিছুদিন থেকে খবরের কাগজের টু-লেট… একটা কিছু ধাক্কার জন্যে আমরা প্রস্তুতই ছিলাম। কিন্তু কলমে দাগ মেরে শুধু বাসা-ই খুঁজছেন না, আমাদের সুটা এমন উৎকট হবে ভাবতে পারিনি। বাহাত্তর নম্বরের অন্নজলও ত্যাগ করেছেন। আমাদের অমন মুহ্যমান দেখে হতাশভাবে জিজ্ঞাসা| তাই তার জন্যে আজকাল একটা নয় দু-দুটো টফি করেছে রামভুজ—হামি এখােন কি কোরবে! হামাকে খানা কেরিয়ারে দুবেলা খাবার যায় তার টঙের ঘরে। সে খাবার তাবাহারসে লাতে বােলিয়েছেন। নিয়ে যায় অবশ্য রামভুজ আর বনােয়ারী। বাহাত্তর নম্বরের লাতে বােলেছেন তাে লাও,—শিবু হঠাৎ চটে উঠেছে, ওপর ওইটুকু দয়া তিনি এখনাে রেখেছেন। রামভুজকেই খাবার লাতে তাে বােলেছেন, পয়সা দিয়েছেন? বাইরে থেকে তার খাবার আনাবার গৌরবটুকু তিনি পয়সা উনি আগে দেবেন!—শিশিরই ঘনাদার মান দিয়েছেন।

বাঁচাতে রুখে দাঁড়িয়েছে, উনি কি তােমার আমার মত হেঁজি প্রথম দিনই রামভুজকে বাধিত হবার এই দুর্লভ সুযােগ পেঁজি যে নগদা দামে সওদা করেন! যত ওপরে তত সব দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “তােমাদের এখানে ভালাে ধারে কারবার, মার্কিন মুলুক হলে ওর ক্রেডিট কার্ড থাকত হােটেল-টোটেল আছে রামভুজ?

তা জানাে! শুধু একটু পাঞ্চ করিয়েই যেখানে যা প্রাণ চায় রামভুজ তখন আমাদেরই পরামর্শে ঘনাদা নিচে না নিতেন। ওপরে তার ঘরে বসেই খাবেন সে কথা জিজ্ঞাসা করতে হ্যা, সেই ভুলই করেছেন নিশ্চয়।—গৌর শিশিরকে এসেছে।

ঠেকো দিয়েছে, বনমালী নস্কর লেনটা ভেবেছেন ফিফ্থ ঘনাদার উক্তির গভীর তাৎপর্য না বুঝে তাচ্ছিল্যভরে অ্যাভেন্যু। জানিয়েছে যে, হােটেল থাকবে না কেন? অনেক আছে। এর পর ঘনাদার ভুলটা আমাদেরই সামলাতে হচ্ছে তার কিন্তু তাকে কি আর হােটেল বলে!

ক্রেডিট কার্ড-এর দায় নিয়ে। হঠাৎ একটু টনক নড়ে ওঠায় উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা তার জন্যে ঝামেলা বড় কম নয়। একটা নয় দু দুটো করেছে—হােটেল কি হােবে বড়াবাবু?

টিফিন-কেরিয়ার আনতে হয়েছে কিনে। থালা-বাটি কি আর হবে!—ঘনাদা যেন নিরুপায় হয়ে বলেছেন, গেলাসগুলাে অবশ্য আমাদের বাহাত্তর নম্বরেরই। ঘনাদা—ভালাে হােটেল থাকলে সেখান থেকেই খাবারটা আনাতাম। সেগুলাে চিনতে পারেননি বা মাপ করে যাচ্ছেন। তা যখন নেই বলছ তখন গ্র্যান্ড কি গ্রেট ইস্টানেই যেতে তা মাপ করাবার জন্যে পুজোও চড়াতে হচ্ছে কি কম!

দুটি টিফিন-কেরিয়ার ভর্তি নৈবিদ্যি দুবেলা পাঠাতে হচ্ছে করেছি সবিস্ময়ে,—ঘনাদার পাতে বেলে মাছ কেন? আমাদের ওই বাহাত্তর নম্বরের হেঁসেলেই রান্না করে। রামভুজকে জবাব দিতে হয়নি। এতক্ষণ মাথা নিচু| সে রান্নার গন্ধ তার টঙের ঘর থেকেই ঘনাদার পাবার করে যে কই মাছের কাটা বাচছিল সেই শিবু মুখ তুলে। কথা, কিন্তু নাকের সে কাজটা তিনি আপাততঃ মুলতুবি চেয়ে এ রহস্যে আলােকপাত করেছে। রেখেছেন বােধহয়। রামভুজ আর বনােয়ারী তার খাবার সহজ সরল গলায় বলেছে, বেলে মাছ আমি দিতে নিয়ে যাবার পরে মাঝে মাঝে তিনি শুধু একটু তারিফ বলেছি। করে তাদের কৃতার্থ করেন।

তুমি দিতে বলেছ!—আমরা হতভম্ব,—আমাদের বেলা হােটেলটা তাে ভালােই খুঁজে বার করেছে রামভুজ। কই আর ঘনাদার বেলা বেলে! রান্নাটান্না তাে বেশ সরেস মনে হচ্ছে। হােটেলটা কোথায়? হ্যাঁ, —শিবু যেন আমাদের এই তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে

এই নিচে বড়াবাবু, রামভুজ লজ্জিত হয়ে বলে,—এই বাড়াবাড়িতেই অবাক—অন্যায়টা কি হয়েছে তাতে! ঘনাদার নিচেই আছে!

কাটাতে ভয়, তাই ওঁর জন্যে আলাদা মােলায়েম মাছ ঘনাদা ওইটুকুর বেশি আর খোঁজ নেওয়া প্রয়ােজন মনে এনেছি। করেন না, এই বাঁচোয়া।

আমরা স্তম্ভিত নির্বাক। কিন্তু এমন করেই বা চলবে কতদিন। চুঁচ হয়ে শুরু নিস্তব্ধ ঘরে শুধু একটু হু’ শােনা গেছে। হয়ে ব্যাপারটা সত্যিই যে ফাল হতে চলেছে! লাল পেন্সিলে না মেঘের চাপা গর্জন নয়, ঘনাদা তার নিজস্ব মন্তব্য টু-লেট বিজ্ঞাপন দাগানাে আর বাহাত্তর নম্বরের পৃথগান্ন ওই ধ্বনিটুকুতে প্রকাশ করেছেন। হওয়ার ব্যাপারটা আরম্ভ হয়েছে অতি সামান্য ছুতাে থেকে তার পর পাত ফেলে উঠে গেছেন কি? না তা ঠিক দোষটা অবশ্য শিবুর। ঘনাদা না হয় পাতে দুদুয়েনিনি, তবে এক মুহুর্তে আমরা যেন তার কাছে হাওয়া প্রমাণ বাটামাছ ভাজা নিয়েও একটু চিপটেন কেটেছিলেন। বছি। আমাদের সাধ্যসাধনা মিনতি যেন তার কানেই বাটা মাছ এনেছ হে! এ যে বড় কাটা! তাই বলে পরে ছােয়নি। দিন ওই শােধটুকু না নিলে চলত না!

E” খাওয়া শেষ করে ঘনাদা ওপরে উঠে গেছেন। আমরা শিবুই আজকাল আমাদের পার্মানেন্ট মার্কেটিং অফিসার। শিবুকে নিয়ে পড়ে তাকে প্রায় ছিড়ে খেয়েছি। কিন্তু হাতের ঘনাদাকে কচি মুলাে খাওয়াবার সেই কেলেঙ্কারির পর মনে তীর ছুটে গেলে ধনুকের ছিলা ছিড়ে খুঁড়ে আর লাভ কি! মনে তার বােধহয় একটু জ্বালাই ছিল। বাজারের সেরা যা হয়ে গেছে তা তাে আর ফিরবে না। বাছাই করা বাটার নিন্দায় সেটা আরাে চাগিয়ে উঠেছে। তবু অল্পে-স্বল্পে রেহাই পাবার আশায় বিকেল না হতেই পরের দিন কি একটা ছুটির তারিখ। দুপুর বেলা বেশ রামভুজকে টঙের ঘরে পাঠিয়েছিলাম। ফল যা হয়েছে তা একটু জমিয়ে খেতে বসে ঘনাদাকে ঘন ঘন আমাদের তাে জানা। সেই থেকেই টিফিন-কেরিয়ারে হােটেলের খানা সকালের থালাগুলাের ওপর চোখ বােলাতে দেখে একটু আর কাগজ দাগানাে লাল মানার দিন চলেছে। অবাক হয়েছি। আমাদের নজরও তখন গেছে ঘনাদার কিন্তু একটা কোনাে নিষ্পত্তি তাে আর না হলে নয়। পাতে

মুস্কিলের যে মূল, আসানের ফিকিরটা তার মাথা| সত্যিই তাে অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আমাদের সকলের পাতে থেকেই বেরিয়েছে। হ্যাঁ শিবু-ই উপায়টা বাৎলেছে নেহাৎ বড় বড় জোড়া কই আর ঘনাদার পাতে কি ও দুটো। রাগের ঝঝটা প্রকাশ করতে গিয়ে। আরে! ও তাে বেলেমাছ! আমাদের কই আর ঘনাদার| লালের জবাব তাে সবুজ! তাই দিতে হবে এবার। বেলে

সবুজ আবার কি জবাব? —আমরা অবাক হয়ে ঠাকুর!—আমরাই ঘনাদার আগে ডাক দিয়েছি। জিজ্ঞাসা করেছি।

কঁচুমাচু মুখ করে রামভুজ এসে দাঁড়াতেই বুঝেছি উনি লাল পেন্সিলে দাগাচ্ছেন! —শিবু ব্যাখ্যা করেছে, ব্যাপারটা নেহাৎ দৈবদুর্ঘটনা নয়।

—আমরা সবুজে দাগাব কাল থেকে! ঘনাদার পাতের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে জিজ্ঞাসা কি দাগাব?

কি আবার! ওই বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপন। —শিবু নিজের সকালের চায়ের ট্রের সঙ্গে চাটাও অন্য হােটেলের প্রস্তাবে নিজেই মেতে উঠে বুঝিয়ে দিয়েছে, আমরাও এ বলেই ধরে নেন ঘনাদা—বনােয়ারী যথারীতি খবরের বাহাত্তর নম্বর ছেড়ে দিচ্ছিতাই কাল সকালে প্রথমেই কাগজগুলাে নিয়ে গিয়েছে টঙের ঘরে। টু-লেট’-এর পাতায় সবুজ দাগ পড়বে।

আমরা সবাই মিলে তখন বাহাত্তর নম্বর থেকেই| শিবুর ওপর যত রাগই করি, ফন্দিটা তার নেহাৎ মন্দ হাওয়া। প্রতিক্রিয়াটা পরে রামভুজের মারফত্ত জানতে নয়। অন্ততঃ ডুবতে বসে শেষে কুটো হিসাবে একবার ধরা পেরেছি। যায়।

সকালে কাগজ উল্টে ঘনাদার চোখ যদি একটু কপালে কিন্তু তাতেই অমন বাজিমাৎ হবে আমরাই কি ভাবতে উঠে থাকে তার সাক্ষী কেউ নেই। কিন্তু দুপুরে টিফিন পেরেছি।

কেরিয়ারে বয়ে নিয়ে গিয়ে তার পাত সাজাবার সময় সবুজ পেন্সিল আগেই যােগাড় করা ছিল। ভােরে উঠে রামভুজকে প্রথমে দু একটা নেহাৎ যেন অবান্তর প্রশ্নের একেবারে রাস্তায় গিয়েই কাগজওয়ালার হাত থেকে জবাব দিতে হয়েছে। ইংরেজী, বাংলা দুটো কাগজই নিয়েছি। তারপর সবুজ দাগ নিচে যে আজ সব কেমন ঠান্ডা মনে হচ্ছে রামভুজ? মেরেছি খাবার ঘরেই বসে বসে।

এমনি একটি ছুতাে পাবার আশাতেই রামভুজকে ভাের | দাগ মেরেছি খুব বিবেচনা করে মাত্র দুটি বিজ্ঞাপনে। থেকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে রাখা হয়েছে। সে আশা বিফল ঘনাদার যেমন আমিরী নজর, আমাদের তেমনি ফকিরী। হয়নি। রামভুজও আমাদের শিক্ষার মান রেখেছে। কোথায় দূরে শহরতলীর কোন এঁদো গলিতে সস্তা ভাড়ায়… ঘনাদা কথাটা পাড়তে না পাড়তেই রামভুজ হতাশ মুখ টালির ছাদের দুটো ঘর। দাগ মেরেছি তাতেই। দাগ মেরেছি কারে জানিয়েছে যে তার আর বনােয়ারীর হয়রানির অন্ত তারও অধম এজমালি উঠোন বাথরুমের আর একটা দুরু ইব্রাবুরা সেই ভাের বেলা বেরিয়েছেন। কখন ফিরে ভাড়ার বিজ্ঞাপনে।

আসলে কে জানে! যতক্ষণ না আসেন তাদের এই হেঁসেল

– সে

…ঘনাদাকে থালাগুলাের ওপর চোখ বােলাতে…।

পাহারা দিয়ে বসে থাকতে হবে।

টেলিগ্রাম কোথায় এ তাে কেবল গ্রাম। ভাষাটা এই— তা ওঁরা গেছেন কোথায়!—এবার ঘনাদার প্রশ্নটা আর PACIFIC COMMAND GUAM ঘােরালাে নয়, গলাটাও তীক্ষ্ণ।

ACCEPTING OFFER BUT ANGRY রামভুজ এবার আসল বােমাটি ছেড়ে যেন অত্যন্ত BECAUSE PRESCRIPTION NOT FOLLOWED কাতরভাবে জানিয়েছে যে বাবুরা নাকি কোথায় নতুন বাসা HOWEVER DON’T PANIC. SHALL SAVE THE দেখতে গেছেন। এ বাড়ি তারা ছেড়ে দেবেন। PACIFIC AGAIN DAS এ বাড়ি ছেড়ে দেবেন! —ঘনাদার গলায় মেঘের মানে বুঝলে কিছু? —শিবুই প্রথম সবাক হল, ঘনাদা। ডাকটা যেন কেমন ঝিমােনাে মনে হয়েছে।

প্যাসিফিক কম্যাণ্ড মানে গােটা প্রশান্ত মহাসাগরের মুরুব্বি| হাঁ বড়াবাবু! রামভুজ চিড়টায় চাড় লাগিয়েছে। কর্তাদের প্রায় ধমকে টেলিগ্রাম করছেন! আপনে ই মােকান ছােড়কে যাচ্ছেন, বাবুরাও তাই ইখানে। গায়ে পড়ে নিজে থেকে টেলিগ্রাম নয়, এটা তাদের আর থাকবেন না।

টেলিগ্রামের জবাব—বিস্তারিত করলে গৌর,—তারা | ব্যস, রামভুজের এর বেশী কিছু বলবার দরকার হয় সাধাসাধি করায় অনেক কষ্টে রাজী হয়েছেন প্রশান্ত নি। দুপুরে একটু দেরী করে ফেরার পর খাবার ঘরে তার মহাসাগরকে আবার উদ্ধার করতে। কাছেই বিবরণটা শুনে ওষুধ একটু যেন ধরেছে বলে আশা ওই আবার কথাটা মনে রেখাে।—শিশির স্মরণ করালে, হল।

তার মানে এর আগেও একবার উদ্ধার করেছিলেন কিন্তু| আশা হবার একটা কারণ ঘনাদার হাত-ফেরতা খবরের… তার বিধান না শােনায় নতুন করে আবার বিপদ বেধেছে। কাগজগুলাে। সেগুলাে নিয়মমতই ঘনাদা ফেরৎ পাঠিয়েছেন বার উদ্ধার করবার আশ্বাস দিয়েও তাই রাগটা জানাতে কিন্তু টু-লেট-এর সারিতে লাল দাগ কোথায়? আমাদের ছাড় সবুজ পেন্সিলের দাগরাজিই সেখানে একেশ্বর হয়ে জলজল কিন্তু এটা লাল না সবুজ? জিজ্ঞাসা করলাম আমি। করছে।

প্রেমেন্দ্র মিত্র’র গল্প

ঠিক! ঠিক!—সবারই এবার খেয়াল হল কথাটা।

হাওয়া একটু ঘুরেছে তাহলে নিশ্চয়। চাল বদলে এবার লাল তাে ঠিক নয়। দ্বিধাভরে বললে শিশির। কোন্ দিকে মােড় ফিরবেন ঘনাদা?

একটু সবজে ঝিলিকই যেন মারছে!—গৌর আশায়| মােড় যা ফিরলেন তা মাথা ঘােরাবার মতই। বিকেলে আড্ডা ঘরে জমায়েৎ হয়ে ঘনাদার পরের চাল আলবৎ সবুজ!—তুড়ি মেরে বললে শিবু। আন্দাজ করবার চেষ্টা করছি এমন সময় সেই টেলিগ্রাম।

হাতে পাঁজি তাে মঙ্গলবার কেন? খসড়াটা নিয়ে আমি না, পােস্টাফিসের বিলি করা টেলিগ্রাম নয়, ঘনাদা টঙের সিঁড়ির দিকেই পা বাড়ালাম। অন্যেরাও আমার রামভুজের হাতে টেলিগ্রাম করতে যা পাঠাচ্ছেন তারই।

পেছনে। শিশির শুধু চট করে নেমে গিয়ে হেঁসেলে কি খসড়া।

যেন বলে এল। রামভুজ সে খসড়া নিয়ে অসহায়ভাবেই আমাদের শরণ পা তাে বাড়ালাম, কিন্তু সিঁড়ির একটা করে ধাপ উঠি আর ধুকপুকুনিও বাড়ে। নিতে এসেছে। কি করবেন ঘনাদা? রঙ চিনতে ভুল যদি হয়ে থাকে বড়াবাবু ই তার আভি তুরন্ত ভেজতে বােললেন। আমি

তাে তাহলে তাে সর্বনাশ। শিবুকে শুধু আপনি’তেই ত কৈসে ভেজবে কুচ্ছ জানি না। কি এত জরুরি টেলিগ্রাম। রামভুজের হাত থেকে নিয়ে।

তুলেছিলেন আর এবার আমাদের হাতে তাে সত্যিই

হ্যাণ্ডনােট লিখে দেবেন। দেখতেই হল খসড়াটা।

যা হবার হয় তােক। এ যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না। কপাল | দেখে খানিকক্ষণ কারুর মুখে আর কোনাে কথা নেই।

ঠুকে তাই ঢুকে পড়লাম টঙের ঘরে। পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে সবাই তখন হাঁ হয়ে।

কই বিস্ফোরণ তাে কিছু হল না। ঘনাদা এক মনে তার আছি।

কলকেতে টিকে সাজাতে সাজাতে একবার শুধু আমাদের দুলল। নমল নম।

দিকে চেয়ে দেখলেন মাত্র। সে চোখে কি ভুকুটি? না তাও শিবু তার গায়ের জ্বালাটা চাপতে না পেরে। তাে নয়।

আমরা তাে তখন দম বন্ধ করে আছি। আর আমাদের পায় কে?

রুচল নাই বলতে পারাে! —ঘনাদা কিন্তু একটু হেসে। ও কেবলগ্রাম পাঠানাে চলবে না ঘনাদা।—গৌরই বললেন,—তবে তা রুচলে সিগুয়াটেরা আর শিঙে-শাঁখ মওড়া নিলে। আমরা তখন তক্তপােশের যে যেখানে পারি ট্রাইটন, স্কুবা গিয়ার আর দশানন রাবণেরও দর্পহারী ষােল বসে গেছি।

থেকে একুশ বাহুবলে বলী সমুদ্র ত্রাস অ্যাকানথাস্টার| পাঠানাে চলবে না বলছ?—ঘনাদাও যেন ভাবিত, প্লানচির কথা অজানাই থাকত, আর প্যাসিফিক কম্যাণ্ডের —কিন্তু ওরা যে আশা করে আছে!

টনক নড়বার আগে অর্ধেক প্যাসিফিকই যেত সত্যি যাকে| থাক্‌ আশা করে! আমাদের মেজাজ গরম, –বলে রসাতলে। যা সে কথা। একবার ডাকলেই আপনি মালকোচা মেরে ছুটবেন নাকি? মাথাগুলাে তখন ঘুরছে কিন্তু ঘনাদাকে যে আবার না আপনার মান সম্মান নেই?

চাগালে নয়! আর তা ছাড়া আপনি তাে একবার উদ্ধার করে আমাদের কথা যেন ভুলে গিয়ে নির্লিপ্ত নির্বিকার ভাবে এসেছেন!—গৌরের জোরালাে যুক্তি, শােনে নি কেন তিনি যে তার গড়গড়ায় টান শুরু করেছেন। আপনার কথা!

চোখের দৃষ্টিতে শিবুকে প্রায় ভস্ম করে ঘাটের কাছে| এখন যদি যেতে হয় তাে শুধু কেল্লগ্রামে হবে না। এ ভরাডুবি বাঁচাবার উপায় খুঁজছি এমন সময় টঙের ঘরের আমাদের ন্যায্য দাবী,—প্যাসিফিক কম্যাণ্ডের মাতব্বরেরা দরজায় স্বয়ং সঙ্কটমােচনের আবির্ভাব। নিজেরা এসে সাধুক!

বেশটা অবশ্য তার বনােয়ারীর আর হাতে সদ্য ভাজা ঠিকই বলেছ। ঘনাদা প্রশান্ত মহাসাগরের জন্যে একট্রিখিদ্রিকে সুবাস ছড়ানাে মশলা পাপরের একটি চ্যাঙাড়ি। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,—কিন্তু মুস্কিল হয়েছে কি জানাে বুঝাল্লাম তাড়াতাড়িতে এর চেয়ে জবর কিছুর ব্যবস্থা একেবারে যে শিরে সংক্রান্তি। এখুনি না রুখতে পারে বলে আসতে পারেনি শিশির। প্যাসিফিক যে ডেড সী হয়ে যাবে দুদিনে। প্রশান্তর বদলে কিন্তু দিনটা আমাদের পয়া। ওই মশলা পাঁপরেই ডবল গরল সাগর!

প্লেট প্রন কাটলেটের কাজ হয়ে গেল। তার আগে ছােট গরল সাগর হয়ে যাবে? কিসে?

একটু ফঁড়া অবশ্য কাটাতে হয়েছে। কিসে আর,—ঘনাদা তাঁর দৃষ্টিটা শিবুর ওপরই ফোকাস ঘনাদা গন্ধের টানেই মুখ ঘুরিয়েছিলেন। বনােয়ারী করে বললেন, কাটায়।

চ্যাঙাড়িটা তার সামনেই সসম্মানে রাখবার পর গড়গড়ার| কাটায়! কিসের কাটা?—শিবু তার অস্বস্তিটা সন্দেহের নলটা সরিয়ে যেন অন্যমনস্কভাবে একটা তুলে নিয়ে কামড় সুরে চাপা দিলে।

দিয়েই হঠাৎ থেমে গিয়ে বলেছেন—নিচে রামভুজের ভাজা| বাটা কি কই-এর কাটা নয়,—ঘনাদা চুটিয়ে শােধ নাকি? নিলেন, কাঁটা হল অ্যাকানথাস্টার প্লানচির, যার আরেক বনােয়ারী কি যেন বলতে যাচ্ছিল। আমরা সবাই এক নাম হল কাটার মুকুট।

সঙ্গে হাঁ হাঁ করে উঠেছি। কি হয় সেই—ওই কি বলে একান যা যা| রামভুজের ভাজা মানে। রামভুজের হাতের পাঁপর এমন| থাক! থাক! জিভে গিঁঠ পড়ে যাবে। ঘনাদার কাছে দাঁতে দিলে কথা বলবে। দস্তুরমত মােড়ের রাজস্থানী শিবুর আজ রেহাই নেই—তার চেয়ে কাঁটার মুকুটই বল। দোকানের পাঁপর। কি হয় ও কাটায় মুকুটে জিজ্ঞাসা করছ? যা হয় তা জানাতে সেই সঙ্গে পাছে বেস কিছু বলে ফেলে বলে। গিয়ে ক্যারােলাইন দ্বীপপুঞ্জের ইফালিক অ্যাটলে সমুদ্রের বনােয়ারীকেও তাড়া দিতে হয়েছে। যা যা দেরী করিসনি। তলাতেই হাড় কখানা মাছেদের ঠোকরাবার জন্যেই প্রায় চা নিয়ে আয় শিগগির। রেখে আসছিলাম।

আমাদের আশ্বাসে নিশ্চিন্ত হয়ে চা আনতে আনতেই মাছেদের রুচল না বুঝি। প্রায় সর্বনাশই করে বসল অর্ধেক চ্যাঙ্গাড়ি অবশ্য একাই ফাঁক করে ফেললেন ঘনাদা। তারপর মৌজ করে তাকে চায়ে চুমুক দিতে দেখে সুতােটা ইফালিকের দুধে ধােয়া বালির তীরে তারা সারাদিন। আবার ধরালাম।

শুধু একটু কোপনি মাত্র পরে জল-খেলা করে। জলে সাঁতার| ইচ্ছে করে একটু ন্যাকাও সাজতে হল,—প্যাসিফিকে ঢেউয়ের ওপর তক্তা ভাসিয়ে ঘােড়ার মত সওয়ার হয়ে। কোথায় কোন টোলের কথা যেন বলছিলেন আপনি! দূর সমুদ্র থেকে তীরে ছুটে আসা, যাকে বলে সারফিং, টোল নয় অ্যাটল!—ঘনাদা খুশি হলেন শুধরে, কখনও বা হাতে পায়ে মাছের ডানার মত ফ্লিপার আর। অ্যাটল কাকে বলে জানাে নিশ্চয়। অকুল সমুদ্রের মাঝখানে মুখে অক্সিজেনের মুখােস নিয়ে সমুদ্রের তলায় ডুব সাঁতার, প্রবালে গড়া এক একটা বালা আর সেই বালার মাঝখানে এই নিয়ে তাদের দিন কাটে। স্বপ্নের মত এক সায়র। মাঝখানের এই সায়রটুকুর জন্যে ইফালিক অ্যাটলে পামার আর তার সঙ্গীদের দেখে আমি অ্যাটল সাধারণ প্রবাল দ্বীপ থেকে আলাদা। আকারেও তা প্রথমে বেশ একটু অবাকই হয়েছিলাম। মাইক্রোনেশিয়ার এক ছােট। প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে অসংখ্য এই সব প্রবাল- অত্যন্ত আদিম গােষ্ঠীর কিছু কিছু লােক ইফালিক ও তার দ্বীপ আর অ্যাটলের ফুটকি ছড়ানাে।

কাছাকাছি প্রবালদ্বীপে ও অ্যাটলে থাকে বলে জানতাম। অ্যাটল তাে নয় সে যেন পৃথিবীতে নন্দনকাননের ম্যালাও-পলিনেশিয়ান ভাষার মূল কিছু ধারা তাদের কাছে নমুনা।

সংগ্রহ করবার আশায় এ দ্বীপে আসা। কিন্তু ইফালিক-এ গিলবার্ট মার্শাল মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে তখন তাদের তাে কোনাে চিহ্নই দেখতে পেলাম না। ক্যারােলাইনে গিয়েছি সেখানকার ম্যালাও-পলিনেশিয়ান পামারকে সেই কথাই গােড়ায় জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ভাষার আদি রূপ খুঁজে বার করতে।

পামার তাচ্ছিল্যভরে কথাটা উড়িয়েই দিয়েছিল। বলেছিল, সেটা রথ দেখা মাত্র। আসল কলা বেচার কাজ হল কে জানে কোথায় গেছে। এখানে থাকলে তাে আমরাই প্যাসিফিকে গােপনে শিঙে-শাঁখের শুমারি নেওয়া আর তার সে: তাড়াতাম। চোরা শিকারীদের শায়েস্তা করা। আই এম. সি: মাল করাটা ঠাট্টা হিসেবেই নিয়েছিলাম। পামার আর তার ইন্টার গভর্ণমেন্টাল ম্যারিটাইম কনসলটেটিভ অর্গানিজেশনই সঙ্গীদের কতকগুলাে রসিকতা কিন্তু একটু বেয়াড়া ধরনের। অবশ্য পাঠিয়েছিল।

যেমন, আমাকে নিয়ে তাদের ঠাট্টা গােড়া থেকেই যেন না, কাশি টাশি নয়। শিবুকে শুধু একটু চোরা রামচিমটি মাত্রা ছাড়িয়ে যেত। কাটতে হল তার জিভের রাশ টানবার জন্যে। আমি আমার ছােট্ট ইয়ল-এ সেখানে গিয়ে নামবার পরই| ক্যারােলাইন দ্বীপপুঞ্জের ইফালিক বলে এক অ্যাটলে অভ্যর্থনাটা একটু জোরালাে রকম পেয়েছিলাম। নােঙর তখন গিয়ে উঠেছি।—ঘনাদা তখন বলে চলেছেন, নামে ফেলে ইয়ল থেকে নামতে না নামতেই তাে পামারের অ্যাটল কিন্তু সত্যিই যেন পরীস্থান। তেমনি তার মাঝখানের কোলাকুলিতে ওষ্ঠাগত প্রাণ, সাড়ে ছ ফুট লম্বা জোয়ান কাকচক্ষুজলের সায়র, তেমনি পরীদের যেন পাউডার পামার করমর্দন করার ছলে হাতের হেঁচড়া টানেই তাে প্রথম বিছানাে তার তীর আর তেমনি তার সারা দিনরাত হাওয়ার বালির ওপর আমায় আছড়ে ফেলল, সেখান থেকে ওঠার দোলা নারকেলের বন।

পরও রেহাই নেই। এক এক করে পামারের তিন সঙ্গীর| ইফালিক অ্যাটলেই পামারের সঙ্গে দেখা। পামার আর হাত ঝকানির উৎসাহে আরাে তিনবার বালির ওপর মুখ তার তিন সঙ্গী মিলে সেই অ্যাটলে বাসা বেঁধেছে। থুবড়ে পড়তে হল। শেষবার ওঠবার পর পামার কাছে পামারকে দেখলে যেন সমুদ্রের তরুণ দেবতা বলেই এসে জড়িয়ে বুকের মধ্যে চিড়েচেপটা করে মার্কিন স্ন্যাংমনে হয়। যেমন লম্বা-চওড়া তেমনি সুঠাম শরীর। শুধু এ যা বললে বাংলায় তা বােঝাতে গেলে বলতে হয়, তাদের মুখগুলাে শরীরের সঙ্গে যেন খাপ যায়। পামার কোথা থেকে এলে বল তাে চঁাদ? আর তার সঙ্গী তিনজন সবাই লম্বা চওড়া জোয়ান, যেন অতি কষ্টে ককিয়ে বললাম, দম না পেলে বলি কি অলিম্পিকস্ থেকেই সবে ফিরেছে। শুধু তাদের মুখগুলাে করে? যেন শরীরের সঙ্গে যেন খাপ খায় না। দেহগুলাে তাদের। পামার সজোরে বালির ওপর ছুঁড়ে দিয়ে আমার গ্রীক দেবতার আর মুখগুলাে যেন দানবের। | অনুরােধ রাখলে। আমি অতি কষ্টে দাঁড়িয়ে ওঠার পর দেখি। চারজনই আমায় ঘিরে আছে। পামারের একজন সঙ্গী আবার অভিশাপ লেগেছে বলে মনে হয়েছে! রঙ-বেরঙের প্রবালের প্রশ্ন করলে, সত্যি করে বল তাে কি মতলবে এখানে কঙ্কাল। রঙিন মাছের বদলে সেই সাদা প্রবাল-কঙ্কালের এসেছিস?

ওপর যেন বিদঘুটে সব কটা গাছের ঝােপ। যা সত্য তা বলে কোনাে লাভ নেই জেনে মিথ্যে একটা সমুদ্রের তলার এই কুৎসিত রূপ দেখাতে সেদিন অবশ্য অজুহাত তখনই বানালাম। বললাম স্কুবা-ডাইভিং-এর সখ। আমিই পামারদের এনেছিলাম। এনেছিলাম এই বিশ্বাসে যে তাই নির্জন একটা দ্বীপের খোঁজ করতে করতে এখানে এসে আমায় নিয়ে তাদের ফুর্তি করার ধরনটা বেশ একটু পড়েছি। কোনাে মতলব নিয়ে আসি নি।

আসুরিক হলেও পামার আর তার সঙ্গীরা একেবারে অমানুষ বেশ বেশ—পামার বিরাশী সিক্কার একটি থাপ্পড় মেরে হয়ত নয়। উৎসাহ দিলে,—স্কুবা-ডাইভিং-এর সখ তােমার মিটিয়ে আমার সে ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। দেব।

আগের দিন পামারের এক সঙ্গী একা একাই সমুদ্রে। তা সত্যি তারা মিটিয়ে দিলে। রােজ দুবেলা হাতে পায়ে সাঁতার দিতে গিয়েছিল। ফিরল যখন তখন প্রায় আধমরা। মেছাে ফ্লিপার আর পিঠে সিলিণ্ডার বাঁধা মুখে অক্সিজেনের একটা পা যেন পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে গেছে আর সেই সঙ্গে মুখােস নিয়ে সমুদ্রের তলার ডুবসাঁতারে যেতে হয়। জলের অনবরত বমি করছে। তলায় যা নাকানিচোবানি তারা খাওয়ায় তাতে শেষ পর্যন্ত ব্যপারটা কি হয়েছে তা বুঝে তখনই আমি ওষুধ দিয়ে শুধু প্রাণটা নিয়ে কোনাে মতে ফিরতে পারি। তাকে সারাবার ব্যবস্থা করি আর সেই সঙ্গেই পামারকে| একদিন সে আশাটুকুও আর রইলাে না।

কয়েকটা স্পষ্ট কথাও শােনাতে বাধ্য হই। পামার আর তার সঙ্গীদের অমানুষিক অত্যাচার, অন্য সময় হলে কি করত তা জানি না, তবে চোখের কিন্তু একদিক দিয়ে আমার কাছে শাপে বর হয়েছে। জুলুম: তার মরণাপন্ন সঙ্গীকে বাঁচাতে দেখার পর পামার জবরদস্তির ওই ডুব-সাঁতারেই প্রশান্ত মহাসাগরের রাশ তখন আমার কথায় একটু কান না দিয়ে পারেনি। কেমন করে ঘনাচ্ছে আর তার আসানের উপায় কি সে কি বলতে চাও তুমি? —পামার ঝঝের সঙ্গেই অবশ্য হদিস আমি আরাে ভালাে করে পেয়ে গেছি। জিজ্ঞাসা করেছিল, সমুদ্রের অভিশাপে লিওর এই দশা| কিন্তু সমুদ্রের তলাতেই আমার কবর হলে সেখানকার হয়েছে? যে ভয়ঙ্কর রহস্য আমি জেনেছি তা তাে আমার হাঁ, জোর দিয়েই বলেছি,আর সে অভিশাপ পাবে।

তােমাদের মত অবুঝ, লােভী মানুষই প্রশান্ত মহাসাগরে পামার আর তার সঙ্গীরা সেদিন সেই ব্যবস্থাই করেছে। ডেকে আনছে। চারজনেই একসঙ্গে সেদিন স্কুবা-গিয়ার নিয়ে সমুদ্রের পামারের বাকী দুই সঙ্গী জো আর মার্ফি তখন ঘুষি তলার টহলে নেমেছিলাম। প্রবালদ্বীপের সমুদ্র সত্যিই যেন বাগিয়ে প্রায় মারমুখাে। এক স্বপ্নের রাজ্য। গভীর জলের তলায় নানা আকার ও পামারই চোখের ইশারায় তাদের ঠেকিয়ে কড়া গলায় রঙের প্রবাল যেন এক আশ্চর্য স্বপ্নের ফুল বাগান সাজিয়ে জানতে চেয়েছে, লােভটা আমাদের কোথায় দেখলে? রাখে। সেখানে যেসব মাছেরা ঘুরে বেড়ায় তারাও যেন দেখেছি কাল তােমাদের স্কুনার-এরই গুদাম ঘরে। কোন খেয়ালী শিল্পীর হাতে তৈরী ও আঁকা সব রঙ- শান্তস্বরেই বলেছি। বেরঙের অবাক মাছের কল্পনা।

এবার মার্ফি আর জো দুদিক থেকে বুনাে মােষের মত। ইফালিক অ্যাটল-এর সমুদ্রের তলার একটা ব্যাপার প্রায় আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে আর কি! কিন্তু পামারের গােড়া থেকেই তাই বিস্মিত করেছে।

ধৈর্য অনেক বেশী, দু-হাতে দু-জনকে রুখে সে বজ্রগম্ভীর| প্রবালদ্বীপের সমুদ্র, কিন্তু তার তলায় কোথায় সে রঙ- স্বরে বলেছে, আমাদের স্কুনারে কার হুকুমে তুমি। বেরঙের জলের প্রজাপতির মত মাছ আর প্রবালের সেই উঠেছিলে? পুষ্পিত শােভা?

একটু হেসে বলেছি,—হুকুম দরকার বলে তাে মনে হয়। এখানে প্রথম থেকেই প্রবালের ওপর কি যেন এক নি। আপনাদের স্কুবা-ডাইভিং-এর উৎসাহ যে একটা ছল মাত্র তা তাে জানতাম না।

নিয়ে লিও প্রথমেই তাদের ওপর চড়াও হয়েছে। নেহাৎ পামার অনেক কষ্টে এবারও সঙ্গীদের সামলে জিজ্ঞাসা পামার এসে বাধা না দিলে ব্যাপারটা রক্তারক্তি পর্যন্তই করেছে, আমাদের লােভে যা ডেকে আনছি সমুদ্রের সে গড়াত। অভিশাপটা কি তা জানতে পারি?

পরের দিন কিন্তু পামারের মাতব্বরিতেও ঝগড়াটা কাল আমার সঙ্গে অনুগ্রহ করে একবার স্কুবা-ডাইভিং- মিটতে চায়নি। সেদিন ভােরে দেখা গিয়েছে জো আর এ গেলেই তা দেখাতে পারবাে।

মার্কির মাথার চুল খাবলা খাবলা করে কে যেন তাদের| পামার আমার অনুরােধ রাখতে রাজী হয়েছে। তার ঘুমের মধ্যে রাত্রে কেটে দিয়েছে। ধৈর্য দেখেই একটু অবাক হয়েছিলাম। আসল মতলবটা পামারকে এদিন গায়ের জোর খাটিয়েই দাঙ্গা সামলাতে তখনও বুঝতে পারিনি।

হয়েছে। কিন্তু তার পরদিন সকালে তার নিজের মুখেই চুনে আর আলকাতরায় মাখামাখি দেখবার পর রাগের চেয়ে| অসুস্থ লিওকে অ্যাটলের তাঁবুতেই রেখে এসে আমরা আতঙ্কটাই বেশী হয়েছে সকলের। চারজন তখন স্কুবার-গিয়ার-এর দৌলতে ইফালিক-এর এসব কি ভূতুড়ে ব্যাপার? বাইরের সমুদ্রে ডুব সাঁতার দিয়ে চলেছি। প্রবাল সমুদ্রের সব চেয়ে ভূতুড়ে ব্যাপার তারা সেইদিনই আবিষ্কার অপরূপ রঙিন শােভার বদলে নিচে সেই ফ্যাকাসে সাদা করেছে। জাহাজে তাদের লুকোনাে গুদামঘর খুলতে গিয়ে পাথুরে মাটি আর কুৎসিত কাটার ঝােপ।

পামার একেবারে হতভম্ব। সে ঘর একদম খালি। নীচের দিকে নেমে যা দেখাবার ভাল করে দেখাতে… পামার তার স্কুনারের ডেক-এ সঙ্গী তিনজনকে ডেকে যাচ্ছি এমন সময় পিঠে একটা হ্যাচকা টান টের পেলাম রেগে আগুন হয়ে এসব কিছুর মানে জানতে চেয়েছে। পরমুহূর্তে বুঝলাম আমার পিঠের অক্সিজেন সিলিণ্ডার:পরল স্বরে জিজ্ঞাসা করেছে, ঠিক করে বল এ শয়তানী থেকে পামারের দলের কেউ ছুরি দিয়ে কেটে টেনে নিয়েছে তােমাদের কার? যেন বিদ্যুতের চাবুক খেয়ে ওপর দিকে ঘুরলাম। কিন্তু তখন সঙ্গীদের কারুর মুখে কোনাে কথা নেই। আর সময় নেই, আমার অক্সিজেন সিলিণ্ডারটা নিয়ে পামার পামার তার হাতের শঙ্কর মাছের হান্টারটা দুবার শূন্যে আর তার দুই সঙ্গী তীরের বেগে দূরে চলে যাচ্ছে। বিনা আস্ফালন করে হিংস্র বাঘের মত গর্জন করে জানতে অক্সিজেনে তাদের সঙ্গে সাঁতারের পাল্লা দেবার কোনাে চেয়েছে, জবাব না পেলে তিনজনের পিঠের ছাল চামড়া আশাই নেই আর সাঁতরে তাদের ধরতে পারলেও লাভ এই চাবুকের ঘায়েই আমি ছাড়িয়ে নেব। এখনও বল, কে কি হবে। তাদের তিনজনের কাছে আমি একলা। পামার এ কাজ করেছে? যে মনে মনে এত বড় শয়তানী ফন্দি এঁটেছে সেটুকু বুঝতে আজ্ঞে আমি। না পেরেই আমি নিজের শমন নিজেই ডেকে এনেছি। পামার আর তার তিন সঙ্গী চমকে দিশাহারা হয়ে চারিদিকে চেয়েছে। কে দিলে এ জবাব? আশেপাশে কোথাও| পামার আর তার সঙ্গীরা কি আনন্দে তারপর ইফালিক কাউকে তাে দেখা যাচ্ছে না। অ্যাটল থেকে তাদের স্কুনার-এ রওনা হয়েছে তা অনুমান কড়া রাখবার চেষ্টাতেও একটু কেঁপে ওঠা গলায় পামার করা শক্ত নয়।

জিজ্ঞাসা করেছে, কে, কে কথা বলছে? কিন্তু সত্যিই যেন সমুদ্রের অভিশাপ তাদের তখন তাড়া আজ্ঞে আমি, ইফালিকের সমুদ্রে যাকে চুবিয়ে মেরেছিলেন। করে ফিরছে। সমুদ্রে প্রথম রাতটা কাটবার পরই ভােরবেলা সেই দাসের ভূত। ঘুম থেকে উঠে তাদের সবাই যেমন অবাক একজন তেমনি দাসের ভূত! পামার আর তার তিন সঙ্গী দিশাহারা ক্ষিপ্ত। ক্ষিপ্ত সেই লিও। ঘুমন্ত অবস্থায় তার মুখে কে হয়ে এবার চারিদিক খুঁজে দেখেছে। কই কোথাও কারুর একদিকে আলকাতরা আর একদিকে চুন মাখিয়ে দিয়েছে। কোন চিহ্নই তাে নেই।

সেদিন খুনােখুনি একটা ব্যাপার প্রায় হয়ে যাচ্ছিল। জো আকাশবাণীর মত সেই ভূতুড়ে স্বর আবার শােনা আর মার্ফি ছাড়া এ কাজ আর কেউ করতে পারে না ধরে গেছে, অত খোঁজাখুজির দরকার নেই। চাক্ষুষই এবার আমি দেখা দিচ্ছি।

এল আমার দিকে। দেখা দেবার আগে পামারের দল তখন ভূতুড়ে রেলিঙে লেগে দুজনের মাথা ফাটল আর দুজন রেলিং আওয়াজের হদিস পেয়ে গেছে। একটা মাস্তুলের তলায় টপকে পড়তে পড়তে কোনরকমে রেলিঙের বার ধরে বাঁধা একটা রবারের নলের মুখে লাগান ছােট একটা ফেলে নিজেদের সামলাল। স্পীকার।

আমি তখন বাণ মাছের মত পিছলে আবার মাস্তুলের। তারা সেটা নিয়ে যখন টানাটানি করছে তখনও পাশের দিকে চলে গেছি। সেখান থেকে যেন মিনতি করে বললাম, মাস্তুল থেকে ডেক-এর ওপর নেমে এসে দাঁড়িয়েছি।—মিছিমিছি হয়রান হয়ে মরছেন কেন? বললাম তাে এখন| ওসব নিয়ে টানাটানি করছেন কেন? অধীন আপনাদের আমি সূক্ষ্ম শরীরে আছি। ভূত প্রেত কি গায়ের জোরে সামনেই হাজির।

ধরা যায়? স্কুনারে যেন বাজ পড়েছে এমনই চমকে চারজন আমার আমার উপদেশটা মাঠেই মারা গেল। চারমূর্তি আবার দিকে ফিরে দাঁড়িয়েছে এবার।

এল পাঁয়তাড়া কষে। বাধ্য হয়ে আরাে কিছুক্ষণ তাই খেলতে তুই!…

হল তাদের নিয়ে। সে খেল শেষ হবার পর ডেকের ওপর পামার রাগে তােতলা হয়ে গেছে।

চার ষণ্ডাই লম্বা। হাপরের মত তাদের শুধু হাঁপানিই শােনা আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি—মােলায়েম গলায় বলেছি, ভূত যাচ্ছে। হয়েও আপনাদের মায়া ছাড়তে পারিনি।

চারজনকেই এবার একটু কষ্ট করে বাঁধতে হল। এসব শয়তানী তাহলে তাের?

সবশেষে পামারকে বাঁধতে বাঁধতে বললাম, মাপ তুই-ই আমাদের মুখে চুনকালি মাখিয়েছিস? করবেন, বেশীক্ষণ বাঁধা থাকতে আপনাদের হবে না। আমাদের লুকোনাে মাল তুই-ই সরিয়েছিস?

এর কাছেই প্রায় এসে পড়েছি। সেখানে পৌঁছেই চারজনেই একসঙ্গে গর্জে উঠেছে তখন।

সমাপনাদের ছেড়ে দেব। আজ্ঞে হ্যাঁ সবিনয়ে স্বীকার করে বলেছি,আপারওয়াম!—ওই অবস্থাতেই পামার হাঁপাতে হাঁপাতে অক্সিজেন সিলিণ্ডার কেড়ে নিয়ে সমুদ্রের তলায় ছেড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, গুয়াম এখানে কোথায়? আসবার পর দেহটি সেইখানে ছেড়ে সূক্ষ্ম শরীর নিয়ে বেশী দূরে নয়। আশ্বাস দিয়ে বললাম, আমরা আপ্রা ওপরে ভেসে উঠি। আপনারা তখন ইফালিক অ্যাটল থেকে বন্দরের কাছে প্রায় পৌঁছে গেছি। বেতারে প্যাসিফিক ডেরা তুলে এই স্কুনারে সরে পড়বার যােগাড় করছেন। কমাণ্ডের অনুমতি পেলেই পিটি জেটিতে গিয়ে স্কুনার সূক্ষ্ম শরীর নিয়ে এই জাহাজেরই ইঞ্জিনঘরে গিয়ে লুকিয়ে ভেড়াব। রইলাম। তারপর মনে হল আমায় নিয়ে যা রসিকতা এর গুয়াম, আপা, পিটি শুনে চারজনেরই চক্ষু তখন আগে করেছেন তার একটু ঋণ শােধ না করলে ভালাে চড়কগাছ। তারই মধ্যে কি যেন বলতে গিয়ে পামারের দেখায় না। তাই আপনাদের মুখগুলাের ওপর একটু হাতের গলায় অস্পষ্ট একটা গােঙানি শুধু শােনা গেল। কাজ দেখিয়েছি। শেষ পর্যন্ত আপনাদের বড় সাধের ব্যাখ্যাটা নিজেই এবার করে দিলাম,—যতটা ভাবছেন। লুকোনাে দৌলতও একটু হাতসাফই করেছি।

ব্যাপারটা তত আজগুবি নয়। আপনারা ওপরের কন্ট্রোল আমার কথা শেষ হবার আগেই চারদিক থেকে রুমে হালের চাকা ঘুরিয়েছেন আর আমি এ ক’দিন। আফ্রিকার সবচেয়ে ক্ষ্যাপা চারটে জানােয়ার যেন আমায় ইঞ্জিনঘরে লুকিয়ে কল বিগড়ে দিয়ে জাহাজের গতি পালটে তাড়া করে এল। তাদের একটা গণ্ডার, একটা বুনাে মােষ। দিয়েছি। একটা হাতী আর একটা সিংহ।

উত্তরে চারজনে প্রাণপণে বাঁধন ছেড়বার চেষ্টা করলে ঠকাস করে প্রচণ্ড একটা শব্দ হল তারপর। আমি তখন খানিক। চোখের দৃষ্টিতে আগুন থাকলে তখনই ওই খানেই জাহাজের রেলিঙের ধারে। অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা ভস্ম হয়ে যেতাম। করলাম, “আহা লাগল নাকি?

তাদের ওই অবস্থায় রেখে কন্ট্রোলরুমে গিয়ে রেডিও| চার ষণ্ডা যেন তুফানের ঢেউ হয়েই এবার ঝাপিয়ে ট্রান্সমিটার নিয়ে বসলাম। প্রথমেই তাতে ডাক পাঠালাম,—প্যান…প্যান….প্যান। শােনা গেল। নেহাৎ যান্ত্রিক রেডিও না হলে সেটা মেঘ প্যান প্যান করলেন তাহলে?—জিভের ডগায় প্রায় গর্জনের মতই শােনাত। এসে গিয়েছিল। কোন রকমে নিজেকে সামলালাম। আমাদের প্রশ্নটা হল, কে তুমি? প্যাসিফিক বাঁচাবার কথা নিয়ে। মনের সন্দেহটা চোখে সম্পূর্ণ কিন্তু লুকোনাে বােধহয় কি প্রলাপ বকছ? যায়নি।

জবাবে জানালাম, আমার পরিচয় পরে পাবেন। ঘনাদা তাই আমাদের ওপর একটু করুণা কটাক্ষ করে আমার প্রলাপ আগে আর একটু শুনুন। গুয়াম-এর বাইশ বললেন,—প্যানপ্যানটা বুঝলে না বুঝি? ওটা হল আন্তর্জাতিক মাইল প্রবাল প্রাচীর কিসে ধ্বংস হয়েছে জানেন নিশ্চয়। রেডিও সংকেত। প্যানপ্যান শুনলেই যেখানে যত রেডিও অস্ট্রেলিয়ার একশ বর্গমাইল ব্যারিয়ার রীফ-ই বা ধ্বসে গলে চালু আছে সব কান খাড়া করে। থাকবে। এর পরেই খুব গিয়েছে কিসে? সমস্ত প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়ানাে প্রবালজরুরী কিছু খবর দেওয়া হবে প্যানপ্যান তারই সংকেত। দ্বীপ আজ দিন গুনছে কোন্ অমােঘ সর্বনাশের? প্রশান্ত প্যানপ্যানের রহস্য বুঝিয়ে দিয়ে ঘনাদা আবার বলতে মহাসাগরের এই ভয়ঙ্কর অভিশাপের নাম কি অ্যাকান্থাস্টার শুরু করলেন,—প্যানপ্যান সংকেতের পর যে খবরটা প্লাঞ্চি? ছাড়লাম সেটি শুনতে দু কথার হলেও একেবারে একটি আর কিছু বলতে হল না। গুয়ামের প্যাসিফিক কমাণ্ডের মেগাটন বােমা। রেডিওতে জানালাম,—প্যাসিফিক বাঁচাবার ঘাঁটি থেকেই ব্যস্ত ব্যাকুল প্রশ্ন এল রেডিওতে, এ দাওয়াই নিয়ে এসেছি। বন্দরে ঢুকতে দাও।

অভিশাপ কাটাবার উপায় সত্যিই আছে? খানিকক্ষণ রেডিওতে কোনদিন থেকে কোন সাড়াই . জানালাম, আছে কিনা পরখ করেই যান না। আমি নেই। রেডিও-সংকেত আর সংবাদ যারা পেয়েছে তার বন্দুরের বাইরের স্কুনার নিয়ে অপেক্ষা করছি। সবাই বােধহয় হতভম্ব। আমার সংবাদটা আরও.৪বার পাঠাবার বেশ কয়েক মিনিট বাদে একটা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ প্রশ্নই বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই ওই ডুবসাঁতারেই প্রশান্ত মাহসাগরের সর্বনাশ কেমন করে ঘনাচ্ছে…. দুটি গান-বােটে প্যাসিফিক হাই কম্যাণ্ডের তিন তিন জন ষােল থেকে একুশটা পর্যন্ত বাহু হয়। সমস্তটাই সাংঘাতিক মাথা এসে হাজির।

কাটায় ভর্তি। সে কাটায় সিগুরাটেরা নামে এমন এক দারুণ| প্রথমটায় তিনজনেই বেশ একটু সন্দিগ্ধ। একজন তাে বিষ থাকে যে গায়ে ফুটলে শরীর অসাড় হয়ে যায় আর গরম হয়ে আমার ওপর তম্বিই করলেন, কই কোথায় বমির ধমক থামতে চায় না। ইফালিক অ্যাটলে এই কাটা তােমার প্যাসিফিক বাঁচাবার দাওয়াই?

লেগেই লিওর ওই দুর্দশা হয়েছিল। বছর কয়েক আগে পর্যন্ত| একটু হেসে তাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে স্কুনারের একটা এই সর্বনাশা তারামাছ সম্বন্ধে হুশিয়ার হবার কোনাে কারণই গুপ্তঘর খুলে দিলাম। ঘটেনি। তারপর জানা-অজানা নানা কারণে সত্যিই রক্তবীজের তিনজনই তখন আমার ওপর খাপ্পা, রসিকতা হচ্ছে মত এ অভিশাপের বংশবৃদ্ধি ঘটেছে। দক্ষিণ প্রশান্ত আমাদের সঙ্গে? এই তােমার দাওয়াই? এ তাে এক জাতের মহাসাগার সমস্ত প্রবালদ্বীপের তলায় গিজগিজ করছে শিঙে-শাঁখ, ট্রাইটন, ঘর সাজাবার জন্যে সৌখিন লােকেরা এখন এই কাটার মুকুট। এদের আহার হল প্রবাল। প্রবালের চড়া দামে কেনে।

প্রেমেন্দ্র মিত্র’র গল্প

ওপরের খােলস খেয়ে ফেলার পর যে প্রবাল প্রাচীর প্রশান্ত হ্যাঁ, তা কেনে, আর তাই থেকেই প্রশান্ত মহাসাগরের মহাসাগরের সমস্ত দ্বীপের রক্ষাকবচ হিসেবে ঘিরে থাকে চরম সর্বনাশের সূচনা। গত কবছর ধরে হঠাৎ রক্তবীজের তা দুর্বল হয়ে সমুদ্রের প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাত আর ঠেকাতে মত লাখে লাখে বেড়ে উঠে যে অ্যাকান্থাস্টার প্লাঞ্চি পারে না। দ্বীপগুলির চারিধারে সেখানকার সাধারণ মাছ প্রবাল আবরণ খেয়ে খেয়ে ফেলে প্রশান্ত মহাসাগরের প্রবাল প্রাচীরের আড়ালে আর আশ্রয় পায় না। দ্বীপগুলিও সমস্ত ছােট বড় দ্বীপ ধ্বংস করে দিচ্ছে এই শিঙে-শাঁখ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। একটার মুকুট’-এর ক্ষিদে ট্রাইটন তারই যম। বাচ্চা অবস্থাতেই আকান্থাস্টার প্লাঞ্চি এমন রাক্ষুসে যে এদের একটি ঝক এক মাসে আধ মাইল খেয়ে ফেলে এই ট্রাইটন তাদের অভিশাপ হয়ে ওঠার প্রবাল প্রাচীর খেয়ে ফেলতে পারে আর ফেলছেও তাই। মত বংশবৃদ্ধি করতে দেয় না। কিন্তু নিজেদের লােভে রাক্ষুসে তারামাছের একমাত্র যম হল শিঙে-শাঁখ ওই আর আহাম্মুকিতে এই ট্রাইটন শিকার করে মানুষ তার আইন। ট্রাইটন শিকার বন্ধ করে আবার কাটার মুকুট’নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। মানুষের সেই রকম শর্কর ওই স্বভাবশত্রুকে বাড়তে দিলে প্রশান্ত মহাসাগরকে চারজনকে আপনাদের হাতে তুলে দিচ্ছি আর সেই সঙ্গে বাঁচান এখনও সম্ভব। প্যাসিফিক কম্যাণ্ডকে এই দাওয়াইদিচ্ছি প্রশান্ত মহাসাগরকে আবার সুস্থ করে তােলারই বাতলে এসেছিলাম। দাওয়াই এই ট্রাইটন।

খানিকক্ষণ আমাদের জিভ টিভ সব অসাড়। ঘনাদা চুপ করলেন। আমাদের সকলের মুখেই তখন কঁাটার খোঁচাটার আসল যে লক্ষ্য সেই শিবু তাে লজ্জায় এক জিজ্ঞাসা—অ্যাকান্থাস্টার প্লাঞ্চিটা কি জিনিস? অধােবদন। জিনিস নয় প্রাণী, ওর আর একটা ডাক নাম হল কাটার মুকুট।

ঘনাদাকে প্যাসিফিক কমাণ্ডের ডাকে যেতে আমরা দিই। কাঁটার মুকুট? —আমরা তাজ্জব, ওই কঁাটার মুকুটেই নি। অত যদি তাদের গরজ তাহলে শুধু টেলিগ্রাম কেন অস্ট্রেলিয়ার একশ বর্গমাইল ব্যারিয়ার রীফ লােপাট হয়ে নিজেরা এসে ঘনাদাকে তারা নিয়ে যাক। গেল? গুয়ামের বাইশ মাইল প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হয়ে গেল কিন্তু এলে ঠিকানাটা তাে তাদের খুঁজে পাওয়া চাই। ওতেই?

খবরের কাগজের টু-লেট দাগান ছেড়ে ঘনাদাকে বাহাত্তর হ্যাঁ। ঘনাদা অর্ধনিমীলিত চোখে গড়গড়ায় একটা নম্বরেই তাই বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করে থাকতে হচ্ছে। সুখটান দিয়ে বললেন, “ওই কাটার মুকুট অ্যাকান্থাস্টার| আমাদেরও এ অবস্থায় ঘনাদাকে একলা এখানে ছেড়ে প্লাঞ্চি বিকট এক জাতের তারা মাছ। রাবণের কুড়িটি হাত যাওয়া কি ভালাে দেখায়? ছিল বলে শুনি আর হাত দেড়েক চওড়া এ তারা মাছের বাহাত্তর নম্বরই তাই এখনও গুলজার।

 

আরও পড়ুন:  বখতিয়ারের ঘোড়া – আল মাহমুদের কবিতা