একগুচ্ছ কবিতা- হাসান ওয়াহিদ

কালো রক্ত

আমার চারপাশে শুধু রক্ত, ঘন কালো রক্ত, কারও শরীর বেয়ে, কারও চোখ বেয়ে ঝরছে। গ্রামের প্রান্তিক চাষি আমার বাবা ফসলের নায্য দাম না পেলে আমাদের চুলায় হাড়ি চড়ে না, অসহায়তায় গলায় দড়ি দিয়ে গ্রামের বড় গাছের ডালে শরীর ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তার শরীর বেয়ে ঝরে পড়া অসহায়তার রক্ত আমাকে ভুলতে দেয় না কিছুই।

আমার বোন আধা-উন্মুক্ত শরীর নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, তোমাদের কারও শরীরের খিদে মেটায়, শুধুমাত্র পেটের সন্তানের খিদের যন্ত্রণায়। ওর মাতৃদুগ্ধ রক্ত হয়ে ঝরে পড়ছে, চেয়ে দেখো একবার।

 

আমার পঙ্গু মা কাঠফাটা রোদে দু-হাত পেতে আছে, পরিবারকে গরম ভাতের গন্ধ উপহার দেবে বলে। তার সারাশরীর ফেটে রক্ত ঝরছে, একবার তাকাও।

আমার এক ভাই খালি গায়ে চায়ের দোকানে প্রাণান্তকর শ্রম দেয়। সামন্য ভুল হলেই মালিকের মার খায়, খদ্দেরদের গালি খায়,  কেবলমাত্র দুপুরে একমুঠো বাসি ভাত পাবে বলে, মাসকাবারি মাইনের টাকায় মায়ের ওষুধ কিনবে বলে। তাকাও একবার! দেখতে পাবে ওর শৈশবের ভালোবাসামাখা স্বপ্নগুলো রক্ত হয়ে ঝরে পড়ছে।

আমারই আর এক ভাই যে আজ ফুটপাতের পরিচয়হীন অনাথ কিশোর, পরনে শতছিন্ন নোংরা পোশাক, দুমুঠো ভাতের জন্য চুরি করে। অন্তত একবার তাকাও ওর চোখের দিকে, ওর নিষ্পাপ চোখ বেয়ে তীব্র ধিক্কার রক্ত হয়ে ঝরে পড়ছে।

 

মানুষের আত্মাকে প্রতিদিন হত্যা করা হচ্ছে। কেউ বলছে না, মনুষ্যত্বের আত্মাকে আর হত্যা কোরো না, এত রক্ত আর ছড়িয়ো না। পুরো সমাজের ধমনিতে আজ যে মনুষ্যত্বের রক্ত তা ভীষণ রকম কালো।

 

ফলো করুন- দিব্যপাঠ সাহিত্য ফোরাম

 

রাজনীতির মিথ্যাবেশ

আমরা চাই আমাদের রাতের স্বপ্নগুলো

জীবন্ত তারা হয়ে মাটিতে নেমে আসুক,

ভালোবাসা মাখাক আমাদের মতো

তোমারও দু’চোখে মুখে ঠোঁটে শরীরে।

 

তোমার মিথ্যে কথাগুলো ফুলঝুরির মতো

মাইক্রোফোনের ওপর বর্ষিত হলে দর্শকদের

বিশ্বাসের আবহমণ্ডল ক্রমে ভেঙে পড়ে।

যত্ন করে লিখে আনা উজ্জ্বল মিথ্যে

তোমার দুই ঠোঁটের মধ্যকার অন্ধকার থেকে

বাতাসে উপচে পড়ে বিষ।

কারা শিখিয়েছে তোমায় এই মিথ্যা ভাষণ

কতদিনে অভ্যাস করেছো রাজনীতির এই মিথ্যাবেশ?

আমাদের ভোলাতে চেয়ে ভুলে গেছো নিজের শপথ।

 

তবু মনে রেখো, টিকবে না এই মিথ্যার বেসাতি

হাততালি শেষে জনতার আয়না থেকে একদিন

ঠিকরে বেরিয়ে আসবে একটি বুলেট।

 

 

সেলাই করা মৃত্যু

সকালে তাজা প্রাণ, সন্ধেবেলা লাশ

সামনে সমুদ্র! তাতে কি?

জল ভাবলে জল, মেঘ ভাবলে মেঘ।

 

রাঙামাটির পথে নয়, কংক্রিটের রাস্তায়

আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।

তোমার কৃষ্ণচূড়া ডালে যদি বসন্ত আসে

আর কোকিল ডাকে তবে অপেক্ষা কোরো।

 

আমার অনুচ্চারিত সব শব্দে মিশে আছে

যন্ত্রণা, বুঝে নিয়ো

আজ অমাবস্যা নাকি পূর্ণিমা, আমার জানা নেই

তোমার স্পর্শে কেন এত দুরন্ত অস্থিরতা?

সেলাই করা মৃত্যুকে ভুলে

আমি শুধু তোমাকেই দেখছি।

বসন্ত, পলাশ না খুঁজে অপেক্ষা কোরো

পাতায় পাতায় লুকিয়ে রাখা ঢেউ ভুলে

আমি আবির নিয়ে আসছি…

 

আরও পড়ুন- সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গল্প