বই আলোচনা: কবিতা পরম সঙ্গমবোধ এক নিত্য অভিনব: সৈয়দ আহমদ শামীম

কাব্যভাব আর কাব্যভাষ, কে কতক আদিম প্রেরণা বা অধুনা অভিলাষ এইসব হেতু-অহেতু চিন্তা চাতুর্য আর আমাদের শিল্পজীবনজুড়ে মেলতে থাকা তাদের প্রভাব-কুপ্রভাব নানা উদ্দেশ্যের ব্যঞ্জনাময় আড়াল নিয়ে হাজির হয়, আমাদের দ্বিধা হয় যা কিছু বর্জনযোগ্য তার সিদ্ধান্তে। অগনন কবিতাপঙ্গপাল আমাদের কর্ণের ডালপালা চিরে ছিড়ে চলে যায় এমনকি আমাদের সুর আর স্বরের প্রকৃতই আদিম যোগ্যতারে উপহাস করে অপার বেহায়ার মতো দৃষ্টির দেয়ালে ঝুলতে থাকে। ফলে আমাদের অভিরুচি অনিচ্ছায় তার অনিন্দ্য সঙ্গমের পথ অবরোধ করে রাখে। এতদূর বিকৃতি কবিতার শিল্পসত্তাকেই যেন উপহাসযোগ্য করে দেবে। দেখুন দীর্ঘশ্বাস কত অপার।কবিতা উপহাসযোগ্য না!

আর আমি শাড়ি-পরা আম্মার মুখ ভুলে যাচ্ছি!

আম্মাকে শাড়ি কিনে দিইনি কখনো

-এই বেদনা নিয়ে আমাকে বাঁচতে হবে একটা জীবন!

শাড়ি 

কবিতায় নিভৃত সঙ্গম সমাধা হয় বলেছিলেন এক ঘনঘোর কবি। হয় বটে। শরাপুরোহিত এসে বিকারহীন বিচারব্যবস্থা করে তার প্রতিকার সমর্থ হোন না। কেননা কবির ঘোর স্বয়ং বেশরা নয়। প্রকৃত কবি এক সাধারণজন,তার ধর্মে থাকা হয় জিরাফেও থাকা হয়। খুবই সাদামাটা। তবে ভাষা তারে কারুকাজ দেয়,ভাষা তার বিভঙ্গ বিবাহ সাজায়! বিবাহ এক আশ্চর্য জীবনসঙ্গম। সেই মনোরমা বা রূঢ় সঙ্গম কবির লোভাতুর জিভে এনে দেয় নারী বা পুরষের অভিনব সংজ্ঞাবোধ! সংজ্ঞা শেখার ক্লাস নয় কবিতা। তবুও-

 

প্রতিটি নারী তার বুকে পুরুষ পুঁতে রাখে।কথায় ও সাজে

তারা খুব নারী নয়, এই মানবসমাজে।

মানবসমাজ 

 

শামশাম এক অনবদ্য কবিতা লিখেছেন! দক্ষিণা  নামে তার অমোঘ শিরোনাম দিয়েছেন। এটি এক অনিঃশেষ কবিতা। নারী আর পুরুষ পৃথিবীর সমূহ সুন্দর আর অনির্বচন কামের ফলশ্রুতি পরম অশালীনরূপ বিছানো হয়েছে। শামশাম বিধাতাপ্রবণ!  সঙ্গমের যিনি আদি রচয়িতা সুরের ‍যিনি স্বয়ং অধিষ্ঠান, প্রচল শিল্পবেত্তার মূর্খ স্রষ্টা হয়ে ওঠা তার অভীপ্সায় তিরোহিত। অধুনার বাংলা কবিতার এই মহামূল্য বিস্মর অভিজ্ঞান শামশামে তীব্রতর উজ্জ্বল! অলোক সঙ্গম ছেনে বিধাতার দ্বৈধ হাসিমুখ আর পুরুষের রেতঃশিল্পসম্প্রসার- মহার্ঘ।

দক্ষিণা  কবিতার শেষ চরণচারি শুধু আমি হেথা উদ্ধৃত করি-

 

নারীর জরায়ু পাক পরমায়ু

দেহে বাজুক সরস্বতীর বীণা

অলক্ষ্যে বসে হাসেন বিধাতা

মুগ্ধ পিতা খোঁজেন শিশুর দক্ষিণা

দক্ষিণা 

 

আমি শামশামের আবিষ্কার  কবিতার কথা এড়িয়ে যাই না যেইখানে তার সরল সত্তা বিছানো পাই! হে হৃদয় তুমিতো কান্না করবার মোক্ষম সুযোগের সন্ধানে থাকো আমি জানি, কাঁদো-

 

যার ঘরে বসার পিঁড়ি পর্যন্ত নেই, সেও স্বপ্নে পালঙ্কে ঘুমায়!

আজ বিকেলে নদীর তির ঘেষে হাঁটতে হাঁটতে

এক জেলের গল্প শুনেছি।মীনগন্ধা গা।তবু তার ঘরে মাছ জুটে না।

পাষাণভার বয়ে চলা মানুষের ভেতর পাথরের পুনর্জন্ম ঘটে;

-শুনতে পাই।

আত্মলীন এই সত্তা।কোনোদিন মানুষের কথা জানতে চাইনি।

তাদের থেকে সুবিধা নিয়েছি অহরহ।

বৈপরীত্যে ঠাঁসা লোভী মন।–এইটুকু উপলব্ধি নিয়েও

বালিশকে কখনো জিজ্ঞেস করিনি রাতে সে ঘুমায় কি না

 আবিষ্কার 

 

এ হলো আত্মোন্মীলন!  পাষাণ ভারে পাথরে রূপান্তর হতে থাকা সাধারণের দিকে সহমর্মিতার দুই হাত। কবিতার পরম শিল্পের চেয়ে এর মূল্য কম নয়। শামশাম আদ্যন্ত জননীকে উৎসর্গিত কবিতাগ্রন্থে নানান প্রান্তে এ দয়ার শরীর বিস্তার করেছেন। কবিতার নন্দন আবহ তিনি যোগাড়যন্ত করেছেন বাংলা কবিতার বিবিধ পরিসর হতে আর যে দরদী পরান, তার বীজ নিহিত রয়েছে পিতা পরিবার আর ধর্মের সফেদ সোদা ইতিহাস জননীর স্নেহের ক্রোড়ে।

 

                       Photo- Facebook

 

কোনও কোথাও শেষ কথা নেই। জীবনের ভরকেন্দ্র অবশ্যই আছে। তার স্বরূপ সুস্থিতি নিয়ে বিরোধ ব্যাপক রয়েছে। যেহেতু মানুষ স্বাধীনতাপ্রাপ্ত, সে আপন মর্মের বিরুদ্ধেও যেতে পারে ভাষায়, শিল্পে। শামশাম বল্গাহীন স্বাধীনতার জরায়ুনন্দের পথপ্রান্তর, তার বিবাগী সুর চিনেন। বাংলা কবিতার কথিত সে শিল্পসায়রে মধুর পরকীয় স্রোতের অন্ধ বিহঙ্গ হয়ে ওঠার প্রচল লোভ,শামশাম এড়িয়ে চলেছেন। মানবজীবন, এক ব্যাপ্ত পাঠশালারূপে তার দৃষ্টি বোধ ভাবে বিচর করে। যদি দৃষ্টি প্রশস্ত হয় তার কবিতা যোগ্যতর হয়ে ওঠার পথ পেয়ে যাবে।কেননা সর্বজন ইনসাফবোধ তার শিল্পভাবের অন্তরে প্রোথিত।

 

আরও শাহানা ফেরদৌসী  | শামশাম তাজিল

বইয়ের ধরণ: গ্রন্থ

প্রকাশক : চৈতন্য, সিলেট

প্রকাশ কাল : ২০২১

 

আরো পড়ুন- অমিতরূপ চক্রবর্তীর কবিতা

ফলো করুন- দিব্যপাঠ সাহিত্য পত্রিকা