মাইনুল ইসলাম মানিকের কবিতাগুচ্ছ

একটি প্রশিক্ষণের ইতিবৃত্ত

কথাদের প্রশিক্ষণ চলছে…

 

প্রশিক্ষহীন কথারা অবলা নারীর মতো

ধর্ষিত হয়, লুট হয়ে যায়, পতিতার কালিমা নিয়ে ফেরে সংসারে

কথারা হন্তারকের হাতে গেলে আত্মঘাতী হয়

ঝাঁঝালো বুলেট হয়ে ফিরে আসে বুকে

নিঃস্ব করে রেখে যায় পরিত্যক্ত বীর্যের মতো।

 

অল্পতেই উপচে পড়ত যে-সকল কথা

এখন নিজের ভেতরে তৈরি ব্যারাকে আটকে রাখি তাদের

সকাল-বিকাল দুবেলা প্যারেড করাই

ছেঁটে ছোট করে দিই ওদের অবাঞ্চিত চুল

দু-একটি কথা প্রতিবাদে উঠে দাঁড়াতে চায়

কঠোর নিয়মে ওদের মারধর করি

কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখি চৈত্রের রোদের ভেতর

নিবিড় প্রশিক্ষণে অন্ধভক্তের মতো

আমারই অনুগত করে তুলি প্রতিদিন।

 

কৈশোরে প্রেমের কয়েকটি কথা লিখে পাঠিয়েছিলাম

যে প্রেয়সীর কাছে, সে রটিয়ে দিয়েছিল পাড়াময়

তারপর আমারই কথা আমাকে তাড়িয়ে ফিরেছে বহুদিন

বন্ধু ভেবে যার কাছে জমা রেখেছিলাম কথার পাহাড়

নিজেকে উর্ধ্বে রাখতে সে একদিন ওঠে পাহাড়চূড়ায়

অতঃপর শীর্ণ প্র¯্রবনে ভিজিয়ে দেয় আমার শরীর

বিশ্বস্ত ভেবে যাকে মালিকানার চেয়ারে বসতে দিই

একদিন আমার কথায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সে

চেপে ধরে আমারই কথার টুঁটি।

 

এখন অনিয়ম, অপ্রেম, বিশ্বাসঘাতকতার মুখোমুখি

দু-একটি কথা মুখ ফসকে ভেতরের ব্যারাক থেকে

বেরিয়ে আসতে চায়, অভ্যাসবশত লাফঝাঁপ দেয়

অতঃপর কানধরে দাঁড়িয়ে থাকে চৈত্রের রোদে

আমি ওদের প্রশ্রয় দিই না একদম।

 

এখন ইথারে ভাসমান পুরনো কথা বাজেয়াপ্ত করছি

নিষিদ্ধ সম্পদের মতো, এখন কথার শাসন চলছে ব্যারাকে ব্যারাকে।

আশা করা যায়, কিছুটা প্রলম্বিত হবে আমার পতন।

 

আরও পড়ুন- নাহিদা আশরাফীর কবিতা

 

কার্ল মার্কসের শবযাত্রা

মহামতি কার্ল মার্কস

আপনি শুয়ে আছেন কফিনে

পাশে পড়ে আছে ডাস ক্যাপিটাল, সারপ্লাস ভ্যালু

আপনার বিলম্বিত শবযাত্রায় শামিল হয়েছেন নগণ্য কমরেড

গুটি কয়েক নাবালক, আর

ভ্যাঁ ভ্যাঁ স্তননরত স্বল্পসংখ্যক ব্ল্যাক বেঙ্গল

কফিন এগিয়ে যাচ্ছে অতি ধীরে, পেছনে অনুচ্চ মাতম

বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসছে সুদীর্ঘ মিছিল

প্রগতির প্ল্যাকার্ড হাতে প্রথম সারিতে লক, লিংকন ও রুশো

পেছনে ধুরন্ধর নিক্সন-কিসিঞ্জার

ধড়িবাজ নেতা, আমলা, উমেদার, মহাজন

দুহাতভর্তি তী² চাপাতি, ললিপপ, অগুনতি কাঁঠাল পাতা ও শুকনো হাড়

সারিপায়ে হেঁটে আসে কামুক পুরোহিত

বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মী ও বেশ্যার দালাল

হাঁটে ছা-পোষা কেরানি, নেশাগ্রস্ত কবি ও চতুর কাক

পেছনে অতন্দ্র প্রহরায় ক্ষীপ্র শেফার্ড ও হাড়লোভী নেড়ি কুকুরের দল।

 

মহামতি কার্ল মার্কস, বিশ্বাস করুন

বিপরীত মিছিলটি যখন অতিক্রম করছিল আপনার শবযাত্রা

বিচিত্র শ্লোগানে চাপা পড়ে গেল পলকা মাতম

চাপাতির জবাবে ছোরা উঁচিয়ে ধরে কতিপয় কমরেড

কেউ কেউ ত্রস্তপায়ে হেঁটে যায় নিশ্চুপ

গুটিকয়েক নাবালক ললিপপ দেখে জিহ্বা চাটে

সুযোগ বুঝে চমম্পট দেয় বিপরীত মিছিলে, আর

ব্ল্যাক বেঙ্গল ছুটে যায় কাঁঠাল পাতার ঘ্রাণে।

 

মহামতি কার্ল মার্কস, আরেকটু অপেক্ষা করুন

আপনার শ্মশানযাত্রায় এখনও হেঁটে যাচ্ছেন

ক্লান্তক্লিষ্ট জনাকয়েক কমরেড আর ডানপিঠে নাবালক

ওরা ঠিকঠাক আপনাকে নিয়ে যাবে শ্মশানঘাটে

নিশ্চিত থাকুন,

তারপরই আপনি আবার বেঁচে ওঠবেন।

 

 

 তুমি আমায় দুঃখ দেওয়ার কে?

তুমি আমায় দুঃখ দেওয়ার কে

আমি নিজেই ভীষণ দুঃখ পেতে জানি

আমার পাশে বসতে পারি আমিই

যখন কেউ রেখে যায় শূন্য আসনখানি।

 

শ্মশান আমায় পোড়ায় যদি তবে

আমার ভেতর জুড়ে কোন আগুনের চাষ?

তুমি আমায় অন্ধ করে দেবে?

আমার চোখ খুলে নিই, আমিই ঈডিপাস।

 

আমি জন্ম থেকেই মরছি অবিরত

আমায় মারতে পারে দুঃখশরের বিষ?

আমি নিজ আগুনে পোড়া ফিনিক্স পাখি

তুমি ভাবছো আমায় দুঃখী অ্যাকিলিস?

 

বৃষ্টি আমায় ভিজিয়ে দিতে পারে?

আমার চোখের ভেতর উপচে পড়া জল

আমি নিজের বোঝায় পিষ্ট সিসিফাস

যখন ঠেলছি পাথর নিজেই অনর্গল।

 

আমায় দুঃখ দেওয়ার দুঃখ যদি থাকে

তুমি টানতে পারো জবরদস্ত রাশ

তুমি আমায় দুঃখ দেওয়ার কে?

যখন নিজেই করি নিজের সর্বনাশ!

 

ফলো করুন- দিব্যপাঠ সাহিত্য পত্রিকা