শেষযাত্রার ঘটক: মইনুল ইসলামের গল্প

এনামের সাদা কাফনে ঢাকা শরীরটা মাটিচাপা দিয়ে কবরস্থান থেকে যখন লতিফ বের হলেন তখন তার বুক খাঁ খাঁ করে উঠল। মনে হলো এই পৃথিবীতে হঠাৎ করে তিনি বড় একা হয়ে গেলেন। এনাম তার ছেলেবেলার বন্ধু। একসাথে একপাড়ায় বড় হয়েছেন। এক সাথে স্কুল কলেজে গিয়েছেন। মাঠে ফুটবল খেলেছেন। সুখ দুঃখে একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আজ থেকে এনাম বলে আর কেউ তার পাশে থাকল না। কথাগুলো ভেবে বুকের ভিতর থেকে একটা কষ্ট যেন কান্নার মত তার গলার কাছে আটকে থাকল। লতিফ বুঝতে পারলেন তার চোখের পাতা আবার ভিজে উঠেছে। ঝাপসা দৃষ্টিতে তিনি চারপাশে তাকালেন। শব্দ করতে করতে গাড়ি আর রিকশার ঝাঁক রাস্তাজুড়ে চলছে। কাছেই কোন দোকানে মাইকে গান বাজছে। হিন্দি গান। মাথার উপর ঝুলন্ত তারে বসে আছে কয়েকটা কাক। থেকে থেকে উঁচু কর্কশ স্বরে ডেকে উঠছে। বাতাসে কোথা থেকে যেন আগরবাতির গন্ধ ভেসে আসছে। এখানে চারপাশে সবকিছুই স্বভাবিক, সবকিছুই ঠিকঠাক আছে। শুধু এনাম নেই। এই ভাবনাটা ঘুরে ফিরে তাকে ভীষণ ব্যাকুল করে তুলছে। চারপাশে সবকিছু তার কাছে কেমন যেন অর্থহীন মনে হচ্ছে। একে একে তিন বন্ধুকে তিনি বিদায় জানিয়েছেন। আজ এনামও চলে গেল। এবার হয়তো তার যাবার পালা। ভাবনাগুলো মাথায় নিয়ে লতিফ আচ্ছন্নের মত বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন। সামনের ট্রাফিক সিগন্যাল পার হয়ে বাঁ দিকের গলিতে কিছুদূর গেলেই তার বাড়ি। বেশি দূরের পথ নয়। এক সময় তার অন্যমনস্ক দৃষ্টি পাশের একটা সাইনবোর্ডে আটকে গেল। কালো বোর্ডের উপর বড় বড় সাদা হরফে লেখা আছে- শেষ যাত্রা। এই পথে তিনি অনেক যাওয়া-আসা করেছেন কিন্তু দোকানটা কখনও তার চোখে পড়েছে বলে মনে হলো না। কি মনে করে তিনি দোকানটার দিকে এগিয়ে গেলেন।

 

‘আচ্ছালা মালেকুম।’ তাকে দোকানে ঢুকতে দেখে সুরেলা গলায় সালাম দিয়ে দোকানি এগিয়ে এলো। লতিফ এক পলক লোকটার উপর চোখ বুলালেন। বয়স্ক মানুষ। চ্যাপ্টা নাকের ফর্সা গোলগাল মুখ, থুঁতনিতে মেহেদি রাঙানো এক গোছা দাড়ি। পান খাওয়া লাল ঠোঁটে হাসি লেগে থাকায় খয়েরী রঙের দাঁতের মাড়ি বেরিয়ে পড়েছে। মাথার সাদা টুপিটা কপালের মাঝখানে কালো বড় দাগটা আধাআধি ঢেকে রেখেছে। খুব নামাজি লোক হবে।

 

লতিফ হঠাৎ কেমন ক্লান্তি অনুভব করতে লাগলেন। বিন্দু বিন্দু ঘামে তার কপাল আর মুখ ভিজে উঠেছে। লোকটি যেন তার পরিশ্রান্ত ভাব বুঝতে পারল। কাঁধের গামছা দিয়ে পাশের  প্লাস্টিকের চেয়ারটা মুছতে মুছতে বলল,

 

-এইখানে বসেন স্যার, একটু জিরায়ে নেন। গরমে হেঁটে এসেছেন তো। যে গরম পড়েছে তাতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ে।

 

লতিফ চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ গভীরভাবে শ্বাস নিলেন। চোখ খুলে তাকাতেই দোকানীর সাথে চোখাচোখি হলো। লোকটা বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

 

-আরাম হচ্ছে তো স্যার? তার পুরু লাল ঠোঁটের ফাঁকে হাসি আরো বিস্তৃত হলো। লতিফ ফোঁস ফোঁস করে ক’বার নিঃশ্বাস ফেলে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলেন। তারপর পাশে দেয়ালে খাড়া করে রাখা বাক্সগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,

 

-এই কফিনের বাক্সগুলোর কি রকম দাম?

-একেকটার দাম একেক রকম। দোকানি দাড়ির ভিতর হাত বুলাতে বুলাতে বলল- মনে করেন, কাঁঠাল কাঠ হইলে এক রকম দাম। কেরোসিন কাঠ হইলে এক রকম দাম। আবার মনে করেন, কাঠ ভালো হইলে, ভালো পালিশ হইলে বাক্সের বেশি দাম। মুর্দার জন্য যে যেমন পছন্দ করে সে সেইভাবে কেনে।

লতিফ খুঁতখুঁতে ভাব নিয়ে সারি দিয়ে রাখা বাক্সগুলোর উপর চোখ বুলাতে লাগলেন। তার চোখের ভাষা যেন লোকটি বুঝতে পারলো।

-স্যার, আমার কাছে একটা ভালো মাল আছে, দেখে আপনার পছন্দ হবে। আসেন, জিনিসটা দেখেন। সে একটু ভিতরের দিকে ঠেস দিয়ে রাখা বাক্সটা দেখালো। লতিফ চেয়ার ছেড়ে কাছে গেলেন। মসৃণ কাঠের উপর কালো বার্নিশ করা। বার্নিশের হাল্কা গন্ধ ভরে আছে বাক্সটা ঘিরে।

-এটা স্যার, চাপালিশ কাঠ। দেখেন কি দারুণ কাজ, আর পালিশ তো না, যেন আয়না। ঐ যে দেখেন উপরে মাথার কাছে একটা ফুটা আছে। মুর্দ্দা লোবানের গন্ধ পাবে। নামাজের আজান শুনতে পাবে।

-মুর্দ্দা আবার এসব শুনতে পায় না কি? লতিফ বিব্রত ভাব নিয়ে প্রশ্ন করলেন। দোকানির মুখে হাসির ফোয়ারা ছুটলো।

-কি যে বলেন স্যার, আল্লার পাক কালাম জড় অজড় সব বস্তুই সব সময় শুনতে পায় । লতিফ তার সহজ ব্যাখ্যা শুনে চুপ করে থাকলে, বুঝলেন এই লোকের সাথে এ বিষয়ে বাড়তি কথা বলে লাভ নেই। তবে কফিনের বাক্সটা তার খুব পছন্দ হল।

-স্যার, এইটার দাম তিন হাজার টাকা। তবে আপনার জন্য আমি আড়াই হাজার নেব। আপনাকে দেখেই আমার মনে হয়েছে আপনি দামাদামি করার লোক না। বেশি দামাদামি করলে মুর্দ্দারাও কষ্ট পায়। তাই আপনার জন্য আমি আড়াই হাজার নেব। এর কমে পারবো না স্যার। বিনয়ের হাসিতে চোখ মুখ উদ্ভাসিত করে দোকানি লতিফের দিকে তাকাল। লতিফ তার অপরাগতা বুঝলেন। এর সাথে আর সময় নষ্ট করার ইচ্ছাও তার নেই।

 

-ঠিক আছে। তোমাকে এক হাজার টাকা অগ্রিম দিচ্ছি, বাকিটা কাল দেব। লতিফ পকেট থেকে টাকা বের করে তার হাতে দিলেন।

-স্যার, মুর্দ্দা কি মেডিকেলে রেখেছেন?

– ওটা আমার জন্য কিনে রাখলাম। দোকানির হাতে টাকা দিতে দিতে লতিফ লক্ষ্য করলেন সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

-কি হলো? তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন।

-অনেক মানুষ মরার আগেই তার কবরের বন্দোবস্ত করে রাখে, আগাম কাফনের কাপড় কিনে রাখে। আগাম বাক্স কিনে রাখলে ক্ষতি তো নেই। আপনি স্যার বিজ্ঞলোক। ঠিক কাজ করছেন। দোকানি লাল মলাটের একটা নোট তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, স্যারের নাম আর মোবাইল নম্বরটা লিখে দেন। কাল আসতে ভুলে গেলে, আমি আপনাকে ফোন করে মনে করায়ে দিব। লতিফ অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাম আর ফোন নম্বর নোটবুকে লিখলেন।

-এটা আমার দোকানের কার্ড। লতিফ কার্ডটা নিলেন।

-স্যার, বেশ কুণ্ঠিত ভাব নিয়ে হেসে দোকানি বলল, মনে হয় আপনি একটা অসুখে ভুগতেছেন, অসুখটা কি খারাপ?

-সব অসুখই তো কম-বেশি খারাপ, তাই না?

-জ্বী, জ্বী। ঘন ঘন মাথা দোলালো সে। তেমনি কুণ্ঠিত স্বরে বলল, তবে কিছু কিছু অসুখ যারপর নাই খারাপ। এই মনে করেন, কেন্সার। একবার শরীলে ঢুকলে- শেষ যাত্রা ছাড়া গতি নাই। আমার বেয়াই সাবেরে কেন্সার ধরল। দুই মাসে শ্যাষ। হায়রে কষ্ট রে কষ্ট! তার কথা মাঝপথে রেখে লতিফ বিদায় হলেন।

 

 

লতিফ বন্ধু এনামের অভাববোধটা কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছেন না। এক ধরনের হতাশা আর নিঃসঙ্গতাবোধ বারবার তাকে চিন্তাক্লিষ্ট আর অন্যমনস্ক করে তুলছে। সকালবেলা বারান্দায় চেয়ারে বসে খবরের কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরেছিলেন। কাগজ টপকে তার চোখ দুটো দেয়ালের পাশে করবী গাছটার উপর গিয়ে স্থির হলো। থোকা থোকা লাল ফুলে ভরে আছে গাছের ডালপালা। এনামের খুব প্রিয় লাল করবী। গাছটি সেই কোথা থেকে এনে লাগিয়ে দিয়েছিল। তিনি ভাবলেশহীন চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকলেন।

 

ক’দিন থেকে স্বামীর এই পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করেছেন সেলিনা। বন্ধুর মৃত্যুর পর লোকটা হঠাৎ যেন কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। বারান্দায় বসে পান চিবুতে চিবুতে তিনি অপাঙ্গে স্বামীর দিকে তাকালেন। লোকটির এই রকম নিশ্চুপতা, এই রকম বিষণ্নতা আবার খারাপ কোন কিছুর লক্ষণ নয় তো? ভিতরে ভিতরে এক অজানা শঙ্কায় সেলিনা বেগমের মন কেঁপে ওঠে। কি করবেন সেটা বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। বাবলুও এ সময়ে কাছে নেই। আজ পাঁচ দিন হতে চলল বাড়ি ফেরেনি সে। মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। জিজ্ঞাসা করলে বলে পার্টির নেতাদের কাজে ব্যস্ত থাকায় বাড়ি ফেরার সময় হয় না। এই ব্যস্ত থাকার অর্থ সেলিনা এখন ভালোই বোঝেন। পুলিশের খাতায় তার নাম সন্ত্রাসীদের দলে। এলাকায় সবাই তাকে লেংড়া বাবলু বলে চেনে। কলেজে মারপিট করতে গিয়ে পায়ে গুলি খেয়েছিল। সেই থেকে তার এই নাম হয়েছে। কলেজে ঢুকে ছাত্র রাজনীতির দলাদলিতে তার যে অধঃপতন শুরু হয়েছিল আজো সেটা অব্যাহত আছে। লতিফ একমাত্র ছেলের এই রকম অধঃপতনে প্রবল মনোকষ্টে ভুগেছেন। তারপর কষ্ট আর অভিমান বুকে চেপে এক সময় ছেলের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ছিলেন। কিন্তু সেলিনা সেটা পারেননি। বাবার নির্লিপ্ততা দিনে দিনে বাবলুকে আরো মরিয়া করে তুলেছিল। আর সেলিনা সবসময় ছেলেকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন। মায়ের কারণেই বাবলু হযতো এখনও বাড়িতে যাওয়া-আসা করে থাকে।

 

সেলিনা পান চিবুতে চিবুতে গলা বাড়িয়ে বারান্দার একপাশে পিক ফেললেন। পাশের বাড়ি থেকে টিউবওয়েল চাপার ধাতব শব্দ ভেসে আসছে। দেয়ালের উপর একটা কাক তারস্বরে ডাকছে। এমন সময় টিউবওয়েলের শব্দ আর কাকের কর্কশ স্বর ছাপিয়ে ক্রিং ক্রিং করে ঘরের ভিতর টেলিফোন বেজে উঠল। সেলিনা ঘরে গিয়ে ফোন তুললেন। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে একটা পুরুষকণ্ঠ ভেসে এলো,

-আচ্ছালা মালেকুম। আমি শেষযাত্রা থেকে মফিজুদ্দি বলতেছি। লতিফ স্যার বাড়ি আছেন? উনাকে একটু দরকার ছিল।

-এই শোনো, শেষযাত্রা থেকে মফিজ না কে যেন তোমাকে চাচ্ছে। সেলিনা ফিরে এসে বললেন। তার কথা শুনে লতিফ ভ্রু-কুঁচকালেন। তখন হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল শেষ যাত্রার সেই কফিন বাক্সের কথা। পর দিন তার দোকানে যাবার কথা ছিল সেটা তিনি ভুলে গেছেন। হিসাব করে দেখলেন আজ চার দিন হয়ে যাচ্ছে লোকটির সাথে যোগাযোগ করা হয়নি। ভুলে যাওয়ার জন্য নিজের উপরই বিরক্ত হলেন। আজকাল অনেক কিছুই তার মনে থাকছে না। শেষযাত্রার লোকটি নিশ্চয় বাকি টাকার জন্য তাগাদা দিতে ফোন করেছে।

 

-হ্যালো, লতিফ ফোন তুলে বললেন।

-আচ্ছালা মালেকুম। স্যার, আমি শেষযাত্রা থেকে মফিজুদ্দি বলছি। চিনতে পারছেন?

-চিনতে পারছি, বলুন-

-স্যার, একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাচ্ছিলাম।

-বলুন। একটু চুপ করে থাকল মফিজুদ্দি। লতিফের মনে হলো কথাটা জিজ্ঞাসা করতে দ্বিধান্বিত হচ্ছে সে।

-বাকি টাকার কথা বলতে চাচ্ছিলেন?ভুলে গিয়েছিলাম, কালই দিয়ে আসবো।

-না, না, টাকার কথা নয়। মনে হলো লতিফের কথায় লোকটি খুব লজ্জা পেল।

-তাহলে কি জিজ্ঞাসা করতে চাচ্ছেন?

-স্যার, আপনার ওফাতের কি একটু দেরি হবে? মনে হলো খুব বিনয় আর শঙ্কা নিয়ে মফিজুদ্দি কথাটা বলল।

 

মফিজুদ্দির প্রশ্নের মর্ম বুঝতে একটু সময় লাগল তার। সহসাই এর উত্তর দিতে পারলেন না তিনি। একবার বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখলেন। সেলিনা মেঝের দিকে তাকিয়ে বসে বসে পান চিবুচ্ছেন। তবে লতিফ বুঝতে পারলেন সে কান পেতে ফোনে তার কথোপকথন থেকে একটা কিছু আঁচ করার চেষ্টা করছেন। একটু চুপ থেকে লতিফ নিচু, গম্ভীর গলায় বললেন,

 

-সেটা আমি কি করে বলব?

-স্যার, হায়াত মউত মহান আল্লার হাতে। তবে, আজকাল ডাক্তার সাহেবেরা অনেক রোগের রোগী কতদিন বেঁচে থাকবে সেটা আগাম বলে দিতে পারেন। আমার বড় ভায়রার কিডনির রোগ হলো। মেডিকেলের বড় ডাক্তার দেখে বললেন হায়াত আছে বড়জোর দুই মাস। দুই মাস পর ঠিক ঠিক-

-শোনেন, আপনার টাকা আমি কালই পৌঁছে দেব। তার কথার মাঝখানে লতিফ বলে উঠলেন।

-স্যার, টাকা তো কোন ব্যাপার না। আমার সমস্যা হইতেছে আপনার বাক্সটা নিয়ে। আমার দোকানের ছাদে পানি চোয়ায়। পানিতে আপনার বাক্সর পালিশ নষ্ট হবে। তাই বলছিলাম, বাক্সটা আপনার বাড়িতে পৌঁছায়ে দেই। একটা ভালো জায়গায় জিনিসটা রেখে দিবেন যতদিন আপনার দরকার না পড়ে।

 

মফিজুদ্দির কথায় এবারও লতিফের মাথায় সহসা কোন উত্তর এলো না। কফিনের বাক্সটা এসময় এভাবে হঠাৎ বাড়ি নিয়ে এলে কি অবস্থা দাঁড়াবে সেটা ভেবে তিনি খুবই বিব্রত বোধ করতে লাগলেন। এক পলক সেলিনার দিকে তাকালেন। সে মুখ নিচু করে পান চিবুচ্ছে। তবে, মনে হলো তার মনোযোগ এই দিকে রয়েছে।

 

-শুনুন, নিজেকে একটু সামলে নিয়ে লতিফ বললেন, আমি একটু ভেবে দেখি, তারপর আপনাকে জানাব।

-আপনার মেহেরবানি স্যার। ওপাশ থেকে ফোন রাখল মফিজুদ্দি। বারান্দায় ফিরে চেয়ারে বসতে বসতে লতিফ দেখলেন সেলিনা কেমন ড্যাব ড্যাব চোখ মেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। একটা কিছু জানার আগ্রহ তার চোখে।

 

এ সময় আবার টেলিফোন বাজল। লতিফ দ্রুত উঠে গিয়ে ফোন ধরলেন।

-স্যার। মফিজুদ্দির গলা।

-আবার কি হলো? বিরক্তি চেপে লতিফ বললেন।

-স্যার, ওফাতের কথা জিজ্ঞাসা করে আপনার মনে বুঝি কষ্ট দিলাম। আমি মূর্খ মানুষ। বেয়াদবি হলে মাফ করে দেবেন।

লতিফ চুপ করে থাকলেন।

-স্যার, আপনি যখন বলবেন, তখনি আপনার বাড়িতে বাক্সটা পৌঁছায়ে দিয়ে আসব, এখন তাহলে রাখি। আচ্ছালা মালেকুম। মফিজুদ্দি ফোন বন্ধ করল।

 

লতিফ শ্লথ পায়ে চেয়ারে এসে বসলেন। তার চোখে মুখে চিন্তার  ছাপ। কফিন বাক্স নিয়ে চিন্তাটা তার মাথায় ডাঁশ মাছির মত ভন ভন করে উড়ছে যেন। বাক্সটা কি করে বাড়িতে নিয়ে আসবেন সেটার কোন উপায় তার মাথায় আসছে না। সেলিনা যে ওই বাক্সটা বাড়িতে ঢুকাতে দেবে না এটা তিনি নিশ্চিত ভাবেই জানেন। আসলে হুট করে কফিনের বাক্সটা কিনে ফেলাটা বড় ভুল হয়ে গেছে। ব্যাপারটি এখন সামলাবেন কি করে মনে মনে সেই উপায় খুঁজতে লাগলেন।

 

-কে গো লোকটা? স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে সন্দিগ্ধ স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন সেলিনা বেগম।

-ওর নাম মফিজুদ্দি, আমার পরিচিত। শেষযাত্রা নামে ওর একটা দোকান আছে। ছোট্ট উত্তর লতিফের।

-শেষযাত্রা! কি অদ্ভুত নাম রে বাবা। পানের পিক ফেলে নিজের মনে কথাগুলো উচ্চারণ করলেন তিনি।

কিছুক্ষণের মধ্যে আবারো ফোন বেজে উঠল। লতিফ ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে ফোনের দিকে তাকালেন। আবার কি মনে করে ব্যাটা ফোন করল? ফোনের শব্দে সেলিনা নড়ে চড়ে উঠলেন দেখে লতিফ নিজেই ঘরে গিয়ে ফোন তুললেন।

-লতিফ সাহেব বলছেন? ওপাশ থেকে অচেনা পুরুষ লোকের ভারী গলার আওয়াজে শোনা গেল।

-জ্বী, লতিফ বলছি।

-আমি সবুজবাগ থানা থেকে ওসি হামিদ বলছি।

-জ্বী, বলুন।

 

-লেংড়া বাবলু আপনার ছেলে?

-জ্বী, বলুন। লতিফের গলা যেন একটু কেঁপে উঠল।

-কাল রাতে টহল পুলিশের সাথে এনকাউন্টারে সে মারা গেছে। ওর ডেডবডি থানায় আছে।

হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠল লতিফের। হাত ফসকে টেলিফোনের রিসিভার মেঝের উপর আছড়ে পড়ল।

-কি হলো তোমার? সেলিনা বেগম বারান্দা থেকে ছুটে এলেন।

-বাবলু নেই। বুকের ভিতর প্রচণ্ড কষ্টের চাপ নিয়ে লতিফ কথাটা উচ্চারন করলেন।

-বাবলু নেই?বলে কি? ওরে আমার বাবলু রে- হাউমাউ করে মেঝের উপর আছড়ে পড়লেন সেলিনা। ঝি আনোয়ারা বারান্দা ঝাড়ু দিচ্ছিল। ঝাড়ু ফেলে সে চিৎকার করে ঘরের ভিতর ছুটে এলো।

 

দুপুর বেলা। বারান্দার একপাশে বাবলুর লাশ রাখা হয়েছে। আপাদমস্তক সাদা চাদরে ঢাকা। চাদরের জায়গায় জায়গায় রক্তের দাগ- শুকিয়ে কালো হয়ে আছে। লাশটাকে ঘিরে আছে পাড়ার লোকজন। বাবলুর বন্ধুরাও এসে জড়ো হয়েছে। তাদের চোখ-মুখ গম্ভীর, কঠোর। ঘরে বসে শূন্য দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছেন লতিফ। চোখে জল শুকিয়ে আছে- বুকের ভিতর চাপা যন্ত্রণা। ভিতর থেকে বাবলুর মায়ের আহাজারি ভেসে আসছে। বারান্দার একপাশে মহল্লার মসজিদের ইমাম হাতের আস্তিন গুটিয়ে বদনা থেকে পানি ঢেলে অজু করছেন। মুর্দ্দাকে গোসল করানোর পর কাফন পরিয়ে জানাজা হবে।

লতিফ কাঁপা হাতে টেলিফোন তুললেন। কার্ড দেখে মফিজুদ্দির নম্বর ঘোরালেন।

 

-হ্যালো, মফিজুদ্দি?

-স্যার, মফিজুদ্দি বলতেছি। ওপাশ থেকে মফিজুদ্দির সাড়া পাওয়া গেল।

-কফিনটা পাঠিয়ে দেন। লতিফ শান্ত স্বরে বললেন।

-স্যার, এক্ষুনি ব্যবস্থা করতেছি। আমি নিজেই কফিনটা আপনার বাড়িতে পৌঁছায়ে দেব। কোন চিন্তা করবেন না। মফিজুদ্দি ফোন রাখল।

 

আরও পড়ুন- রুশিয়া জামান রত্নার গল্প- চুপ