অপরূপ দোজখ: সাঈদ কামালের গল্প

নয়নপুর গ্রাম। গ্রামের একপাশে স্রোতময়ী অপরূপ এক নদী। বয়ে চলেছে উত্তাল স্রোতে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া  প্রভৃতি ঝর্ণাধারা ও পশ্চিম দিকের রমফা নদীর স্রোতধারা মিলে এই নদীর সৃষ্টি। এক সময়ের সিমসাং নদী পরবর্তী সময়ে সোমেশ্বরী নামে পরিচিত পায়। উত্তাল স্রোতে ডিঙ্গিয়ে ফাতেহাদের বাড়ি পৌঁছাতে দুপুর হয়ে যায়। নৌকা ঘাটে রেখে আমাদের খানিকক্ষণ হাঁটতে হয়। হলুদ মাটি বিছানো পথ। দু’পাশে সেগুন তেলসুর চম্পা জারুল গাছের সমারোহ। ফাতেহাদের বাড়ি পাহাড়কে আশ্রয় করে। প্রায় দু’তলা দালানের মতো উঁচুতে তাদের ঘর। বাড়ি থেকে নদী ও ছোট ছোট পাহাড়গুলো দেখতে অপূর্ব লাগে।

সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে অনেকে পায়ে ব্যথাও অনুভব করে। বর হিসেবে  বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় আমাকে নিয়ে টিট-কিরি করেছে উভয় পক্ষ। কনে পক্ষরা বলেছে যে-আমরা তো ভাবছিলাম বর ঘোড়া করে আসবে, হায় অবশেষে পায়ে হেঁটে; এই কি ছিল ফাতেহার কপালে, পায়ে হাঁটা বর, সুখ কি পাবে জীবনভর? জবাবে ওরা বলল যে-এই কি ছিল তোর কপালে, শ্বশুরালয়ে না আসতেই পায়ে ব্যথা, বাকি জীবন কতো ব্যথা পাবি কে জানে!

অনেক রকম পাতা লতা দিয়ে গেইট সাজানো। বরের বসার স্থান অন্যরকম সাজে প্রতিভান্বিত। সবুজ ঘাস দিয়ে ছাউনি দেওয়া। বসার জন্য নীল বেতের চেয়ার। চারপাশ বেষ্টন করে আছে জলজ নীল উদ্ভিদ। দেখে মনে হয় নীল জলের বেষ্টনী। বসা মাত্রই অনুভব করেছি, নীল জলের ভিতর অন্য এক জগতে প্রবেশ করেছি। মেহমানদের বসার স্থানও ঝকমকে নীল। হয়ত এগুলো নীল জলের নীল জলজ উদ্ভিদ কিন্তু দেখে মনে হয় একটা আকাশকে বিছিয়ে দিয়েছে। এদিকে কনে পক্ষরা আমাদের ভালো মন্দ খবর নিচ্ছে। ঠান্ডা নীল জলের শরবত সরবরাহ করছে। অনেকেই আমার পাশে ঘুরঘুর করছে, কেউ খুব গভীর দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করছে, কেউ চুপিচুপি মন্তব্য করছে, কেউবা জিজ্ঞেস করছে- কেমন আছি। দশ বারো বছরের দুটো মেয়েও এলো-সম্ভবত ওরা ফাতেহার মামাতো বোন হবে। ফাতেহা বলেছিল- একজনের নাম ইলা, অন্যজনের নাম নীলা। আমি চুপিচুপি  নাম বলতেই হেসে হেসে দৌড়ে পালাল। খানিক সময়  ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম এবং ফাতেহার কথা ভাবতে থাকলাম। ফাতেহার সঙ্গে আমার দেখা এখানেই। ঘুরতে এসে। নীল জলের এই অপরূপ ভূমিতে ফাতেহাকে প্রথম দেখে প্রথমবার মুগ্ধ হই এবং সব দ্বিধা ধাঁধা ভেঙে নিঃসংকোচে বলি- ‘পৃথিবীর সব সুন্দর মিনতি করে, সব পাখি মধুর গান ঢেলে, সব ফুল নত হয়ে আপনাকে সালাম জানিয়েছে; গ্রহণ করে নেওয়ার আর্জি জানাই।’

ফাতেহা এক পলক দূরের নীল জলে তাকালো, ‘কিন্তু ওরা না এসে আপনি কেন এলেন? আপনাকে ওরা পাঠিয়েছে বুঝি?’

আমি বললাম- ‘একটা জীবনকে পাটির মতো বিছিয়ে দিতে চাই আমি, এইটুকু সুযোগ যদি পেতাম কোনদিন, ধন্য হতাম, ধন্য হতাম।’

ফাতেহা  ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে মুচকি হাসে এবং দ্রুত প্রস্থান করে কিন্তু সে হাসি আমার হৃদয়ের গভীরে থেকে যায়। সে হাসিতে পৃথিবীতে কতটুকু পরিবর্তন হয় আমি বোধ করতে পারি না কিন্তু আমার বুকের খুব গভীরে রিনরিনে ভালো লাগার সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এর প্রায় তের দিন পর ফাতেহার সঙ্গে আবার দেখা হয়। ফাতেহা আমাকে চিনতে পারলেও না চেনার ভান করে। আমি তাকে ডাকি। ‘এই যে-আপনার নাম জানা যাবে?’

ফাতেহা অন্যদিকে তাকিয়ে বলল- ‘নাম জেনে কি চিরদিনের জন্য বিদেয় হবেন?’

বললাম-‘আসিইনি যখন বিদেয় হব বলি কিভাবে?’

ফাতেহা কথা সংক্ষিপ্ত করতে চায়-‘তাহলে আমি বিদেয় নিচ্ছি।’

আমি বললাম-‘ নিজের ইচ্ছায় বিদায় নিলে বিদায় তো হয় না, এটা হয় চলে যাওয়া।’

‘তাহলে চলে যাই।’-দু পা অগ্রসর হয়ে ফাতেহা বলল।

আমি বললাম- ‘আমি জীবন বিছিয়ে দিই, আপনি এর উপর হেঁটে হেঁটে যান।’

ফাতেহা কথা বলল না। অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল। আমি আবার বললাম- আজকে না হয় চলেই যান কিন্তু আমি আবার আসব। আপনার সামনে দাঁড়াব।’

ফাতেহা কিছু না বলেই হাঁটতে থাকলো। আমি সেদিকে তাকিয়ে থাকলাম।

আমার বারেবার আসা, সেই পাহাড়ি পথ, নৌকা করে আসা, আমার ক্লান্ত মেঘময় সময়কে মুক্তি দিতে ফাতেহা একদিন আমাকে বুঝতে চেষ্টা করে এবং দিনের আলোর মতো আমিও তার চোখে খুব প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠি। এই রকম ভাবছি ঠিক সে মুহূর্তে  দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। চিৎকার চেঁচা-চেঁচি বেড়ে চলল। দৌড়াতে দৌড়াতে লোকেরা বলতে শুরু করে- ‘দৌড়াও যত পারো দৌড়াও,  লাজা আইতাছে, লাজা আইতাছে।’

‘কি হয়েছে? কে আসছে?’- চিন্তিত ভঙ্গিতে হাসান বলল। সে সম্পর্কে আমার মামাতো ভাই। বয়স কম হলেও  বেশ বুদ্ধিদীপ্ত তার বয়ান। আমার বিয়ে নিয়ে তার অনেক দিনের স্বপ্ন। বিয়ের দিনে এই করবে সেই করবে, এই রকম বলে বলে সে প্রায় অস্থির থাকতো। অনেক প্রতিজ্ঞার পর সে দিন এলেও এই পরিস্থিতি দেখে খ্বু দুঃখীত সে। বিষন্ন ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে, কিছু বলতে গিয়েও চুপ থাকে।

বয়স্ক লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল- ‘আগে দৌড়াও,বাঁচলে বিয়ে করতে পারবা।’

বরের সঙ্গে তামাশা করছে ভেবে আমরা চুপ করে বসে থাকলাম। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম পিঁপড়ের সারির মত মানুষেরা এক হয়ে গেছে। দৌড়াচ্ছে। যত দ্রুত দৌড়ানো যায় তত দ্রত দৌড়াচ্ছে। দৌড়ানোর এক অভূতপূর্ব আয়োজন চলছে। শিশু, যুবক, যুবতী, বয়স্ক কেউ বাদ নেই। কারো সঙ্গে ব্যাগ, মাথায় মোটা বস্তা, কাঁধে বাচ্চারা -ছুটে চলেছে অবিরাম।

‘-কোথায় যান আপনারা?’ আমাদের মধ্য থেকে একজন জিজ্ঞেস করলো। লোকটা এক পলক আমাদের দেখে বলল- ‘লাজা আইতাছে, দৌড়ান।’ আমার সঙ্গে আসা বন্ধু ও আত্মীয়রা তাদের এই আচরণ দেখে কথা বলতে ভুলে যায় কিংবা ঠিক করতে পারে না এই মুহূর্তে কি করা উচিত।

‘লাজা কী? বুঝায়া বলেন।’ -বকুল  জিজ্ঞেস করে। বকুল আমার কাছের বন্ধুদের একজন। ছোট থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা আমাদের।

লোকটা দৌড়াতে দৌড়াতে বলল- ‘এত বুঝানোর টাইম নাই, বাঁচতে চাইলে দৌড়ান।’

বকুল ফিসফিসিয়ে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল- ‘ঘটনা হয়ত অন্যরকম। সম্ভবত মেয়ের এক্স ফিরে এসেছে।’

আমি মুচকি হেসে আস্তে করে বললাম-‘এটা কোনদিনও সম্ভব না কারণ ওর প্রথম শেষ আমি ছাড়া আর কেউ নাই। তিন বছরের রিলেশান আমাদের।’

বকুল চারপাশে  দেখে বলল- ‘আমাদের কয়েকজন লোক ছাড়া তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। কিছু একটা তো নিশ্চয় আছে।’

আমি বুঝতে পারছিলাম না কিছু। সঠিক কিছু উপস্থাপনও করতে পারছিলাম না। ঠিক সে সময়ে ফাতেহা এলো চমৎকার দ্যুতির মতো। চারপাশ আলোকিত হয়ে গেল। মিষ্টি সুঘ্রাণে ভরে গেল চারিদিক। ফাতেহা খুব একটা সাজেনি। কনেরা যেমন করে রঙ বেরঙ মেখে সাজে সেরকম নয়। সাজলে ফাতেহাকে ভালো লাগে না। চাঁদ তো এমনি সুন্দর, সাজলে তাকে অসুন্দরই লাগবে-ফাতেহা এমনি। এক পলক আমাকে দেখে বলল- ‘তুমি এখনো বসে আছো? আসো দৌড়াই।’

উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে তাকায়। কারো মুখে কথা নেই। ঈষৎ বিকেলের আলোর মতো ফাতেহা নিজেকে আড়াল করে। লোক সমুক্ষে হঠাৎ তার এই বাক্য বিনিময় নিজেকে অপরাধীর মতো করে ভেবে চুপ করে একপাশে দাঁড়ায়। ফাতেহার লজ্জা কিংবা ভয়কে দুরত্বে পৌঁছাতে পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বললাম-‘বিয়ের আগে দৌড়ানো আমার পছন্দ না।’

আমার পাশে থাকা সবাই সত্যি ঘটনা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। ফাতেহা আড়দৃষ্টে সে দিকে তাকিয়ে এক নাগাড়ে বলল-‘আপনারা হয়ত জানেন না, ভয়ংকর এক প্রাণীর আবির্ভাব হয়েছে। যার মুখ থেকে আগুন বের হয়। তার সামনে অবশিষ্ট কিছুই থাকে না। চোখের পলকে সব ছাই করে ফেলে। সে এদিকেই আসছে। আপনারা দয়া করে দৌড়ান। বিয়ের দিনে কেউ মিথ্যা বলে না। আমার কথা বিশ্বাস করুন, প্লিজ।’

ফাতেহা এমন করে বলল যে, কারো বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো না। এক মুহূর্ত কেউ দাঁড়ালো না কারো দিকে কেউ তাকালো না পর্যন্ত, যে যার মতো দৌড়াতে শুরু করলো। বাকি রইলাম  আমি আর ফাতেহা। ফাতেহা আমার হাতে আলতো স্পর্শ করে বলল- ‘এতদিন কতবার কত কোথাও হাঁটলা, দৌড়াইলা তখনতো বিয়ের আলোচনা করলা না। আজকে দৌড়াতে বাঁধা কোথায় নাকি এক সঙ্গে পুড়তে চাও?’

বললাম- ‘কিন্তু আজকে তো আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা। আজকে এমন বাহানা করতে কলিজা কাপেঁনি?’

ফাতেহা বলল- ‘কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। ওই দ্যাখো, ওই দ্যাখো। ছারখার হয়ে যাচ্ছে। সব কয়লা হয়ে যাচ্ছে। উপরে সব আগুন নিচে সব ছাই। বাঁচলে তো কলিজা কাঁপতে পারে আর মরলে সব ছাই।’

দেখলাম দাউদাউ আগুন জ্বলছে। ভস-ভস শব্দ হচ্ছে। আগুনের লেলি-হান শিখা পলকে সবকিছু ছাই করে ফেলছে। গাছ পাখি পশু মানুষ সবকিছুকে একত্রে খেয়ে নিচ্ছে। কত কোথাও আগুন লাগতে দেখেছি, কত কিছু কয়লা হতে দেখেছি কিন্ত এমন ভয়ংকর আগুন যে থাকতে পারে কোনদিনও কল্পনা করতে পারিনি। ধোঁয়া আর বিষাক্ত গ্যাষে চোখ জ্বালা করছিল। চোখ মুছতে মুছতে বললাম-‘চলো পালাই।’

ফাতেহা শক্ত করে আমার হাত ধরলো। চোখ বন্ধ করে বলল- ‘তাকাতে পারছি না, আমাকে নিয়ে চলো।’

আমার একদিনের কথা মনে পড়ে। ফাতেহার সঙ্গে পঞ্চম বারের মতো দেখা। সারাদিন ঘুরেফিরে যখন বাড়ি ফিরছিলাম ভারী বাতাস শুরু হয়। বাতাসে ধুলো উড়ছিল সেই সঙ্গে শুকনো পাতা, আমরা দ্রুত দৈাড়াচ্ছিলাম। আচমকা ফাতেহা বসে পড়ে- কিছু দেখতে পাচ্ছি না, অন্ধ হয়ে গেছি। আমাকে ধরে নিয়ে চল। ’বাতাসের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে, ফাতেহার চোখের সামনে এক হাত দিয়ে আড়াল করে আলতো করে ফুঁ দিই। ফাতেহা চোখ মেলে তাকায় এবং হাসে।

আমরা দৌড়াতে শুরু করি। সহসা মনে হয়, কুরানে বর্ণিত কেয়ামত শুরু হয়েছে। পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গাছ মাটি পাহাড় নদী সব একাকার হয়ে যাচ্ছে। আমরা হয়ত ডুবে যাব আচানক অন্ধকারে হয়তবা স্রষ্টার সামনে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের দাঁড় করানোর সময় সন্নিকটে। ফাতিহা চোখ মেলে সামনে  তাকিয়েছে। বলল- ‘দ্যাখো আসমানটাও আগুনের রঙ ধারণ করেছে, কী হিংস্র প্রাণী।’

আমি অবাক হয়ে বললাম-‘এই প্রাণী সম্পর্কে কিছুই না জানা আমি, তুমি কতটুকু জানো?’

ফাতেহা আমার হাত শক্ত করে ধরে সামনে অগ্রসর হয়ে বলল- তুমি কি কিচ্ছু জানো না?

আমি ফাতেহার চোখে চোখ রেখে বললাম,-‘জানি না, কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে নাকি?’

ফাতেহা বলতে শুরু  করে- ‘এটা একটা ভয়ংকর প্রাণী। ইতিপূর্বে এই প্রাণীকে না কেউ দেখেছে, না কেউ শুনেছে না কেউ কল্পনা করেছে। প্রাণীটি লম্বায় মানুষের চেয়ে ছোট কিন্তু মুখ শরীরের তুলনায় বড়। সে হা করলে আগ্নেয়গিরির মত চারপাশ পুড়তে শুরু করে। সে আগুন চারিদিকে সমানভাবে  প্রায় দু’কিলো  জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। দগ্ধ হয়ে মরে পড়ে থাকে সব প্রাণী। বৃক্ষ শশ্মানের চিতার মত কয়লার রঙ নেয়। ঘর বাড়ী ছাইয়ের মতো উড়তে থাকে। নদী পুকুরের জল আলকাতরার মত কালো হয়ে যায়।’ ফাতেহা অল্পক্ষণ বিরতি নিয়ে আবার বলতে শুরু করে,-ওর শরীর ছাইয়ের মত কালো। ছোট মাথা। রক্ত রঙের লম্বা চুল পিঠময় ছড়িয়ে থাকে। লম্বা দু’খানি হাত শরীরের সমান বড়। কান দুখানি  শরীরের চেয়েও বড় হওয়াতে সে প্রায় পাঁচ হাজার কিলো দূরের শব্দও বুঝতে পারে। সব থেকে অবাক হওয়ার মত ব্যাপার হলো সে মানুষের ভাষা বুঝতে পারে। প্রাণী বিজ্ঞানিরা বারো বছর গবেষণা করে এই প্রাণী সম্পর্কে কয়েকটা তথ্য বের করতে সক্ষম হয়েছেন। তা হলো -এই প্রাণীর নাম লাজা। কালো ধোঁয়া  থেকে এর জন্ম। এরা সংখ্যায় কোটি কোটি। পঁয়তাল্লিশ কিংবা একচল্লিশ বছর আগে একবার ওদের দেখা গিয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকবার ওরা মিলিয়ে গিয়েছিল। ওরা না কাউকে কামড়ে ধরে, না আঁচড় দেয়, না দৌড়ানি দেয় কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো এরা সত্য শুনতে পারে না। সত্য যেখানে বলা হয় সেখানে ওদের জন্ম হয়। প্রাণী বিজ্ঞানিরা এদের জন্ম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এও বলে থাকেন, মানুষের মিথ্যা কথা থেকে এদের জন্ম, সেজন্য সত্য একেবারে পছন্দ করে না।’

আমি চিন্তিত ভঙ্গিতে বললাম-‘অবিশ্বাস্য ব্যাপার।’

ফাতেহা দ্রুত বলল- ‘চোখেই তো দ্যাখতে পাচ্ছ। তবুও বিশ্বাস করো, না?’

আমি সচক্ষে দেখা অবিশ্বাস করি বলতে পারলাম না। তবে ফাতেহার ভয় কাটানোর জন্য বাদশা আকবরের কাহিনি বলতে শুরু করলাম- ‘বাদশা আকবরের দ্বীন -ই -ইলাহি ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার পর খলিফার প্রয়োজন বোধ করেন।’ এতটুকু বললে ফাতেহা বলল,- ‘বাদশার ঘটনা শুরু করলে যে?’

বললাম-‘শুনো আগে।’

মাথা নেড়ে ফাতেহা বলল-‘বলো।’

খলিফা নির্ধারণ করতে সভার আয়োজন করলেন। বীরবল ছিলেন  ব্রাহ্মণ। তিনি আবু -বকর হওয়ার দাবী জানালেন। আবু-বকর কেমন মানুষ ছিলেন একজন অমুসলিমও জানতেন। একে একে কেউ ওমর উসমান আলী হতে চাইলেন। সেখানে একজন মাওলানা সাহেবও ছিলেন। তিনি আবু জাহেল হওয়ার দাবী জানালেন। বাদশা আকবর হেসে হেসে বললেন-‘এই পদবি চেয়ে নিতে হয়?’

মাওলানা সাহেব  বললেন-‘যেখানে আপনার মত মানুষ নবী, বীরবলের মত মানুষ আবু -বকর, সেখানে আমার আবু জাহেল হওয়া ছাড়া উপায় আছে?’

আমাদের এই সময়টাতে  যতো বুদ্ধিজীবী প্রগতিশীলেরা আছেন তারাও বীরবলের মত আবু-বকর হওয়ার ভান ধরে আছেন। দেশে ধর্ষণ হলে তারা কথা বলে না, টাকা পাচার হলে তাদের দেখা মিলে না, ব্যাংকের সোনা দস্তা হয়ে গেলে তারা চুপচাপ, বন্যায় মানুষ ডুবে গেলে তাদের দেখা মিলে না-তারা কেবল মাওলানাদের জঙ্গি ধর্ম ব্যবসায়ী বলে অস্থির এমনকি নবীজিকে অসম্মান করতেও ভুলে না। গলা খাঁকরি দিয়ে আবারও বললাম-‘এই রকম জগতে লাজা সৃষ্টি হবে নাকি পুষ্পবাগান সৃষ্টি হবে?’

ফাতেহা বলল-‘লাজা সৃষ্টি হওয়ারি কথা।’

আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে পড়েছি। ফাতিহা বলল,-‘একটু বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন ছিল কিন্তু যে করে লমলমিয়ে আগুন  আসছে উপায় নেই। সম্ভবত আমরা দু’কিলো অতিক্রম করে ফেলেছি, বেশিক্ষণ আর হাঁটতে হবে না।’

মাথা নাড়িয়ে বললাম-‘এই প্রাণী কি প্রাকৃতিক নাকি যান্ত্রিক?’

ফাতেহা থতমত খেয়ে বলল-‘এরচেয়ে বেশি জানি না, খুব সম্ভবত এটা প্রাকৃতিক হবে। সত্য বলার ঘ্রাণে এরা চলে আসে।’

আমরা বিপদসীমা অতিক্রম করে নিরিবিলি এক মাঠে আসি। মাঠের চারপাশে অনেক রকম গাছগাছালি। মেহগনি, রেইনট্রি, ইউক্যালিপ্টাস গাছের সারি। কোথাও বেত ঝোঁপ, স্বর্ণলতার ঝোঁপ। ফাতেহাকে জায়গার নাম জিজ্ঞেস করলে হেসে বলল- ‘এটা পোড়ামন মাঠ। বিরহে যাদের মন পুড়ে দগ্ধ হয়ে যায় তারা এখানে আশ্রয়ের জন্য আসে।’

আমিও হেসে বললাম-‘তোমাদের এখানে তবে সত্য বলা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে?’

ফাতেহা বলল-‘আমাদের তোমাদের বলে কথা নেই সব দুনিয়াতেই সত্য বলা নিষেধ হয়ে আছে।’

আমি বললাম-‘তুমি যা বলছো তা তো সত্যই তবে লাজা এখানে এসে যাবে যে।’

ফাতেহা বুদ্ধিদীপ্ত গলায় বলল-‘এখন থেকে আমাদের সত্যকে মিথ্যা করে বলতে হবে। বিপরীত ভাষায় আমাদের কথা বলতে হবে।’

আমি হেসে বললাম-‘আমি তোমাকে ভালোবাসি এর বিপরীত বাক্য যদি বলতে হয় আমি ব্যর্থ হব।’

ফাতেহা ওই দিকে হাত উঁচু করে বলল-‘ওই দ্যাখো আমাদের বাড়ি ঘর গাছগাছালি সব পুড়ে ছাই।’

ফাতেহার যে গ্রামের নাম দিয়েছিলাম ভালোবাসার শহর। হলুদ ফুলের স্বর্গ। নীল জলের বাগান । নিমিষে পুড়ে ছাই। এখানে  একটু আগে ভালোবাসার অপূর্ব এব জগৎ ছিল বিশ্বাস করার উপায় নেই। মনে হয় যুগ যুগ ধরে এই পল্লীতে মানুষের বাস নেই, পাখিদের বাস নেই, গাছেদের স্থান নেই: যুগ যুগ ধরে এ যেন ছাইয়ের নগরী। আমার খুব কষ্ট হতে থাকে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হয় কিন্ত সব গোপন করে বলি-‘আমি যদি সত্যি করে তোমাকে ভালোবাসি বলি, তবে কি লাজা  ভয়ংকর আগ্নেয়গিরিতে আমাদের ছাই করে ফেলবে?’

ম্লান গলায় ফাতেহা বলল-‘সন্দেহ নাই।’

ফাতেহার বিষন্ন চোখে তাকালাম। যে দু’চোখে আনন্দেরা ঝিলমিল করতো নিমিষে সে চোখে বিষন্নতা ভর করে। মনে হয় আকাশকে অন্ধকার ঢেকে ফেলেছে। ভয়ংকর বৃষ্টি নামবে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। সে বৃষ্টিতে পুরো দুনিয়া ডুবে যাবে। আস্তে করে বললাম-‘যেখানে সত্য করে সুন্দরকে সুন্দর বলতে পারবো না, ঘৃণাতে থুতু দিতে পারব না সেখানে বেঁচে থাকার চেয়ে ছাই হওয়া মন্দ কী?’

ফাতেহা বাঁধা দিয়ে বলল-‘ওত প্রতিবাদী হতে যেও না। লাজা তো এখনো কাছে। ছাই করে ফেলবে।’

আমি বললাম-‘যে পৃথিবীতে তোমাকে ভালোবাসি সেখানে  বলতে হবে ঘৃণা করি, এই পৃথিবীতে আমি থাকতেই চাই না। মিথ্যাবাদী হয়ে বাঁচার চেয়ে সত্যবাদী হয়ে ছাই হওয়া ভালো। আমি সে ছাই হয়েও বলব-তোমাকে ভালোবাসি। চিৎকার করে বলব-ভালোবাসি তোমাকে ,ফাতেহা।’

ফাতেহা আবারো আমাকে বাঁধা দিতে চেষ্টা করে। সে মুহূর্তে এক  বিকট আওয়াজে ফাতেহা আতঙ্কে হিম হয়ে যায়। আমিও কেঁপে উঠি। চেয়ে দেখি আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছিটকে আসছে। ভস-ভস শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। ফাতেহা সর্বস্ব দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না মাখা গলায় বলে-‘চলো দৌড়ি। যদি বেঁচে যাই আবারো দেখবো তোমায় যদি ছাই হয়ে যায় আর ডাকব না তোমায়। ভালো থেক তুমি।’

আমরা দৌড়াতে শুরু করি। ফাতেহা শক্ত করে আমার হাত ধরে রাখে। আমরা কেউ আর কথা বলি না। কেবল দৌড়াই। ভাবি, যে করেই হোক লাজার সীমানা অতিক্রম করতে হবে। বাঁচলে অনেক কথা বলা যাবে কিন্তু কি কথা বলব, সত্য না বলে বেঁচে থেকে লাভ তো নাই। লাভ লসের হিসেব পরে হবে। আগে দৌড়াই। আমরা সব পিছুটান ভুলে দৌড়াই। যেন দৌড়ানা ছাড়া জগতে আর কোন কাজ নেই আমাদের।

 

ফেসবুকে ফলো করুন- দিব্যপাঠ সাহিত্য পত্রিকা

আরো পড়ুন- রাখী সরদারের কবিতা