রুশিয়া জামান রত্নার গল্প- চুপ

১.

ক্লাসরুমের দেয়ালে টাঙানো মস্ত বড়ো ঘড়িটা বলছে, এখন সোয়া এগারোটা বাজে। আনিস স্যার কিছুক্ষণ আগে ক্লাসে ঢুকেছেন। তাঁর হাতে একটা ফাইল।  ফাইলে অনেকগুলো কাগজের টুকরো। প্রতিটি টুকরোয় একটি করে ইংরেজি শব্দ লেখা আছে।  ক্লাসের সবার হাতে হাতে টুকরোগুলো পৌঁছে দিয়ে তিনি বললেন,

: তোমরা সবাই ইংরেজি শব্দগুলোর মানে খুঁজে বের করবে আর যারা বের করতে পারবে তারা হাত তুলবে। মুখে কোন কথা বলা যাবে না। সময় মাত্র ৫ মিনিট।

 

আনিস স্যার,  স্কুলের সিনসিয়ার ধাঁচের একজন ইংরেজির শিক্ষক।  নতুন চাকরি। সবসময়ই নিজেকে ছাত্রদের জন্য ব্যস্ত রাখেন। চেষ্টা করেন নতুন নতুন মেথড তৈরি করে সৃজনশীলতা আনতে। কিন্তু মুশকিল হলো,  অজপাড়াগাঁয়ের ছেলেমেয়েরা তার মেথড বুঝতেই পারে না। উল্টো নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে।

আনিস স্যার, হাল ছাড়ছেন না। তিনি নিত্য নতুন এক্সপেরিমেন্ট এপ্লাই করে যাচ্ছেন।

: এই ক্লাসে আন্না কে?

পিয়নের মুখে নিজের নাম শুনে শেষ বেঞ্চে বসা আন্না চমকে উঠলো। পড়াশোনায় সে ভালো না তা ঠিক কিন্তু সে স্কুলে তার একদিনও কামাই নেই।

 

আনিস স্যারের অনুমতি নিয়ে সে পিয়নের পিছু পিছু গেলো। আন্নার বড় ভাই,  আনোয়ার স্কুলে এসেছে তাকে নিয়ে যেতে।

 

: বাড়িতে কি হইছে?

উৎকন্ঠা মেশানো গলায় আন্না প্রশ্ন করে।

: কিছু না। মা পাঠাইছে। এক্ষুনি বাড়ি যাইতে বলছে।

 

আন্না কোনমতে স্কুলের ব্যাগটা নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল।

 

 

আন্না খাতুন। তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন। মধ্যবিত্ত গেরস্ত পরিবারের সন্তান।  বহু ঝাড়ফুঁক আর তাবিজ ঝোলানোর পর আল্লাহ মুখ তুলে চেয়েছেন৷ পর পর তিন ছেলে হবার পর  নায়েব শেখ বেশ মনক্ষুন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ে হবার পর তার মনে হয়, এখন সংসারে  পূর্ণতা এসছে। আর সন্তানাদি দরকার নেই।  তাই মেয়ের নাম রাখেন আন্না।  অর্থাৎ আর না!!!

 

২.

বাড়ির উঠানে পা দিতেই আন্নার মনে হলো ভুল কোথাও উপস্থিত হয়েছে।  বাড়ি ভর্তি অচেনা কিছু মানুষ গিজগিজ করছে। এদের কাউকেই সে কখনও দেখেনি। সময় গড়ানোর সাথে সাথে আত্মীয় স্বজনদের আগমন ঘটছে। কেউ একজন আন্নার কানে কানে বলে গেলো,

: আন্না,  আজ তোর বিয়ে।  জামাই দেখতে খুবই সুন্দর।  বাড়ির অবস্থাও ভালো। পোস্তা করা ঘর।

 

আন্না হতভম্ব।  ওর বয়স সবে মাত্র ১৬ বছর। এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবার কথা। পরীক্ষা দিলেও ও যে পাশ করতে পারবে না সে সম্পর্কে সবাই সুনিশ্চিত।  এ পর্যন্ত কোন ক্লাসেই সে সব বিষয়ে পাশ করতে পারেনি।  পড়াশোনার আগ্রহ নেই সেটা বলা যাবে না। কিন্তু দোষ সব মাথার। ক্লাসের স্যাররা কি পড়ান ও কিছুই বুঝে না।

 

আন্নার মা ওকে বহু কষ্টে সহ্য করে আছেন। বাপের আহ্লাদে গোল্লায় যাওয়া বাড়ন্ত বয়সী এই মেয়েকে তার বোঝা মনে হয়।  সারাদিন একটা কাজও ধরে না। তাই, মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে তার আগ্রহ চোখে পড়ার মতো।  মেয়ে বিয়ে দিয়ে শশুরবাড়িতে পাঠানো হলেই আপদ বিদায়।  এরপর ছেলেদের বিয়ে করিয়ে সংসার থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে বিশ্রাম করবেন। ভাবতেই অনাগত সুখানুভূতি তাকে শিহরিত করে।

 

আন্না ধীরে ধীরে সব শুনলো। ছেলেটির নাম ফরিদ।  ওরা দুই ভাই।  বাবা মারা গেছেন বহু বছর আগেই। বাবা মারা যাবার পর সংসারের হাল ধরেন হাসান। হাসান ফরিদের বড় ভাই।  হাসান, বহু কষ্টে কুয়েতে একটা চাকরি নিয়ে চলে যায়। আর নিজের মেধার জোরে মালিকের বিশস্থ হয়ে উঠেন। সে বেশ মোটা অংকের মাইনে পায়। একসময়ে চরম দারিদ্র্যতা থাকলেও এখন এলাকার গণ্য মান্য ব্যক্তিদের তালিকায় তাদের রাখা হয়। সমাজের আভিজাত্য  এখন টাকার মাপকাঠিতে হয় কি না!!

 

হাসান বছর তিনেক আগে দেশে এসেছিল। ৬ মাসের ছুটি নিয়ে এসেছিল। বিয়ে আর পাকা করা দালান বাড়ি তুলতেই সময় পার হয়ে গেছে৷ ছুটি শেষ হতেই আবার উড়ে চলে গেছে। আবার হয়তো ৫ বা ৬ বছর পর আসবে।  নতুন বউ শরিফা স্বামীকে মাত্র ৪ মাস কাছে পেয়েছে। যদিও এই চার মাস হাসান নতুন বাড়ির কাজ নিয়েই ব্যস্ত ছিল।  শরিফাকে বুঝবার বা নিজেকে শরিফার কাছে পুরোপুরি বুঝানোর সময় তার হয়ে উঠেনি। শরিফা একদিন মিনমিন করে বলেছিলো,

: আর কয়দিন পরে গেলে হয় না? আপনের সাথে তো তেমন সময় কাটাবার  ফুরসত হলো না।

 

: শোন শরিফা! জীবন খুব কঠিন। আমার আব্বা মারা যাবার পর আমি ঐটুকুন বয়সেই জীবন কি তার মানে বুঝতে পারছি। এ পৃথিবীতে আবেগের মূল্য কম।  কারণ হইলো, আবেগের সাথে অর্থনীতির কোন সম্পর্ক নেই। যে জিনিসের সাথে অর্থের সম্পর্ক নাই, সে জিনিস পৃথিবীতে মূল্যহীন।

কোন চিন্তা করবা না। আমি তাড়াতাড়িই চলে আসবো।

 

শরিফা এত কঠিন কঠিন কথার  মানে তেমন বুঝেনি। তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের কাজে চলে গেছে।

 

শরীফার বয়স ১৯ বা ২০ হবে। সারা বাড়িতে মোটে তিনজন মানুষ।  শরীফার সাথে দেবর ফরিদের বেশ ভালো সম্পর্ক।  ভালো সম্পর্ক সবসময় সবার জন্য বা সবার কাছে ভালো নয়। ফরিদের মা বেশ বুদ্ধিমতি মহিলা। তাই, গুঞ্জন ডালপালা মেলার আগেই আন্নার সাথে ফরিদের বিয়ের পাকা বন্দোবস্ত করেছেন। মেয়ে পক্ষকে খুব বেশি সময় দেয়ার মত বোকা  তিনি নন। পাছে তাদের বাড়ির কেচ্ছা জানাজানি হয়। আর মানুষজনও ভালো কথা দ্রুত ভুলে যায়, বেশি বেশি গোপন করার চেষ্টা করে।  আর মন্দ কথা বছরের পর বছর জিইয়ে রাখে।  এমনভাবে আগলে রেখে চর্চা করে যেমন বাপ দাদার আমলের অমূল্য সম্পদ।

 

৩.

আন্না একদম চুপ। সে এখনও জানে না কার সাথে তার বিয়ে হচ্ছে।  ছেলেটি দেখতে কেমন,  গলার স্বর কেমন। স্কুলের কেউই জানে না,  আন্নার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।  জানলেও হয়তো ওরা চুপই থাকবে। যারা ভালো ছাত্রী নয়, তাদের খোঁজ স্কুলের কেই বা নেয়। প্রতিবেশীরাও চুপ।  বাড়ন্ত বয়সী একজন মেয়ের বিয়ে হলে আপদ যায়।

 

যথাসময়ে বিয়ের কাজ শেষ করে বর পক্ষ আন্নাকে বাসায় নিয়ে গেলো।  প্রথম রাতেই আন্না বুঝলো ফরিদ অন্যমনস্ক।

 

১৬ বছরের আন্না এখন পুরোদস্তুর সংসারী।  সংসারের সব কাজ তার এক হাতে সামাল দিতে হয়। এত বড় বাড়ি,  এত এত জিনিসপত্র গুছিয়ে ঠিকঠাক রাখা, সবার জন্য দু’বেলা রান্না করা,  সবার হুকুম তামিল করতে করতে কখন যে মেঘলাআকাশের বুকে অন্ধকার ভেদ করে মস্ত বড় চাঁদ উঠে ও বুঝতেই পারে না।

 

মাঝে মাঝেই ফরিদ ঘরে থাকে না। আসে অনেক রাত করে।  কোন কিছু বলতে গেলেই আন্নার গালে সজোরে থাপ্পড় বসিয়ে উত্তর দিয়ে দেয়। আন্না তাই ভয়ে কিছু জিজ্ঞেসও করে না। বাবা মাকে বলেও সে কোন কূল পাচ্ছে না। ফরিদের বিষয়ে কিছু বলতে গেলেই আন্নার মা হুংকার দিয়ে উঠেন,

: পুরুষ মানুষের রাগই হইলো সৌন্দর্য।  ফরিদের অভাব কিসের।  অর্থ সম্পদের অভাব নাই। টাকা পয়সার অভাব না থাকলে মেয়ে মানুষের আর কিছুর দরকার নাই।

 

: ভাবীও আমার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেন। আর ফরিদের সাথে…..

 

: চুপ,  চুপ।  খবরদার! আর কোনদিনও এসব কথা মুখে আনবি না। এক কান দুকান ছড়াছড়ি হইলে মুখ দেখান দায়।

 

বলেই,  ধুক ধুক বুকে আন্নার মা উঠে গেলেন। চোখে মুখে উৎকন্ঠা।  তাহলে তিনি কি ভুল করলেন? বিয়ে দেবার আগে একবার খোঁজ খবর নেয়া উচিত ছিল।  কিন্তু এখন কি উপায়?

 

আন্নার শাশুড়ী এসেছেন আন্নাকে নিয়ে যেতে।  আন্না যেতে চায় না। কিন্তু বাবা মা একপ্রকার জোর করেই যেতে বাধ্য করলেন।

 

 

ফরিদের সাথে শরিফার মাখামাখি আন্নার চোখ এড়ায়নি। কিন্তু সে কি করবে, কার কাছে বলবে।  এসব অশ্লীল কথা ছড়াছড়ি হলে সমাজে মুখ দেখানোও মুশকিল হয়ে যাবে।

 

: আন্না, তোমার চেয়ারম্যান চাচা এসছেন। চা নাস্তা নিয়ে আসো।

শাশুড়ির ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে আন্না ছিটকে এলো।

দ্রুত পায়ে বেরিয়ে চেয়ারম্যান চাচাকে সালাম জানিয়ে,  রান্না ঘরে প্রবেশ করলো।

 

প্রায় ২০ বছর ধরে ছালাম সাহেব এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।  আন্নার শশুর মারা যাবার পর এই চেয়ারম্যান সাহেব ফরিদদের আগলে রেখেছেন।  মাঝে মাঝেই চেয়ারম্যান সাহেব ওদের বাড়িতে আসেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে ফরিদের মায়ের সাথে আলাপ করেন। কোন কোনদিন একেবারে রাতের খাবার খেয়ে বাসায় ফিরে যান।

 

 

৪.

বৃষ্টির ঝুমঝুম আওয়াজে ঘুম ভাঙতেই আন্না চমকে উঠলো।  পাশ ফিরে দেখলো ফরিদ নেইা।  বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে উঠলো। পা টিপে টিপে ভাবীর রুমের দরজার কাছে দাঁড়ালো।  শরিফার রুমে মোম বাতির আলোয় আবছা আলো অন্ধকার খেলা করছে।  জানলার কাঁচে চোখ লাগিয়ে ভিতরটা দেখলো।  আলো আঁধারে দুজন নরনারী নিজেদের মধ্যে ডুবে আছে।

 

এমন দৃশ্য দেখে সে ছুটলো তার শাশুড়ীর ঘরের দিকে।  শাশুড়ীকে আজ হাতে নাতে প্রমাণ দেখাবে। কিন্তু শাশুড়ির ঘরের  কাছে যেতেই তার গাঁ হিম হয়ে এলো। ঘরের সামনে সালাম চেয়ারম্যানের জুতো।  দরজার ফুটো দিয়ে তাকাতে কিছুক্ষণ আগের দেখা দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখে সে আর নিতে পারলো না।

“আঃ” বলে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।

 

পরদিন ভোরে ঢাকা আরিচা মহাসড়কের পাশে ব্রিজের নিচে আন্নার লাশ পাওয়া যায়।  গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে ওকে হত্যা করা হয়েছে।

 

কারোরই বুঝতে বাকি রইলো না যে কে হত্যা করেছে। মামলা হলো।  শুধু তারিখের পর তারিখ, দিনের পর দিন যেতে লাগলো। এর ওর কাছে দৌড়ে আন্নার বাবার অবস্থা কাহিল। জমিও বিক্রি করে দিল। তারপর একদিন ছালাম চেয়ারম্যান এলো আন্নার বাবার সাথে দেখা করতে।

: দেখেন, যা হবার তো হয়েই গেছে।  আল্লাহর মাল আল্লাহ তুলে নিলে আমার আপনের কোন কিছু করার নাই। জন্ম মৃত্যু সব আল্লাহর হাতে।  শুনলাম,  আপনি নাকি জমি বিক্রি করে দিছেন। ছেলেদের সাথেও ঝামেলা হইতেছে। এসব করে সংসারে অশান্তি আনতেছেন।

 

ছালাম চেয়ারম্যান ধীরে ধীরে গলার স্বর নিচু করে কথাগুলো বললেন।

:হুমমম।

 

দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন আন্নার বাবা।

 

: আমি আপনার জন্য সামান্য কিছু উপহার নিয়ে আসছি।

পকেট থেকে একটি প্যাকেট বের করতে করতে ছালাম সাহেব বললেন।

 

একপ্রকার জোর করে আন্নার বাবার হাতে প্যাকেটটা গুঁজে দিয়ে বললেন,

: এখানে তিন লক্ষ টাকা আছে। সারা জীবন পায়ের  উপর পা তুলে বসে থাকতে পারবেন। শুধু একটাই অনুরোধ চুপ থাকবেন।

 

আন্নার বাবা একদম চুপ করে রইলেন। ছলছল দৃষ্টিতে দেখলেন ছালাম সাহেব তার বাড়ির উঠান পেরিয়ে রাস্তা ধরে হেঁটে চলে যাচ্ছে।

 

কয়েক মাস পরই ফরিদ, শরীফা আর ওর মা জেল থেকে ছাড়া পেলো।  ছাড়া পেয়েই ফরিদের জন্য পাত্রী দেখার কাজে নেমে পড়লেন। ছালাম চেয়ারম্যানও আগের মতই ও বাড়িতে যাওয়া আসা শুরু করলেন।

 

আন্নার হত্যাকান্ড নিয়ে এখন সবাই চুপ।  আন্নার বাবাও চুপ।  কেবলমাত্র আন্নার মা মাঝে মাঝে মধ্য রাতে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠেন,

: আন্না, মা!!!  কই গেলি মা?

সে কান্নায় রাতের আকাশ ভারি হয়।

 

*রুশিয়া জামান রত্না- সমাজসেবা অফিসার, সমাজসেবা অধিদপ্তর। 

আরও পড়ুন- আল মাহমুদের গল্প – পানকৌড়ির রক্ত