রাখী সরদারের কবিতাগুচ্ছ

কদম্ব অনুরাগ

 

এই যে কদমভ্রমে

খোঁপায় জড়িয়ে দিলে

বিচ্ছেদের কাঁটা , এ আমি

কীভাবে খুলি?

কদমফুল অর্থে সেই

আষাঢ় আবেগ , আকাশভাঙা বৃষ্টি

লগ্নতার খোঁপায়

স্পর্শবিধুনিত হয়ে থাকা

তোমার আঙুলের ঘ্রাণ … এ আমি

কিভাবে ভুলি!

কোনো এক মেঘলা দুপুর

পরিয়ে দিয়েছিলে তৃষ্ণার কাজল

ঝরো ঝরো জলের সুরে পড়ছিলে –

ক্ষীণমধ‍্যা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা,

নিম্ননাভি,শ্রোণীভারে অলসগমনা…

 

বৃষ্টিবনে দিশেহারা উন্মাদ ময়ূর

বৃক্ষ  স্তন চুঁইয়ে অবিরল সবুজ

প্রবাহ…

 

শ্লোকসঙ্গমে  ক্লান্ত দুজনে

ভিজছিলাম নিদারুণ…

 

তারপর , চারদিক

জল সম্মোহন কেটে গেলে

দেখি ,আমি একা …

কতদিন বৃষ্টি নেই , মেঘ নেই ,

কবিতা …

প্রসাধন টেবিলের সামনে কেবল

পড়ে আছে রৌদদগ্ধ এক

প্রত‍্যাশার হাত

ছড়িয়ে ছিটিয়ে কটি মাথার কাঁটা

আর আয়নার কাচের দূ্রত্বে তুমি

বারংবার কেঁপে উঠছো অন‍্য এক

বদনমদিরা চুম্বনে

ভিতর ভিতর

তখন আমি  তীব্র বিদ‍্যুৎ

আমি কী এত‌ই ভিক্ষুণী

সতীন সম্মুখে বাঁধব কেশদাম!

হে আমার তমোসিনী খোঁপা

বেদনার কালো নিংড়ে

মেঘ হ ও … বৃষ্টি

বৃষ্টি…

যা কিছু সব যন্ত্রণা ধুয়ে মুছে

আজ হোক কদম্ব অনুরাগ …

 

অর্ধমৃত রাজহাঁস ও একটি গোলাপ

 

কিছুদিন যাবৎ আমার সঙ্গে

এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটছে,

যে ঘটনার কোনো বাস্তব রূপচিত্র নেই।

কাশশুভ্র জ‍্যোৎস্না রাত্রিও আমার

কাছে যেন সূচীভেদ‍্য অন্ধকার।

চোখ বন্ধ করলেই বিসর্জনের প্রতিমা  ভেসে উঠতো । যত রাত

গাঢ় হয় ঘুমের ছায়াভূমির ভিতর

স্থির দাঁড়িয়ে থাকে একজন পুরুষ।

তার নরম কাদার মতো দেহ,

স্পর্শ পেলে এই বুঝি গলতে গলতে ঘোলা নদী।

দু’চোখ যেন মৃত উৎসবের

প্রতীক। প্রশস্ত ললাট জুড়ে টগবগে

একটি অশ্বের ছবি। ছবিটি এত ই

জীবন্ত যে সামান্য ইশারায় খুরধ্বনি

তে রক্ত ছিটিয়ে ছুটে যাবে দূর

অনন্তে। পুরুষ টির সমগ্র মুখের

মধ্যে সবথেকে ভয়ংকর মোটা

খসখসে ওষ্ঠ। প্রতি সেকেন্ডে সে

ওষ্ঠের বর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে।এই

কর্ণপিশাচিনীর মত রক্ত লাল তো

এই রক্তহীন ফ‍্যাকাসে সাদা‌।

এমন দৃশ্যের সঙ্গে প্রতিদিন ভীষণ সংঘর্ষ।

 

আমার দু’চোখ জুড়ে কেন এমন

ছায়াছবি!তবে কি চোখের পুতুল

অভিশাপগ্রস্ত!নাকি ভালোলাগার

পাখিটি নিঃশব্দ হতাশায় ক্রমশ

উন্মাদ, সে যা দ‍্যাখে তাইই আঁধার-

পিণ্ড। তবে ওই স্থবির পুরুষ কে?

কি তার অভিপ্রায়? জানিনা, কিছু

জানিনা। বুকের ভিতর দলা

পাকাচ্ছে কান্না মথিত শোক।

চোখের শিরা উপশিরা যন্ত্রণায় ফেটে

যাচ্ছে, ঘুমপোকারা কিলবিল করে

বেরিয়ে আসছে পৃথিবীর বাতাসে।

বদলে যাচ্ছে আকাশের তন্ময়তা।

অসংখ্য নক্ষত্র আলোর কূপী উল্টে

মরা কাকের চোখ! কালপুরুষ

তির ধনুকে এক ঝলক ঝলসে

উঠে ডুবে গেল অন্ধকার জঠরে।

 

সহসা ভিতর ভিতর যা কিছু গ্লানি ,

যা কিছু  বিষাদ,বিক্ষোভ বিদ্রোহ করে ওঠে।

রক্তস্রোতে বেজে ওঠৈ দামামা।

অন্ধকারের দেওয়াল ভেঙে ছড়িয়ে

পড়ছে নীল আলোর শ্রুতি। সেই

আলোর তীব্রতায় ঘুমপোকারা

মুহূর্তে বিলীন। নিঃস্প্রদীপ আকাশ

ঘিরে নক্ষত্রের লাবণ্য‌।ঘুমের

ছায়াভূমি পলকেই দারুচিনি দ্বীপ।

কোথাও বনলতিকার শোভা,কোথাও

ঘাসের ডানায় বিন্দু বিন্দু ফুল।

অপরূপ সেই দ্বীপের মাঝে দাঁড়িয়ে

পূর্বে দেখা সেই পুরুষ।এখন তার

শরীর চুঁইয়ে দৃপ্ত পৌরুষ । দু’চোখে

সমুদ্র সৌন্দর্য্য। কেসুতপাতার মদের

ন‍্যায় নেশাধরানো ওষ্ঠ‌।

 

ললাটে চিত্রিত অশ্বের ছবি প্রায় অস্পষ্ট।

এক হাতে

তুষারস্তূপের মতো ধবধবে এক

রাজ হাঁস। যার গ্রীবা  যেন সিল্কের

রুমাল।হাঁসটি অর্ধমৃত চোখে আমার

দিকে তাকিয়ে।অন্য হাতে গাঢ়

কমলা রঙের একটি গোলাপ কলিকা।

এমন বৈষম‍্যে আমি

কেঁপে উঠি। একদিকে প্রেম,

ভালোবাসা,জীবনের কাছে সমর্পণ,

অন‍্যদিকে মৃত‍্যুকে আহ্বান!

আমার অন্তরে জেগে ওঠা এমন

উপলব্ধিতে সেই পুরুষ উত্তেজিত।

 

দূরে কোথাও অশ্বের ক্ষুরধ্বনি।

সেই শব্দে জেগে উঠছে পৃথিবী।

বেজে উঠছে প্রত্নযুগে হারানো

বৃহৎ বাঁশির সুর।সেই সুরে চরাচর

দুভাগ হয়ে যাচ্ছে।একদিকে

জন্মের উদ্ভাস, সূর্যের আলোয়

ঘটে চলেছে সহস্র অঙ্কুরোদগম,

অন‍্যদিকে বৃহৎ এক কৃষ্ণ মহিষ

রক্তচক্ষু নিয়ে তেড়ে আসছে আমার

দিকে ।মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন সেই

দুরন্ত পুরুষ।

তার প্রশস্ত ললাট চিরে বেরিয়ে আসছে টগবগে এক বাদামি

ঘোড়া। যার পিঠে স‌ওয়ারি হয়ে

আছেন সালঙ্কারা এক রমণী।

তার মুখ দেখে চমকে উঠি।এ যে

আমি!যার মধ্যে এক‌ই সাথে  প্রেম, অপ্রেম, বিচ্ছেদ বিষাদ মিশে।

বিস্ময়ে কেমন অর্ধচৈত‍্যন‍্য হয়ে পড়ি।

কিছু ক্ষণ পর সম্বিৎ ফিরে এলে

অস্ফুট উচ্চারণ করি –

“আমি কে?”

তুমি “প্রাকৃতপ্রকৃতি” কথা কটি

বলতে বলতে সেই দুর্বোধ্য পুরুষ

ধীর লয়ে মিশে যাচ্ছে ভূত ভবিষ‍্যের

ছায়াপথে। ততক্ষণে রাত্রির কুয়াশা সরিয়ে ফুটে উঠছে সুদর্শন

ভোর। দু’চোখের গভীরে তখন

অন্তহীন আলো,আলো,আর আলো…

 

রাখী সরদার: কলকাতা। 

আরো পড়ুন: শ্যামশ্রী রায় কর্মকারের কবিতা

ফেসবুকে ফলো করুন- দিব্যপাঠ সাহিত্য পত্রিকা