মাহফুজ সজলের একগুচ্ছ কবিতা

শিরিন আবু আকলেহ্

 

আবু আকলেহ,

তোমাকে আমার দ্রোহী যৌবনের

সমস্ত পক্ষপাত দিই- আমার প্রতিরোধী

সত্তার সমূহ জাগরণ। স্বাধিকার উদ্বুদ্ধ

হে অধিনায়িকা, আরামের লোভে সন্ত্রস্ত

মা’কে ত্যাগ করে, ইতিহাসে বর্বর দালাল-

দের মতো তোমাকে খুঁজতে হয়নি, রুগ্ন

এ পৃথিবীর পা-চাটা রাজনৈতিক শরণ।

 

প্রতিপদ মৃত্যুর সাক্ষাৎ বুকে, একজন

সংবাদযোদ্ধা হিসেবে তোমাকে দেখে মনে

হয়েছে, ঘৃণার পৃথিবীতে ভালোবাসার মতো

প্রতিরোধে, শির সমুন্নত ধুলায় মিশে যাওয়ার

চেয়েও বড় কোন গৌরব নেই। মনে হচ্ছে,

সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব এ’ই- সঙ্গত সমষ্টির

জন্যে প্রয়োজনে জীবন বলিদান।

 

আকলেহ্,

নিতান্ত মাজলুম বোধে যতবার তোমার

কনফিডেন্ট অবয়ব চোখে পড়ছে আমার;

যতোবার জান্তব ব্যাঘ্রের মুখে মানবিক

বাঘ- এমন এক ফিলিস্তিন আমাকে

নিরীহপনার ছোটত্বে বাঁধছে, ততোবার

ঐশ্বরিকভাবে তোমার অন্তর্গত সমরাস্ত্রের

প্রকৃত বারুদ হয়ে ঝরছি আমি।

 

প্রতিইঞ্চি প্যালেস্টাইন তোমার প্রেমিক

হৃদপ্রাচীরে সুরক্ষিত হোক। আবু আকলেহ্,

আমি বিশ্বাস করি, তুমিই কালের কৃতকার্যতা

পেয়েছ। কেননা, সত্য সাহসের চেয়ে মহৎ

কবিতা মানুষের পৃথিবীতে নেই কিছু আর।

 

তুচ্ছ ব্যবসার খাতিরে, নিছক শোষণমনা

গোঁয়ার্তুমির বশে যারা ফুলের পৃথিবীকে

হিংসায় পুড়ে ছাইভস্ম উড়াতে চায়, তারা

হীন কাপুরুষ ইজরায়েল কী শয়তানের

ইউনাইটেড স্টেটস, তাদের প্রতি আমার

বৃদ্ধাঙ্গুলি ও দুর্দমনীয় অবজ্ঞা। তাদের জন্য

রয়েছে ধুকেধুকে আত্মহননের ক্রুর অনল!

অনন্ত প্রকৃতির ইতিহাস অন্তত তাই বলে!

 

সেই ইতিহাসে তোমাকে আমি পৃথিবীর

সমস্ত শোষক- ভীরুদের গালে চপেটাঘাত

হিসাবে বিপ্লবী কবিতার ধ্বজা করে নিলাম।

 

 

 ঠিকানা বদল

 

ফেলে যাচ্ছি

কিছু একনিষ্ঠ আন্তরিক ঢেউ

দখিন হাওয়া- স্মৃতির মরমী জানালা

ফেলে যাচ্ছি একা দশাননপ্রসূ

অস্তিত্বসংগ্রাম। খাবারে, তেলচিটে

বালিশে কালো পিঁপড়ের প্রতিদিনকার

সখ্যতা; রক্ত চুষেও আমাকে নির্বিকার

পেয়ে বেকুবের মতো ফিরে যাওয়া

ছারপোকার বিস্ময়গুলো ফেলে যাচ্ছি-

 

নিঃসঙ্গতা কাতরানো পরিচিত দেয়ালের হুঁহুঁ

দীর্ঘশ্বাসে কেঁপে উঠা আনমন ক্যালেন্ডারের

পাতা ফেলে যাচ্ছি মন খারাপে একলা

কবিতার খুশি- প্রিয় রুমমেট শূন্যতাকে।

 

নিয়ে যাচ্ছি এখানেই থেকে যাবার

পিছুটানে নতুন চিনচিনে ব্যথা-

তোমাকে আর পাবো নাকো

পুরনো পাঁচিল জুড়ে বিস্তারিত

কলমির প্রাণ (আশ্চর্য, কাউকে না

পেয়ে কতো কতোদিন শুধু তোমার

সাথে কথা বলেছি)। নিয়ে যাচ্ছি

সাময়িক দেহ- অভ্যাসের খোলসে

বড় হওয়া আর নিয়ে যাই মানবাত্মায়

বদলে যাবার সম্ভাব্য আগামসকল।

 

মোড়ের খন্ড মুসাফিরি থেকে যাবে

ধীরে মুছে যাবার স্বাভাবিকতায়,,,

সিগারেটের ফোমে ভরে যাওয়া ভাঙা

বেলকনি, তুমি প্রিয় হয়ে উঠেছিলে।

 

 

 মা’কে

 

আকাশ দেখি মা। আর এ

চৈতিরাতে মনে মনে– ভাঙা

কাইত্তা বিছায়া শুয়ে পড়ি

সেই মাটি- পুরনো উঠোনে।

 

আকাশটা দেখি —

ঘুপছি গলির ফুটো থেকে

বুক ভরে; মাথার উপরে

অগণন তারার বিথার

সেই বালকবেলার মতো

রহস্যরকম অপলক!

 

কী-যে ভাবি- কতো

ফুল বুঝি মায়া বুঝি, আমাতে

বিভোর চির নিঃস্বার্থ ঈশ্বরতায়!

 

আকাশ দেখছি মা-

তোমার বড়ত্ব অনুভবের

সকলতায়। তোমার ঘ্রাণবহা কোনো

পরম হাওয়া আমাকে ভাসিয়ে নিচ্ছে

আমাদের সেই পুরনো স্বপনে-

 

আমরা একই দুঃখের দুঃখী ছিলাম!

 

 

বিস্তীর্ণ নীলফুল

 

আত্মবিগ্রহে বিক্ষত আছি

বাঞ্চিত আশার কর্ষণ আধারে

বিবর্ণ ধূলার পটে যতোবার ফুল

বলে এঁকেছি জীবন– আমারই

পাষাণভার নির্দয় আচরে ধূলির

সাধনা ভেঙে গ্যাছে।

 

তবে আমি কী বার বার

আঁতুড়ের ঋণ ভুলে ফিরি!

 

গন্তব্যবাদিতার মীমাংসু

অপেক্ষা বুনে বুনে, তিক্ততাদীর্ঘ

নদী হয়ে গ্যাছে আমারই যৌগ

সংযম। উড়ে ভেসে যাচ্ছে;

ক্ষারণিক ঝরে পড়ছে কেমন

আহুত অশ্রুবীজের নিষিক্তপটে

পথের সমস্ত থিরতা!

 

আজ হয়তো হয়েছি ফুল, হয়তো

বেপথু নীলে বেনামি নদী। প্রহেলিকা,

আমিতো জীবনোত্তীর্ণ ধূলিরই কাহন

 

বলো তবে, আমি কী বার বার

আতুঁড়ের ঋণ ভুলে যাওয়া!

 

 

তারতম্যে

 

বললো সে

ধীরে গজানো দিনের মৃদু

কোড়লে। চেনা বিবর্ণতার

প্রতি- তা’র অবশিষ্ট শ্যামলে।

সে- নিরত নিসর্গছোঁয়া বুননের

স্বভাবত কমনীয়া প্রত্যুৎপন্নমতি।

 

বললো সে-

আজকের মুমূর্ষু সংবেদকল্পেও

চূড়ান্ত মধুস্বর অথচ অবজ্ঞার

কেমন বাহাস!

 

সবুজ সবুজ নয় সব

সবুজে অন্তর্হিত দেখা আছে

ঢের, দুর্বুদ্ধ দ্ব্যর্থ কলরব!

 

(ওহো, কারা কী অনুমানে

ছুঁয়ে যায় শেষের বাতাস!)

 

লোকেরা দেখেছে যা

আকাঙ্ক্ষিত নবীন জনন

প্রাণের প্রতীকী ভবিষ্য পরিবাস

দেখলো সে কেবল ভাঙা কঞ্চির

নমনবরণ- ‘ওতো একটা কচি বাঁশ!’

(কে হায় মনোমর্মে উদ্ভেদী উৎসার ভুলেছে)

 

কবি পরিচিতি: মাহফুজ সজল- কবিতাপ্রবণ ভাঙনের এক ‘কাইমেরবাউলি’ মেলা। জন্ম, বেড়ে উঠা কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর- ‘ঘোড়াউত্রা’ নদীবর্তী ‘বলিয়ারদী’ গ্রামে।  জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষাজীবন শেষ করে বর্তমানে একটি সেবামূলক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। অবসর পেলেই ঘুরতে বেড়িয়ে পড়েন বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল- ভাটিবাংলার রূপ রহম পানে। কিছুকাল মঞ্চনাটকে যুক্ত ছিলেন; বাজিতপুর ‘পৌরাণিক থিয়েটার’ এর একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। 

আরো পড়ুন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবলে পুরস্কার লাভের ঘটনাবলি