বৈশাখী নার্গিসের একগুচ্ছ কবিতা

মেকি আভরণ

১.

মনে হয় ঘোর লেগেছিল। মনে হয় বৃষ্টি নেমেছিল দুপুর জুড়ে। হাওয়ার দাপটে চওড়া কাঁধে কেউ মাথা রেখেছিল আলতো। মাধবীলতার দল হেসে গড়িয়ে পড়ছিল এ ওর গায়ে। আদিখ্যেতা বলে পাশ ফিরতেই মনের ভেতর ফুটে ওঠা ছবি ক্রমশ ছুঁয়ে যাচ্ছিল অধর। জটা থেকে নেমে আসা আলোক কণা দেখে মনের ভেতর কেমন উৎফুল্লতা নদী হচ্ছিল তখন। কপট অভিমান চোখে মুখে নিয়ে ঘোর লাগা কিশোরী পিঙ্গল।

 

অথচ সমস্ত সময় জুড়ে তার থেকে যাওয়া। অথচ সে কঠিন। গাম্ভীর্য ঠোঁটে এঁকে বুঁদ। তবু যার ছুঁয়ে থাকা শিহরণ জাগিয়ে তোলে সময়ে সময়ে। যার চেয়ে থাকা মুক্ত রাখে মেকি আভরণ। তাঁকে বার বার বলতে ইচ্ছে হয়… তুমি নীলকমল… তুমি স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বালাতে থাকো শুধু। তুমিই ফুটিয়ে তোলো শব্দের শরীর স্নিগ্ধ বর্ণে। কুমকুমের রংছটায় দূর করে রাখো অনুযোগ।

 

নবীন মেঘমন্ডলী নিরুদ্ধদুর্ধরস্ফুরৎ

তকুহূনিশীথিনী তমঃপ্রবন্ধবদ্ধকন্ধর

নিলিম্পনিরঝরীধরস্তনোতু কৃত্তিসিন্ধুরঃ

কলানিধানবন্ধুরঃ শ্রিয়ং জগদধুরন্ধরঃ।।

 

২.

তারা বলে স্মৃতির দলিল। আমি বলি কাচা গুটি। তারা বলে পরিষ্কার মাথা। আমি বলি, ধোঁয়ায় মাখা একটা কুঁকড়ে থাকা শিশু। আমার চোখ থাকে মাটি থেকে দু ফুট দুরত্বে তৈরি হওয়া সেই ছোট্ট ঘূর্ণিটার দিকে। যার দিকে তাক লাগিয়ে একদিন ঝড় ভেঙেছিল ফুট কাটা দাদা।

 

প্রতিটা মুহুর্তে ঠোঁটের বাঁ দিক করে যে হাসিটা ঝুলে থাকে। আমায় ওই শিশুর কথা মনে করিয়ে দেয়, বার বার, বার বার। আর জ্বর আসে তুমুল।

 

এরপর ভাবতে থাকি সহস্র মাইল দূরে থাকা এক গ্রীষ্মের কথা। একটা বলিভিয়া ট্রেন। ট্রেনের তীক্ষ্ণ শিস। পাতা বেয়ে নেমে আসা খর বাতাস। তীব্র ভাবে ইচ্ছে প্রকাশ করি, একটা চিঠি আসার কথা। ছুটির চিঠি।

 

অতঃপর তেতো হয়ে আসে মুখ।

 

৩.

মেটাফরিকাল জার্নি শুরু হয়ে যায় দু পা বেরিয়ে। প্রতিবেশীর দুঃখে কেমন কুমির হাসে। আদতে কি দুঃখ, নাকি খুশি। ভেবে ফেলি পাইনের গাছ বয়ে আনছে সমুদ্রের গন্ধ। কেমন নোনা স্বাদ। সারা বিকেল জুড়ে সেই স্বাদ জিভ জুড়ে লেগে আছে।

 

আগামীকাল বা তার পর দিন, কিংবা তারপর, লাইট হাউস জুড়ে উৎসব। একটা ম্যাজেন্টা রঙের স্বপ্ন, একটা প্রজাপতি খাঁচায় বন্দী হয়ে যায়। মন ছটফট করে। উড়ে যায়। ছিঁড়ে ফেলে অন্ধকার।

 

প্রজাপতি বৃষ্টি আনে অবেলার মেঘে। ভাবে এই বুঝি সব। এই বুঝি সরল পৃথিবী।

 

*বৈশাখী নার্গিস: কবি ও সাংবাদিক, কলকাতা। 

আরো পড়ুন: জামিল হাদীর একগুচ্ছ কবিতা

জারিফ আলমের কবিতা