বেবী সাউ এর কবিতা

মায়া-ছায়াতল

 

১.

ভাঙা মাঠ। ক্ষত ভেবে নির্জন আলোর দিকে,  দেখি…

তোমাকে ছোঁয়ার খেলা। কেটে গেছে বহু আগে তার

গোপন পথের ধারে একা সেই স্মৃতিভারানত…

নগরকীর্তন। বাঁশি! খোল করতালে কাকে চায়?

 

নীরব পাঠক যেন বহুকালব্যাপী সাধনায়—

বার বার ছুঁতে চায়! অক্ষরের কাছে হাত পাতে…

অথচ শূন্যতা। ফাঁকা। অথচ নির্মোহ নির্মাণের

বলিরেখা ভেঙে ফিরে ফিরে আসে… আমিও তোমাকে

শূন্য জেনে। মুক্ত জেনে। মায়া-ছায়াতলে

ছুঁয়ে ফেলি

বলি… ভ্রমও সত্য সই! যেভাবে জাগার আগে স্বপ্নে

লীলাখেলা আলো ভেবে তোমাকে ছুঁয়েছে মীরাবাঈ…

 

২.

হৃদয় ঘন পাথরে মুখ রাখি

জল অনেক বছরে বয়ে যায়

তোমার ঘরে বেহুলা কড়া নাড়ে

আমার খেলা গোধূলি বাগিচায়

 

রাত্রি তবে তোমার চোখে পোড়ে

প্রিয় নতুন প্রেমের কাছে কাঁদি

আমার মায়া নিও হে মহাকাল

উঠোনে কার পায়ের ছাপ আঁকা

 

তুমি কি চেন? চেন কি কেন প্রেম

এভাবে শুধু নি:স্ব করে যায়!

ঘরে কি তার বেজেছে বিঠোভেন?

মীরার কাছে কৃষ্ণনামে লেখা?

 

তুমি কি জল? তুমি কি বায়ু? মাটি?

তুমি কি সুর? আমার চেয়েও আমি?

আমায় তুমি জম্ম দিয়েছিলে?

আমায় তুমি জন্ম দেবে আরো?

 

৩.

সময় হারিয়ে ফেলি… সময় নিজেই হেরে যায়

এই ভাঙা ঘরদোর ছেড়ে, গান ছেড়ে চলে যাই

সেখানে উদাস বেলা একা একা কাঁদে। কাকে চায়?

অপেক্ষা সুদূর ভেবে ছেড়ে রাখে ফাঁকা শালপথ…

শালিখ ডানায় নড়ে  মায়ামরীচিকা। মোহ জন্ম…

রাজপথ ফিরে ফিরে দেখে। মুখ টিপে হাসে আর

বলে…চলে গেছে অশ্বারোহী, লাল মোরামের ধুলো…

কে যে তুমি! কাকে চাও! বহুজাতকের দলে দেখো

নাম লেখা হয়ে গেছে। এই লোহাবাসরের গৃহ…

সামান্য সানাই জেনে কত দিন আগে বয়ে গেছে

লবণাক্ত সুর। হাওয়া। শুধু তার সাদা সাদা দেহ

নিজেকে প্রাচীন ভেবে লোকালয়ে রূপকথা বলে…

 

৪.

হয়ত জাগে হাওয়া;

তোমার কাছে

রক্তমাখা জীবন উড়ে আসে!

কার চিঠি যে, কার কাছে যায়

অন্ধকারে

ঘুঙুর বাজে কার?

বাঘের মতো

খিদে তোমার অনিশ্চয়তার!

তবু তোমায় প্রেম জেনেছি

বুকের কাছে আগুন শুয়ে আছে

আমার গান

শোনার পরে

ওগো মাথুর ছিপ ফেলো না জলে!

অভিসারের

পায়ে যে কাঁটা

তবুও তার বাউলচোখ বুনো

জানি আমার ভিখিরি হাত

তোমার হাতে

শুধু দোলায় সাঁকো

অভিমানের প্রিয় আমার

বাঁশি বাজাও

জন্ম হোক আরো

মাখন তোকে দেব না আর

মথুরাপতি

নি:স্ব করে দেব

 

৫.

সহজ তুমিও ছিলে। শুধু আমি আঁচড়ের লোভে

নিপুণ মাকুর কাছে কতবার বলে গেছি ক্ষত

আর ক্ষমা!  বলে গেছি সমস্ত স্মৃতির দায় থেকে…

চিহ্ন থেকে একদিনও যদি ঝরে যায় অবসর

তাকেই পাথেয় করে  হেঁটে যাবে শ্রমণের ক্ষুধা, লোভ…

তাকেই বোঝাবে এই সামান্য সন্ন্যাস,  রোজ রোজ

আঘাতের প্ররোচণা পেয়ে হত্যায় শামিল করে। দেখে

জমানো প্রেমের কাছে, বাণবিদ্ধ প্রকৃত কপোত

তোমাকে সহজ ভেবে, হেঁটেছে ঊষর মরুপথে

 

৬.

ধুলোয় তুমি শুয়ে আমিও চরাচর

দেখেছি কত রাত একাকী পুড়ে গেল

রয়েছে আধো আধো শিশুর শৈশব

তুমি কি যেতে চাও? তুমি কি মায়াবন?

 

শুনেছ গান থেকে শস্য ঝরে পড়ে

আলোর কাছে লেখা কথারা খুব কাঁচা

কৃষক দূর থেকে দেখেছে চাষিবউ

এসেছে আলপথে, এও কি অভিসার?

 

তোমাকে বলিনি যে; আমিও একদিন

সমুদ্রের বুকে হারিয়ে যেতে চাই

কোথাও আর কেউ ফেরে না কখনো যে

আমিও নোনাজল, আমিও দিশাহীন

যে ডিঙি পালছেঁড়া,  যে জল শুধু ঢেউ

 

তোমাকে বলিনি তো কখনো ফিরব না!

আমরা ফিরে আসি, প্রদীপ জ্বলে ওঠে

হে মায়া তুমি রাই, হে মোহ কৃষ্ণ গো

রক্তে মিশে আছে বিরহ আমাদের

বাউল স্রোতে চলো এ দেহ ধুয়ে আসি

হোক না প্রিয় গান লজ্জা আমাদের

 

৭.

ক্রমশ নিজের কাছে ফিরি। দেখি কুমারী  প্রাচীরে

কারা রেখে গেছে আজ নক্ষত্রের কুপি। মরুঝড়

আদিগন্ত ফাঁকামাঠে বেজে ওঠে জলের সানাই

কে ওকে চিকিৎসা দেবে? কে যে দেবে মিঠা কথা, পানি!

তার পরিচিত বেলা ভেঙে নিয়ে যাবে রূপকের দেশে…

সন্ধ্যা নামে। পাখি তার বাসা জেনে, তোমার আশ্রয়ে

নিজেই নিজেকে চেনে। জেনে নেয় কাফনের রঙ

তারপর হাঁটাপথে, বাঁকাপথে ফিরে ফিরে আসে

অভিমানী। তুমি তাকে ভালোবেসে দেবে আজ মন!

 

৮.

 

মায়াকুজনের পাশে কার ইশারায়

আমাদের সব কথাগুলো পরবাসী

ইন্দ্রিয়ঘন শহরের ঘরবাড়ি

পেরিয়ে এসেছি, চলো আরো দূরে যাব

 

এ আমার কোনো রূপকথা ছিল না তো

জলের উপর লিখোনা বিষাদ তুমি

দেখেছ কি কত সাদা বুক উড়ে গেল

মেঘ পেরিয়েও মেঘ থেকে হাতছানি

 

জানি না কোথায় তোমাদের বাতি জ্বলে

আমি তো কেবল বুঝি প্রেম উদাসিনী

ধুলোয় লিখেছি সারারাত স্বরলিপি

বাঁশি কি শুনেছে?  পিছু কি ফিরেছে কেউ?

 

আহা ও পাঠক মহাকালজয়ী চোখে

সময়ের কাজ সময়ের কাছে রাখা

তুমি তো কেবল ধন্য হইতে পারো

প্রকৃতির কথা নিয়ে ঘর বেঁধোনা তো!

 

সব জল যায় গড়িয়ে জলের মতো

আমার প্রেমের কাছে আমি শুয়ে থাকি

ডাকে মহাকাল, বলে শুভানুধ্যায়ী

বাতাসেরা সব চলে গেল, তুমি একা

 

একাই তোমাকে কাছে পাওয়া যায় জানি

নিজের কাছেই নিজে আমি উপাসনা

এ পূজা গ্রহণ কর তুমি মহাকাল

হরগৌরীর হবে আজ রাতে দেখা।

 

*বেবী সাউ: কবি, ঝাড়খন্ড, ভারত। 

 

ফলো করুন: দিব্যপাঠ সাহিত্য পত্রিকা

আরও পড়ুন: শায়লা সিমি নূরের কবিতা