ফকরুল চৌধুরীর গল্প

উষ্ণদেশের দিকে শীতের দেশের বৃক্ষের অভিবাসন যাত্রা

 

তিনি ছিলেন শীতের বৃক্ষ। শীতের বৃক্ষ কুয়াশা কাঁপা ভোরে রওনা হন ছোট মেয়ের বাড়ি থেকে। ছোট মেয়ের বাড়ি শাহ্পুর। পাড়ভাঙা নদীর পাশে। নদীর ধারে আবাদে জমি। গ্রাম্য পথ শিশির ভেজা। তার চোখের কোণে শীতল ছোঁয়া, যেখানে কষ্ট জমাটবদ্ধ, গলে না, পাথর হয়। পাথরচোখে তিনি একবার ফিরে তাকান। দেখেন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে, চোখ ছল ছল। বৃক্ষের কষ্ট হয়। তিনি কি ফিরে যাবেন, মেয়ের কাছে থাকবেন আর কয়টা দিন। কিছুটা অগ্রসর হন, তারপর থমকে দাড়ান, অদৃশ্য তাড়না অনুভব করেন, অদৃশ্য হাতছানি, ডাকছে…। তিনি হাসেন, অভয়ের হাসি, সান্ত্বনার হাসি, “ফিরি যা মনু, আমি আবার আসমু, থাকমু কয়েক দিন।” তারপর তিনি ফিরতি পথ ধরেন কিংবা কেউ তাকে টানাহেঁচড়া করে চলেছে। আজ বিষ্যুদবার, কালো সিল্কের অন্ধকার। বিষ্যুদবার দিনশেষে সব পাখি ঘরে ফেরে। বিষ্যুদবার সব মানুষ আরাম খোঁজে। বিষুদবার আমরা ন্য-মার্কেট করি। বিষ্যুদবার আমরা সম্মেলন করি, বিষ্যুদবার আমাদের ছুটি। হায়, লালরং বিষ্যুদবার, সবুজ স্বপ্নের বিখ্যাদবায়, কাশফুল বিষ্যুদবার, কর্ম অবসান বিষ্যুদবার-আমার প্রিয় বিষ্যুদবার- তুমি ক্যান আইও, শোকের বিষুদবার! ক্যান হও কালো সিল্কের বিষ্যুদবার ! লঞ্চঘাটে বসেন, চা খান। দোকানির সঙ্গে হাসি তামাশা করেন।  তয় অহনে যাই, দোয়া করবা।  আমাগ দোয়া করবেন। সব সময় করি, তয় যাই। আবার আইয়েন। আল্লা বাঁচাইলে।

তিনি লঞ্চে উঠেন। যান্ত্রিক শব্দ হয়, পানি কাটার শব্দ। দূরে তালগাছ। গোলাকার বৃত্ত। মাঝখানে পুকুর। পুকুরপাড়ে হিজল গাছ। একটা চালতা গাছ। কয়েকটা আম গাছ। পুকুরে মাছ। হিজলতলায় মাছের উৎসব। আরেকটু ভেতরে খোলা উঠোন। উঠোন ঘিরে ফলের গাছ। একপাশে গোয়াল ঘর, লাগোয়া নাড়ার স্তুপ। তারপর, রান্না ঘর। অতঃপর দক্ষিণমুখি চৌ-চালা ঘর। এটা তার মেয়ের বাড়ি। মেয়ে দরজায় বসে দক্ষিণের আকাশ দেখছে। আর লঞ্চের ভেঁপু-শব্দে কেঁপে উঠছে। তিনি সে কম্পনের তরঙ্গ অনুভব করেন। তালগাছটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। স্মিত হাসেন– ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের ঘর, ঐ খানেতে বাস করে…। তিনি নদীর কাঁপন লক্ষ করেন। মেয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। বিষ্যুদবার মানুষ বাড়ি যায়। আমি বাড়ি যাই। পিতা বাড়ি যায়। হায়, বিষ্যুদবার পিতা বাড়ি। যায়। হায় , পিতা! এ কেমন তোমার বাড়ি যাওয়া! বিষ্যদবার রাত। অন্য রকম সদরঘাট। শুক্র-শনি বন্ধ। মানুষ বাড়ি যায়। অনেক মানুষ হয়। অনেক কোলাহল হয় শীতের কুয়াশা নামে, পিতা আমি বাড়ি আসছি। তার কন্যা, মনোয়ারা বেগম মনু। তীব্র শীতের রাতে পিঠা বানালো। পিতাকে সামনে রেখে খাওয়াতে তার খুব সখ। অথচ রিটায়ার্ড করার আগে পিতা আসতেনই না। এখন প্রায়ই আসেন। এতে মেয়ের খুব ফুর্তি হয়। তিনি ফজর নামাজ পড়ে কবর জিয়ারত করলেন, বেয়াইয়ের কবর। ঘরে ফিরে এসেই বললেন- যাই। ত্বরিত সামান্য নাস্তা করে তিনি চললেন।

তিনি চলছেন। তিনি এমনি করে রওনা দিলেন, যেন কারো তীব্র আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন। বড়ো আবেগী তার মেয়ে, চোখে শিশির বিন্দু জমে। বাবার কথা মনে হলেই কাঁদবে আর লঞ্চের ভেঁপু শুনবে, লঞ্চ ভেড়ার শব্দ শুনবে।তারপর কাঁদবে কিংবা হাসবে। আপাতত বিদায়ের ভেঁপু, মেয়ে কাঁদছে। তালগাছটি আস্তে আস্তে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে মুছে যায়। বৃক্ষ তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তিনি ভাসমান নৌকা দেখেন, হলুদ সকাল দেখেন। স্তুপাকৃত মানুষ দেখেন। তার চোখ ঘোলাটে শূন্যতা ভেদ করে নদীর পারে যায়। খাড়া পার। টুপটাপ করে ভেঙে পড়ছে। ফাটা মাটি, শিথিল, ভেঙ্গে পড়বে। চোখ দুটি বন্ধ করে কালো পর্দায় নিজেকে দেখতে চেষ্ট করেন- দেখেন পেছনের দীর্ঘপথ, কর্মময় জীবন, দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা, সুখের ক্ষীণধারা, নিঃসঙ্গতা, জীবনসায়াহ্নের ধূসরতা। দেখেন তার সন্তান, শিশুবৃক্ষগণ, তার বেশির ভাগই গাছ-পালায় সমৃদ্ধ, কিছু কিছু বৃক্ষ দুর্বল হলেও টিকে থাকার আশ্বাস বাঁধে করছে। এইসব বৃক্ষ নিজেদের আরো সমৃদ্ধ করতে ইচ্ছুক, কেন না কিছু কিছু বৃক্ষে ফুল ফুটালেও, ফল ধরেনি। তিনি তার বৃক্ষ মেলায় ফলের প্রত্যাশা করছেন। কিরে আমাদের বাড়ি যাবি না। পিতা তুমি এমনি করেই বলেছিলে। আর হাসছিলে, বড্ড আদর মাখা হাসি। শত দুঃখ কষ্টেও তুমি আমাদের জন্যে হাসতে। তোমার হাসিতে আমার ভয় হত, লজ্জা হত। তাই তোমার প্রত্যুত্তোর দেয়ার সামর্থ্য আমার ছিল না। যাব’। কিছুটা বিরক্ত হয়েই উত্তর করেছিলাম। যার অর্থ- যাব না।

আসলে অক্ষমজনের ভরসাস্থল হল রাগান্বিত হওয়া। আমিও অকারণে ফোঁসফোঁস করে রাগ করতাম। তবুও পিতা হাসতো, মিটিমিটি। বাড়িতে আসবি-ই বা কেন, মা-ত নেই…’ পিতার দীর্ঘশ্বাস। পিতার দীর্ঘশ্বাস আমাকে জ্বালা দিত। উত্তেজিত করত। কষ্ট দিত। তাই নীরব থাকতে চেষ্টা করতাম, পারতাম না। ঝগড়া করতাম, তারপর নিভৃতে কাঁদতাম। আশেপাশের মানুষ দেখেন। মানুষগুলোকে আপন লাগছে। সবাইকে বুকে চেপে ধরতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তিনি তা করেন না। তিনি অনুভব করছেন, সব মানুষকে আগের চেয়ে বেশি ভালো লাগছে। গতকাল তার রগচটা ছেলেটা হঠাৎ ঢাকা আসে। ছেলেটার চোখ পানিতে ছলছল। তাতে শীতবৃক্ষ শিউরে উঠেন। ছেলেটা স্বপ্নে দেখে তার দুটি দাঁত পড়ে গেছে। খাবনামা বই খুলে দেখে পরিবারের কোন মুরব্বির মৃত্যু আসন্ন। ছেলে তখন হন্তদন্ত হয়ে ঢাকা আসে। পিতাকে খুঁজে বের করে। শীতবৃক্ষ তখন একটু উষ্ণতার খোঁজে পরিজনদের দরজায় দরজায় ঘুরছিলেন, কেউ তাকে উষ্ণতা দিতে পারত না, তবুও তিনি উষ্ণতা প্রত্যাশা করতেন।

তাঁর শিশুবৃক্ষগণ তাকে আশ্রয় দেয়ার সামর্থ অর্জন করতে পারেনি, সবাই তাকে নিয়ে অস্বস্তি অনুভব করত, কৃত্রিম ব্যবহার করত, এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করত। বৃক্ষ তাঁর সন্তানদের অসহায়ত্ব কিংবা অনাগ্রহ নীরবে মেনে নিতেন, দূরে দূরে থাকতেন। কিন্তু কর্মহীন, বয়সের ভারে নির্জীব, দু’মুঠো ভাতের অনিশ্চয়তা- তাকে দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়ে ফেরাত। ঘুরতে ঘুরতে কখনো কোন শিশুবৃক্ষের বাড়িতে আসতেন। আর অসহায়ত্ব ও অপমানে বুঁদ হয়ে থাকতেন। এমন করে অনেক বাড়ির দরজা তাঁর আগমনে আতংকিত হয়ে ওঠে। কোন কোন দরজায় যেতে তিনি। সংকোচ বোধ করেন। তাই শিশুবৃক্ষের বাড়িতে এসে তিনি অপরাধীর মতো জানালাপথে। শূন্যতা দেখতেন। পিতা জানলার পাশে। হাতে সিগারেট। চোখ আকাশে। পিতা আকাশ খুব পছন্দ করতেন। আসলে আমার পিতা একজন আকাশ ছিলেন। কোন ক্ষুদ্রতাই তাঁকে বিশালত্ব থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আমার পিতা সম্ভবত সমুদ্র দেখেননি, অথচ আমি লক্ষ্য করতাম, তাঁর একচোখে প্রশান্ত মহাসাগর, যেখানে মায়ের মমতা বসত করত, আরেক চোখে আতলান্তিক মহাসাগর, যেখানে সন্তানের জন্যে অস্থিরতা তোলপাড় করত। আমি শুধু প্রশান্ত মহাসাগরে সাঁতার কেটেছি, আতলান্তিকের কথা ভাবিনি; পিতা, প্রশান্ত মহাসাগরের সব পানি বিলিয়ে গেল, আর বাড়ি ফিরল আতলাম্ভিক নিয়ে। গোপীবাগের এক পরিজনের বাসায় ছেলে তাকে আবিস্কার করে। তিনি তখন চেয়ারে বসে, টিটেবিলের উপর পা রেখে বিমর্ষ মুখাবয়বে গভীর ভাবনাকাতর। মাঝেমাঝে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছিলেন, আর টিকটিক শব্দ শুনছিলেন। একজন ছন্নছাড়া, অপাঙতেয় মানুষ, বিভাষিকাময় গর্ত থেকে বার বার উঠতে চেষ্টা করছেন কিম হাতে ধরার মত কিছু খুজে পাচ্ছিলেন না, এমনই অদ্ভুত মনোবেদনায় শীতবক্ষ চিন্তিত ছিলেন। এমন সময় ছেলে আসায়।

সামর্থ্য অনুভব করেন। ছেলের শরীরে হাত বুলান, চুলে বিনুনি কাটেন, আর কেমন রোগা হয়ে গেছিস! আব্বা আপনে ভালো আছেন তো? তুই এমনি কাঁপছিস কেন, আমি ভাল আছি। সত্যি ভালা আছেন।

আমার লগে রাগ করেন নাই তো… দূর পাগল। আমি বাড়ি যামু। সত্যি বাড়ি যাবি, কতদিন বাড়ি যাস না। পাগল ছেলে… তিনি মনে মনে ভাবেন। ছেলে কথা দিয়েছে আগামিকাল বাড়ি আসবে। তার তো উচিত হবে বাড়িতে থাকা। তা-না হলে শুন্য ঘরে ছেলে হা-হুতাশ করবে। লঞ্চ এত আতে আস্তে চলছে কেন! কুয়াশার পর্দা এত শক্ত কেন। যন্ত্রযানকে থমকে দেয়। মানবিক সম্পর্ক অনেক পোক্ত। কুয়াশা তবু দেখা যায়, মানবিক সম্পর্ক দেখা যায় না। বোঝা যায়। শত টানাপোড়েনেও মানুষ মানুষকে আকর্ষণ করে। আসলে এই পৃথিবীতে সব মানুষই ভালো। মানুষ যা কিছু ভালো করে, তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে করে, যা কিছু খারাপ করে তা অবস্থার চাপে করে। আমার বয়স্ক পিতা, আশি বছরের পিতা, তিনি ঢাকা আসতেন। আমাদের দেখতে আসতেন। আমি পিতাকে দেখতে যেতাম না। তাই পিতা আসতেন। ইদানীং পিতাকে দেখলে আমার বিরক্ত হত, পিতা থেকে পালিয়ে বেড়াতাম। আমি অনুভব করতাম, অপরাধবোধ, নিমর্মতা। একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত বিপর্যস্ত মানুষ পথ চলছে আনমনা, চলার পথ বন্ধুর, বিপদসংকুল, কোথাও গর্ত, খরস্রোতা নদী, কাঁটাঝোঁপ অথচ তিনি হাঁটছেন আর আমি দেখছি তাঁর প্রতি মুহুর্তের আহত হওয়ার দৃশ্যায়ন, রক্তাক্ত হওয়া শরীর। ভীষণ এক অসহায়ত্বের বিভ্রমে নিষ্ঠুরতা চর্চা করে চলেছি। আমার এই নিষ্ঠুরতা পিতার আকাশমনে নিষ্ঠুরতা তৈরি করত না, বরং তিনি প্রশ্রয়ের হাসি হাসতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আদর করতেন, হেসে বলতেন, কিছু কর, আমার জন্য নয়, তার জন্যে, আমি খুব খুশি হব, হাসিমুখে মরতে পারব। হায়, পিতা, তুমি কি হাসিমুখে বাড়ি ফিরেছিলে। এই যে শীতের বৃক্ষ, তার শরীর ভরে কত পাতা ছিল। রকমারী পাতা- সুখ, আনন্দ, প্রেম, মমতা, সহায়তা, সততা, অর্থ… এই সব পাতা তিনি অকাতরে বিলিয়ে দিলেন আর নিঃশেষ হতে চলেছেন অথচ কোন সুবিধাভোগীই শীতবৃক্ষ উষ্ণ করতে এল না, তার শরীরে গেঁথে দিল

কোন সবুজ পাতা। ইউনিভার্সিটির পাশ দিয়ে আমি সোনার হরিণ ধরতে গিয়েছিলাম। সোনার হরিণ মানে চাকরি। সোনার হরিন ধরতে গেলে মেধা লাগে, কৌশল লাগে। কৌশল মানে অসাধু ধর্তত। আমার মেধা ছিল, কিন্তু কৌশল ছিল না। কেননা, এ যুগের কৌশল রপ্ত করতে কুকুর হতে হয়। পিতা। আমাকে কুকুরে রূপান্তরিত হওয়ার প্রযুক্তি শেখাননি। তাই আমি সোনার হরিণ ধরতে পারছিলাম না। -বাবা, কিছু একটা কর, তোর জন্যে কর। -কি, করব? কণ্ঠে আমার বিরক্তি। -কিছুই কি করার নেই। এর কোন উত্তর ছিল না আমার কাছে। তাই চুপ করে থাকলাম। মাথা নিচু করে থাকতাম। বুক ভেঙে আসত। হাড়ভাঙা শব্দ শুনতাম। দূরে দৃষ্টিতে স্পষ্ট হচ্ছে জনপদ, ছোট্ট মফস্বল শহর। তার আবাসস্থল তাকে ডাকছে। তার বুকের মধ্যে ঢেউ হয়। তীরে এসে ধাক্কা অনুভব করেন, লঞ্চটি শেষবারের মতো গোঙিয়ে থমকে যায়। তিনি নামেন। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মানুষ। কয়েকটা বাজাইরা কুকুর এলোমেলো ঘুরছে। শীতবৃক্ষ হঠাৎ থমকে দাঁড়ান, চোখ দুটি চারদিকে ঘোরেফেরে।

অতঃপর তিনি নিঃশব্দে হাঁটতে থাকেন, হেলেদুলে, ঢেউয়ে পড়া নৌকা যেমন চলে। সূর্য তখন সোনালি রোদ ছড়াচ্ছে, আর বাতাসে বরফচূর্ণ শীতলতা, শীতবৃক্ষ চলছে তার নিবাসে। নীরব, নিস্তব্ধ বাসা। নারিকেল গাছগুলো নড়ে ওঠে, সোনালি কিরণ ঝলকে হাসে। তিনি তার কক্ষে প্রবেশ করলেন। চেয়ারে বসলেন। কতদিন পর তিনি বাড়ি ফিরলেন। খাটে সব কিছু সাজানো, শোয়ার আয়োজন, অথচ অনেকদিন কেউ শোয়নি। তার ইচ্ছা হল একটু ঘুমাবেন। বিছানাটা যেন নেচে উঠল। এক কোণায় বসলেন। চাদরে হাত বুলালেন, বালিশে হাত রাখলেন, কতদিন এখানে ঘুমাননি, তা প্রায় একমাস। মনে হচ্ছে এক মাস তিনি ঘুমাননি। কী যে তোর বাজে অভ্যাস, মশারির নিচে ঘুমাতে পারস না, রাতে স্প্রে করে ঘুমাস, ওসব স্প্রে স্বাস্থ্যের জন্যে খারাপ।” পিতাকে বিদায় দিতে আমি যখন মাঠ পর্যন্ত আসি, যাওয়ার আগে পিতা একথা বলেন, আমার সঙ্গে পিতার এই শেষ কথা। তিনি উঠে দাড়ালেন দরজায়। তারপর ভেতরে গেলেন। শয্যাশায়ী ছেলের কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। ছেলে তার গাড়ি দুর্ঘটনায় পা ভেঙে ফেলেছে। তিনি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, আর বিড় বিড় করে দোয়া পড়েন। আবার দাঁড়ান, দরজায়। পাশের ঘর থেকে মেজ ছেলের বৌ বেরিয়ে আসে। তিনি তাকে এক দৃষ্টিতে দেখতে থাকেন, কোন কথা বলেন না। তাকিয়ে থাকেন আর দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ঘুরে চেয়ারে বসেন। মেজ ছেলে তার জন্যে মুড়ি আনে। চা ছাড়া তিনি নাস্তা করতে পারেন না। প্রচণ্ড ক্ষুধা। দু’একটা মুড়ি মুখে পুরলেন, গলা বন্ধ হয়ে আসে। আর খাওয়া হল। তাকে জানানো হলো, পানি গরম করা হয়েছে, গোসল করতে আসতে পারেন। তিনি গোসলের জন্যে প্রস্তুত হলেন, আবার সিদ্ধান্ত নিলেন, না, পরে গোসল হবে।

শীতবৃক্ষ ‘আল্লাহ’ নাম করে ঘর থেকে বের হন। বুকটা চিন চিন করছে। তিনি ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সাব্যস্ত করলেন। পথে দাঁড়িয়ে পড়লেন, কী-যেন ভাবতে চেষ্টা করলেন। তিনি বাসার দিকে রওনা দেন। গেট পেরিয়ে মেজ ছেলের সঙ্গে দেখা, অত্যন্ত কুণ্ঠিত ও নতজানু হয়ে বললেন, দশটা টাকা অইব। অতঃপর তিনি দশটাকা নিয়ে আবার বের হলেন। ডাক্তার বাড়ি নেই। তিনি ফিরতি পথ ধরলেন। হাঁটছেন, একজন বিধ্বস্ত মানুষ। রাস্তায় রিক্সা চলছে, ট্যাক্সি চলছে, আর তিনি হাঁটছেন। সব কিছু সচল, আর তিনি অচল হয়ে পড়েছেন। পিতাকে বিদায় দিয়ে আমি কাঁদতে বসতাম।

একাকিত্বে কাঁদতাম। আমার এই কান্না কেউ শুনত না, পিতা শুনত। আমার চোখের জলে পিতা ভিজে যেতেন। বুঝতাম, পিতা আসছেন, আমি পিতার দূরবর্তী পদধ্বনি শুনতাম। পিতা মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, জীবনে অনেক পথ চলতে হয়। বাসায় ফিরতে ফিরতে মাথার উপর সূর্য। বিছানার মধ্যখানে বসেন। হাতপায়ের নখ কাটেন। আসার পথে সেলুন থেকে সেভ হয়ে আসেন। নখ কাটা শেষ হলে কলতলায় যান, গোসলে বসেন। শরীরময় সুচারুভাবে সাবান মাখেন, গামছা দিয়ে ঘা ঘষেন। পঙ্গু ছেলে জানলা দিকে তাকে একদৃষ্টিতে দেখছে, ছেলে যেন তাকে আগে কখনো দেখেনি।।

‘আব্বা আমার খুব ইচ্ছা করছে আপনার শরীর ধুয়ে দিতে। ‘পারবি, শীঘ্রই পারবি’, এই বলে তিনি ছেলের দিকে মিটিমিটি করে হাসলেন। গোসল শেষে তিনি ভেজা কাপড়-চোপড় রোদে দিলেন। ঘরে ঢুকে সারা শরীরে সর্ষের তেল মাখলেন। তারপর নামাজ পড়লেন। খাওয়া শেষ করলেন। কী ভেবে তিনি ঘুমানোর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ঘর থেকে বের হলেন। বিষ্যুৎবার নিয়ে বার আমরা কথনবাজি করি। কবিতার চাষ করি। ধরে সুরে বই দেখি। আমরা গোল হয়ে বসি। আর পৃথিবীর তাবৎ ভাণপুরি, সিঙ্গারা কিংবা পেঁয়াজো চিবুতে চিবুতে আমরা নানাবিধ তর্ক করি আর ধমক দেওয়ার ফাঁকে আমরা সখ পান করি। কখনো সভায় ঘূর্ণিঝড় হয়, তাতে মোদের আনন্দের দিন। বিষ্যুদবার আমরা আনন্দের সঙ্গে বসত করি। ঘর হতে বের হয়ে তিনি কতিপয় গন্তব্যে যান এবং কিছু লোকের সাথে দেখা করেন।

তান দীঘলদি নামক স্থান থেকে রিকসা করে অন্য একজনের সঙ্গে বাসায় কে পাতে তিনি কার কাছে গিয়েছিলেন কেউ জানতে পারেনি, অন্য সব কিছু অবহিত করি। ঘুরে ঘুরে বই দেখি। ভাবি। ডালপুরি, সিঙ্গারা কিং কাপে চা করি, বিষ্যুদবার আনন্দের দিন উদযাপন করি, আর চায়ের ভয়ে তাতে আনন্দ করেন। সব সায় ফেরেন। আবেগ আপ্লুত হয়ে যায়। তিনি স্থানীয় ডিগ্রি কলেজে যান। এখানে শীতবক্ষ তার কর্মময় জীবনের প্রায় পুরোটাই কাটিয়েছিলেন। শিক্ষক-কর্মচারিদের কুশল জিজ্ঞাসা করেন, হাসি-ঠাট্টা করেন। যেন অনেক পর স্বজনদের সাথে দেখা। আসলে বিপত্নীক হওয়ার পর এটী ছিল তার সংসার। তা শেষে তিনি হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ অবলম্বনহীন। তাই সংসারে এসে তিনি প্রচণ্ড আপত পড়েন।

সবাই তাকে পেয়ে আনন্দিত হয়। তিনি করিডোর দিয়ে সহজাত ধীরগতি হেলেদুলে হাঁটেন, আর ছাত্রছাত্রীদের আদর-স্নেহ বিলান। ছাত্রদের বাবা আর মায়েদের আপনি বলে সম্বোধন করেন। অতঃপর সবার কাছ থেকে বিদায় নেন এবং ফিরতি পথ ধরেন। শহীদ মিনারের কাছে থমকে দাঁড়ান, এবং কিছুক্ষণ নীরব থেকে কলেজের দিকে তাকান। উভয় পাশের মেয়েরা আনন্দের রাজ্যে লুটোপুটি খাচ্ছে। ঝাপসা চোখে তিনি তাদের ভাসমান দেখেন, যেন জলাশয়ে কিংবা বিশাল এ্যাকুরিয়ামে মনোহর মাছ সাঁতরে বেড়াচ্ছে দীর্ঘশ্বাসে তিনি ফিরে আসেন। বুকের মধ্যে বরফ শীতল কাঁপুনি, চিনচিন বঙ্গস করে তিনি চলতে থাকেন। শীতের বৃক্ষে কষ্ট জমে। আমাদের আনন্দের সময়, আমাদের উল্লাসের সময়, আমাদের যৌবন চর্চার সময়- পিতার বুকে কষ্ট জমে, কাঁটা জমে। মহানগরের উচ্ছাস উচ্ছলতার সময়, মফস্বল শহরে হঠাৎ কালো চাদর নামে। আমার পিতার মাথার উপর কালো চাদর ওড়ে। কালো চাদর কা কা করে। পিতার সাদা পাঞ্জাবি ফ্যাকাশে হতে থাকে। পথের পাশে বড় মেয়ের বাসা, দীঘল দ্বিতল দালান। কতদিন যাওয়া হয় না। নিজের তত্ত্বাবধানে এই দালান করেছেন। ঝোঁপ-ঝাড়, জঙ্গল ছিল।

জামাই বিদেশে তখন। তাই তাকেই জঙ্গল কিনে এই বাড়ি করতে হয়েছে। লোকের তখন সে কি হাসি মশকরা। লোকটা পাগল নাকি, শেয়ালের লগে বাড়ি করতে চায়। বাড়ি হয়। একে এক আশেপাশের সব শেয়ালের বাড়ি দখল করে মানুষের বাড়ি হয়। পাতাশূন্য শীতের বৃক্ষ চোখ ভরে দেখে, কত বাড়ি, কত মানুষ। বাড়ির সামনে মেয়েকে দেখতে পান, সবজিবাগান তদারক করছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্থির চোখে মেয়েকে দেখছেন। তাঁর মেয়ে হেলেন, আদরের হেলেন। হেলেনের দিকে যেতে উদ্যত হয়ে থেমে গেলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার হাঁটতে লাগলেন, আর পর্যবেক্ষণ করে চলেন দৃষ্টিসীমার মানুষ, ঘর-বাড়ি, বৃক্ষ ও পশুপাখি। ঘোরের মধ্যে পথ চলেন। বিষন্ন। তার মুখাবয়ব। যন্ত্রণার সর্বোচ্চ ভারে আক্রান্ত, অভ্যস্ত, একজন পরিব্রাজক যিনি সারাজীবন নিজের সৌন্দর্যকে বিলিয়ে অপরের সৌন্দর্য বর্ধন করেছেন। জীবন সায়াহে অস্তমিত বৃক্ষের শরীর থেকে যখন একে এক পোড় খাওয়া হলুদ পাতা ঝরে পড়েছিল তখন কেউ তার জীবনীশক্তি দীর্ঘতর করতে কসরত করেনি। দূর থেকে আবার মেয়ের বাড়ির দিকে তাকান।

বাড়িটা আয়েস করে বসে আছে। আর তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে আছে। তিনি একটু হাসেন, বৌদ্ধ ভিক্ষুর মূর্তি, হেলেনের প্রতিচ্ছবি চোখে ভাসে। হেলেন গতরাতে স্বপ্ন দেখেছে। দেখেছে দুটি খুঁটি, জীবনের খাটি একটা ঋটি খসে পড়ে। সেই থেকে তার কপালে মোটা ভাঁজ, বিষাদের রেখা। এই সব ভেবে ভেবে সে সবজিবাগান। তত্ত্বাবধান করছিল, আর সবুজে হাত বুলাচ্ছিল। সবুজে কোন পোকা কিংবা হলুদ দাগ। দেখলেই কেঁপে উঠত, আর অস্ফুট উচ্চারণ করত, আমার একটা খুঁটি নাই রে, পইরা গেছে, আমার কে জানি পইরা গেছে। নিউ মার্কেটে যখন বন্ধুর আসন্ন বিবাহ নিয়ে লুটোপুটি হচ্ছে, তখন দূরবর্তী কোথাও চলেছে পিতার সাজ-সজ্জা। তিনি কখনো নিজেকে সজ্জিত করার অবসর পাননি, আমরা কখনো তাকে সাজানোর সময় দেইনি।

তিনি সারাজীবন আমাদের সাজিয়েছেন। দুই যুগ বেশি সময় আগে যখন মা মারা যান, তারপর থেকে পিতার সমুদ্র জীবন, তারপর থেকে পিতার পথচলা। পিতা স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন ধরতে চেয়েছিলেন, স্বপ্ন তাঁর দেখা হল না, ধরা হল না। আমরা কতিপয় সন্তান পিতার স্বপ্নকে লুকিয়ে রেখেছিলাম। এই যাত্রায় সর্বশেষ তার উপস্থিতি জানা গিয়েছিল দীঘদীতে। সেখানকার পুলের গোঁড়ায় বসে তিনি চা খেয়েছিলেন। শরীরময় ছিল অবসাদ আর পরিশ্রান্তের কষ্ট। একটু পর পর দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন। আর শূন্য দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন চারদিকে। সবখানে বিদায়ের সুর। তার দৃষ্টি অদূরে গোরস্থানে স্থিত হয়। পিচ ঢালা রাস্তার সংলগ্ন জমি থেকে উঁচু সবুজে ভরা স্থানটি। হলুদ সরিষার ক্ষেত এসে স্পর্শ করছে। দক্ষিণে বাঁধানো পুকুর। অনেকক্ষণ তিনি স্থানটি লক্ষ। করেন। তার এই রূপ বোধ হয় যে চারদিকে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে গোরস্থান। দোকানদারের কথায় তার ঘোর ভাঙে। -চাচা, কী ভাবছেন? -গোরস্থান খুব সুন্দর, যেন ফুলের বাগিচা। -কি যে কন চাচা, ঐখানে ভূত থায়ে। -ভূত থাকে… তিনি হাসেন, অথচ সবাইকে যাইতে অয়। -মরণের কথা কইয়েন না চাচা, মরণেরে ডর লাগে। -মরণেরে ডর লাগা ভালা, বুঝলা… তিনি দোকানদারের চোখে চোখ রাখেন। -বুঝবার চাই না, তয়… -তয় কি?

-মরবার লাগছেন নাকি। তিনি তখন লোকটার দিকে অপলক তাকান, তারপর দীর্ঘশ্বাস, অতঃপর গোরস্থানের দিকে, তারপর আকাশের দিকে, সূর্য বিপর্যস্ত, হেলে পড়ছে। আমাদের বাড়ি যাবি নারে -ভেসে ওঠে পিতার স্বর। প্রতিবার বিদায় নেবার আগে পিতা বলতেন। বলতাম -যাব। অথচ আমি জানতাম আমি যাব না, পিতা জানত আমি যাব না।

তবুও আমরা কথার লুকোচুরি খেলতাম। পিতার সঙ্গে কর্কশ কথা বলতাম, রূঢ় হতাম। পিতা নীরবে থাকতেন। এই নীরবতা ছিল অসহ্য, ধ্বংসাত্মক। অনুভব করতাম ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছি। যাওয়ার আগে পিতা বলতেন- বাবা যাই, সাবধানে থাকিস, নিজের প্রতি লক্ষ রাখিস। রিক্সার টুং টাং শব্দে তিনি সচকিত হন। দেখেন রিক্সায় বসে আছে তার সঙ্গে মশকরা সম্পর্কের একজন তরুণ বন্ধু। -দাদা একলা বইসা আছেন যে। -এক সময় তো মানুষকে একলাই থাকতে অয়। -একলা না, দোকলা থাকতে হয়, রিক্সায় ওঠেন। লোকটা হাসে। তিনি নিচুপ থাকেন। -দাদা আমার জন্যে কি করলেন। -কী করমু। -আরে আমারে বিয়া করাইবেন না, মাইয়া দেহেন। তিনি হাসেন। বলেন –তোর লগে আমার বিয়া অইব রে। বুইড়া কয় কি!

তিনি রহস্যময় হাসেন। এবং বলেন- ‘তুই আমারে বর সাজায়ে দিস। পাশ করা ডাক্তার না পেয়ে ছোট ছেলে তাকে এক হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। স্বঘোষিত, ডিগ্রি নাই ডাক্তার হলেও লোকটা অভিজ্ঞ। ডাক্তার নাড়ি দেখেন। অভিজ্ঞ ডাক্তারের কপালে মোটা ভাঁজ। পূর্বের ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র দেখতে চান। আর বলেন –ওনারে একজন ভালা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ব্যাপারটা জটিল। শীতের বৃক্ষ পকেট হাতড়ে চলেন, আর অনুভব করেন তার নিষ্ফল অনুসন্ধান, সব যেন তার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তার বুকে তীব্র। ব্যথা; তিনি চিৎকার করেন, বুক থেকে কি যেন বের হয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু পারছে না।

চারদিকে শব্দ ক্রমশ লীন হয়ে আসছে, চলমান যান থেমে যাচ্ছে, সচিত্র দৃশ্য মলিন হয়ে চলেছে। আজ বিষ্যুদবার। আমি বাড়ি যাই, পিতা বাড়ি যায়। পিতার বাড়ি এখন আর আমার বাড়ি নয়। আমার বাড়ি এখন আর পিতার বাড়ি নয়। আস্তে আস্তে শীতের বৃক্ষের অবশিষ্ট পাতা ঝরে পড়তে থাকে, পত্রহীন নতজানু বৃক্ষ প্রাচীন শরীর নিয়ে ছোট ছেলের বুকে আছড়ে পড়ে। ছোট ছেলে তখন এক স্ট্যাচু, স্ট্যাচুর চোখ থেকে পড়ে টপ টপ নোনাজল। এমনি করে আরো অনেক স্ট্যাচু হয়, চোখে শুধু নোনাজল। বিষ্যুদবার পিতা বাড়ি যান। পিতাকে মিষ্টান্ন ভেবে পিঁপড়া তাকে কুড়ে কুড়ে খায়। অথচ পিতা জানল না, এই পিপড়া আমি, এই পিপড়া আমরা। অনেক অসহায় জীবন্ত চোখ থেকে নোনাজল বৃষ্টি পড়ে আর এক বিগতপ্রাণ অসহায় গতরে। সবাই লক্ষ করে বিগতপ্রাণ শীতবৃক্ষের চোখে উষ্ণ আবেশ, সুখযাত্রার সম্মোহন।

 

আরো পড়ুন: পলাশ মজুমদারের গল্প

ফলো করুন: গুগল নিউজে দিব্যপাঠ