এনামূল হক পলাশের কিশোর কবিতার ভুবন: বিপ্রতীপ মোস্তাক

শুভ জন্মবার্ষিক কবি এনামূল হক পলাশ । সময়ের একজন প্রতিভাভান কবি। যশ-খ্যাতির পিছু না ছুটে নিজের কাজটা করে যাচ্ছেন অত্যন্ত সাবলীলভাবে। যদিও কবিদের জীবনে ‘দায়িত্বহীন’ বা ‘দায়িত্বছাড়া’ উপমা গুলো খুব করে সেঁটে থাকে। কিন্তু কবি এখানে দায়িত্বশীল কবিতাকে তিনি যেনো গ্রহণ করেছেন দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে! হোক সময়ের কাছে, হোক সমাজ-রাষ্ট্রের কাছে কিংবা হোক নিজেই নিজের কাছে বা সাহিত্যের কাছে তিনি প্রতিশ্রুতিশীল। তাঁর কাব্যগ্রন্থ গুলোর শিরোনাম এবং সেগুলো পাঠ করে যার বাস্তব প্রমাণ আমরা দেখতে পাই। যেমন, অস্তিত্বের জন্য চাই যুদ্ধ, জীবন এক মায়াবী ভ্রমণ, অন্ধ সময়ের ডানা, পাপের শহর, তামাশা বাতাসে পৃথিবী প্রভৃতি।

সেই সাথে তিনি প্রতিশ্রুতিশীল আগামীর কাছে, আমাদের উত্তরাধিকার বা প্রজন্মের কাছে।

আর সেই প্রতিশ্রুতি থেকেই তিনি অধ্যাবসায়ে বসলেন শিশু-কিশোরদের জন্য কবিতা রচনায়। আমাদের হয়তো জানা আছে, শিশু-কিশোরদের জন্য সাহিত্য রচনা চারটেখানি কথা নয়। কিন্তু অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই অধ্যাবসায় তিনি সফল। আর সেই সফলতার ফল ‘কলমি লতার ফুল’। যদিও শিশু-কিশোরদের জন্য এটা তাঁর প্রথম কাজ নয়। তাঁর প্রথম কাজ ‘বইয়ের পাতায় ফুলঝুরি’। উভয় গ্রন্থই কবি সহজ-সাধারণ, সাবলীল ভাষায় শিশুদের জন্য অনুধাবন যোগ্য করে রচনা করে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। এবং সেসব বিষয়কে কেন্দ্র করে গ্রন্থগুলো সাজিয়েছেন যা শিশুদের প্রাথমিক পাঠকে বিকশিত করে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় পরিণতের দিকে। তাঁর চর্চিত বিষয় গুলো হলো, ফুল, পাখি, কীট-পতঙ্গ, গাঁও-গেরাম, প্রকৃতি, খেলাধুলা প্রভৃতি। আর এসবের সাথে কাব্যিক পরিচয় করিয়ে দিতে দিতে কবি ধীরে ধীরে শিশুদের মননকে নিয়ে গেছেন পরিণতের দিকে।

দুটো গ্রন্থই পড়েছি। কিন্তু আজকের সংক্ষিপ্ত আলোচনায় ‘কলমি লতার ফুল’ গ্রন্থ ভ্রমণে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেষ্টা করবো!

কলমি লতার ফুল গ্রন্থটি তিনি সাজিয়েছেন মোট তেরোটি কবিতায়। গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘দিনকাল’। দিনকাল কবিতায় কবি শিশুদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ধান, চাল, ভাত, বিল-মাছের সাথে। যেমন তিনি লিখলেন,

“ধান হতে চাল হয়

চাল হতে ভাত,

বিল থেকে মাছ আসে

খাই ভরে পাত।”

শুধু তাই নয়; ছড়ায় ছন্দে কবি পানকৌড়ি, ভিমরুল, জামরুল এর সাথে কোমলমতী শিশুদের পরিচয় করিয়ে দিতে দিতে এঁকেছেন ‘গাঁয়ের ছবি’, ‘বরই কুড়ানো’ মুহূর্তকে বেঁধেছেন বর্ণমালার ছন্দে।

 

কবির সাথে কথা বলার ফাঁকে জানতে পারি, আমাদের জানা অজানা ফুল, পাখি, পতঙ্গ, প্রকৃতির বিভিন্ন সুন্দরের সাথে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেয়াকে ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। আর শিশুদের নিয়ে কাজ করার উদ্দেশ্য নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিশুরা জ্ঞানের আলোয় বিকশিত হোক এটাই চাই। তাদের জানানোর দায়িত্ব আমাদের। তারা সত্য, সুন্দরকে গ্রহণ করে প্রকৃত জ্ঞানের পথে এগিয়ে যাক: তাদের হাতেই আগামীর নেতৃত্ব, আমাদের ভবিষ্যত।

বিপ্রতীপ মোস্তাক Photo-facebook 

কবির কথায় বোঝা যায় তিনি আগামীর ভবিষ্যত নিয়ে খুব ভাবেন। আর সেই ভাবনার বিকাশ লাভ করে তাঁর গ্রন্থে। কলমি লতার ফুল শিশুদের জন্য একটি সহজ পাঠ। খুব সহজেই অনুধানবযোগ্য। আর এই সহজসাধ্যের মধ্যেই তিনি দিয়েছেন কিছুটা গভীরতার বার্তা। হঠাত বৃষ্টির মতো না, তিনি ধীরে ধীরে সেই গভীরতার পথে নিয়ে গেছেন কলমি লতার পাঠ। গ্রন্থের শেষ তিনটি কবিতায় তিনি সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন।

পরীক্ষা নিয়ে ভীতি কার না থাকে? এই ভীতি নিয়ে আমরা কতো হাস্যরসও করে থাকি। আর সেখানে শিশুদের পরীক্ষা ভীতি খুব স্বাভাবিক।

“কাল সকালে পরীক্ষা

আজ রাতে নাই ঘুম,

ভালো ফল না হলেই

বকুনি খাবো ধুম।” ‘পরীক্ষা’ কবিতাটি শুরু এভাবে। পরবর্তী চার লাইনে পরীক্ষার্থীর চেয়ে যে পরীক্ষার্থীর মা-বাবা বেশি টেনশনে থাকেন সেটা বলা হয়েছে। জিপিএ আগমনের পর থেকে পরীক্ষার্থীর মা-বাবারা সেই টেনশন অবশ্য বহুগুণ বেড়ে গেছে! উক্ত কবিতাতেই শিশুমনের প্রত্যাশা,

“স্কুলে যাব মানুষ হব

এমন স্কুল পাব কই?

পরীক্ষা নাই শিখব শুধু

সাথে করব হইচই।”

আর ঠিক এই কবিতার মধ্য দিয়ে কবি একটা গভীর বা পরিণত ভাষার দিকে এগিয়ে গেছেন। ‘জানতে হবে’ কবিতায় যার পূর্ণ ছাপ দেখতে পাই। জানতে হবে কবিতায় কবি আমাদের ত্যাগী, বীর বাংলা মায়ের সন্তানদের কথা তুলে এনেছেন।  বিনয়, বাদল, দীনেশ, প্রীতিলতা। আসাদ, ফিরোজ, জাহাঙ্গীরদের বীরত্বের কথা তুলে ধরে অচল দৃষ্টিভঙ্গিতে নিমিজ্জিত জঙ্গিদের কথাও তুলে ধরেছেন। আর এই পাঠ হঠাত করে বা গ্রন্থের শুরুতে চাপিয়ে দেয়া মানে হতো ক্লাস ওয়ানের বাচ্চার কাঁধে যেমন ডজন ডজন বই চাপিয়ে দেয়া হয় তার নামান্তর। কিন্তু কবি এখানে প্রাজ্ঞের পরিচয় দিয়ে কাব্যিক গভীরতার ছাপ উপযুক্ত সময়ে এবং স্থানেই তুলে ধরেছেন।

বর্তমান বা সাম্প্রতিক বিষয়কে কোনো লেখকই এড়িয়ে যেতে পারেন না। মূলত বর্তমানই লেখার মূল উপাদনের ভূমিকা রাখে। কলমি লতার ফুল গ্রন্থে কবি এনামূল হক পলাশও তা ধরে রেখেছেন। গ্রন্থের শেষ কবিতা ‘ভাইরাস’। যদিও এতে সরাসরি কোভিড নাইন্টিন ভাইরাসের কথা উল্লেখ নাই। তবুও সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও আলোচ্য বিষয় এই ভাইরাস। কবি সরাসরি কোভিড নাইন্টিন ভাইরাস নিয়ে না লিখে তিনি শিশুদের ভাইরাস কী, এর ফলে আমাদের কী হতে পারে এবং এর থেকে বাঁচার উপায়।

কবিতা রচনায় এই গ্রন্থকে আমি সার্থক একটি গ্রন্থ বলেই মনে করি। কিন্তু প্রকৃত সার্থকতা আসবে, তা যখন যাদের উদ্দেশ্য করে লেখা তাদের হাতে পৌছোবে, তারা পাঠ করবে, জানবে এবং কবির যে উদ্দেশ্য সেই উদ্দেশ্যের পথে হেঁটে যাবে। আর কবি সম্পর্কে বলতে গেলে তাঁকে যতটুকু চিনেছি, জেনেছি ও দেখেছি তাতে তিনি যেনো একজন শিশুই! শিশুদের মতো তাঁর মিষ্টি হাসি, মানুষকে আপন করে নেয়ার অসামান্য ক্ষমতা, বিনয়ী আর বন্ধুত্বপূর্ণ একজন সহজ মানুষ।

 

শিশুদের নিয়ে তাঁর আরও কাজ করার ইচ্ছে আছে। প্রার্থনা করি, সেসব কাজ কবির জন্য সহজ হয়ে আগামীর পাথেয় হয়ে থাকুক।

 

আরো পড়ুন- পলিয়ার ওয়াহিদের কবিতা