একগুচ্ছ কবিতা: আনিসুর রহমান অপু

দেয়াল

 

যদিও হাত-বাড়ানো দূরত্বেই সেই তুমি,

স্নান শেষের স্নিগ্ধ-সৌন্দর্য !

হাসি, চুল, চোখ–চিবুকের বিমুগ্ধ সুডৌল ,

ভাঁজ-খাঁজ, নাভী-নদী–স্তনের সোনালি শিহরণ,

ঝিনুক খোলস ফুঁড়ে মুখোমুখি যেন আফ্রোদিতি!

প্রযুক্তি ডানায় চেপে চাঁদের পরিভ্রমণ–

স্ক্রিনের সবটা জুড়ে দেবীর মহিমা।

 

অথচ কাঁচের দেয়ালেরা দেখো কী হিংসুটে,

শুধু শুধু স্বচ্ছতার ভান–

জ্বলন্ত ঈর্ষায় আমাদের মাঝখানে গড়ে তোলে দুর্ভেদ্য প্রাচীর–

যে-তুমি প্রমিত প্রেম, উজাড় উদার ভালোবাসা;

যার উচ্চারণ টুপটাপ শিউলি ঝরার শব্দসমাহার–

কবিতার উদ্যমী উপমা ,

সেখানে আহ্লাদে গেঁথে দেয় স্যাঁতসেতে সীমান্তের কাঁটাতার ;

যেন থাকি দুজনেই বরাবর বিষণ্ণ মেরুতে !

উদগ্র আগুনে পুড়ে, যতোই বাড়াই হাত

কিছুতেই দিচ্ছে না, সে পাষাণ তোমাকে ছুঁতে–

 

 

 

অ-দিনের অন্ধকারে

 

সে-ছিল দুঃসহ খরাদগ্ধ দিন, নিরন্ন-সঙ্গীন—

সঙ্গ্য ছেড়ে যায় যেথা নিজের-ই ছায়া— মায়া-প্রীতি

নিংড়ে সেখানে স্বজন ভেঙেছে বিপন্নতার রীতি ,

তীব্র মন্বন্তরে দিয়েছে উদার হৃদয়ের ঋণ ।

 

খুলতে চেয়েছে যে বন্ধুর পথের দুয়ার, পাশে

থেকে সদা, প্রতি হার-জিতে দিয়েছে সাধ্যের কাঁধ;

ঢেলেছে শুদ্ধতা আর অন্তরের জোছনা অবাধ ,

সূর্যের শুভকামনা যেভাবে ছড়ায় ফুলে-ঘাসে ।

 

নশ্বর জীবনে এই লেখে কেউ, প্রিয় পরিভাষা-

শব্দে-বাক্যে প্রেরণা বোঝাই, নক্ষত্রের চিঠি,

ভাইয়ের অধিক যে ভাই, বেড়ে ওঠা পিঠাপিঠি,

রেখে যায় নরম পলির প্রণোদনা, স্বপ্ন-আশা !

 

অ-দিনের অন্ধকারে যে আমার ধরেছিল হাত,

তার জন্য অনিঃশেষ ভালোবাসা, পুষি দিনরাত ।

 

 

 

শব্দের শরীকানা

 

হ্যাঁ, সযত্ন এই শব্দের শরীকানাই আমার, যেখানে খুঁজি

উদার উপমা, অন্তরঙ্গ অনুপ্রাস, সুখ-দুঃখ, বিষাদের অন্ত্যমিল;

শব্দের কাছেই জমা রাখি যাপিত যন্ত্রণা, কালশিটে কষ্ট-

যারা জানে লাল-নীল অনুভব, অনুরাগ, আনন্দ মিছিল ।

 

 

নিভৃত ভূগোল

 

সে তোমার নিভৃত ভূগোল; গ্রহপথে বেড়ে ওঠা

নিয়ত নিয়ম আর প্রতিকূলতায় পরিযায়ী

ডানার প্রয়াস। বিপরীত স্রোতে আর কুয়াশায়

যেন এক করুণ সাঁতারু–সময় তোমাকে নিয়ে

খেলে; গন্তব্যবিহীন গল্পের উজানে, শুধু ছোটা

যখন নিয়তি–লাভ-ক্ষতি বুঝে–প্রথা অনুযায়ী

তুমি তো চালনি চাল। ধু ধু বেশামাল দরিয়ায়

 

বড় একা, বোঝেনি সেভাবে কেউ–পানা-ঢেউ সাথী

করে অবিরাম বয়ে-ক্ষয়ে যাও–নিঃসঙ্গ সুহৃদ,

মৃত ভ্রুণে, কি আশায় হরপ্পার আশাবাদ বুনে

যাও! নিজেকে পোড়াও নিশিদিন ! ইনিয়ে বিনিয়ে

শুনিয়েছে সুবোধ কাহিনী যারা,তারা আজ ছাতি

বরাবর ছোঁড়ে শেল, ছুরি খেল জানে শল্যবিদ;

জানো তুমি ,আপোষের এই বাঁচা কতটা আগুনে !

 

 

সন্ধ্যে পাখি ফিরবে ঘরে 

 

দোলনচাঁপা, দোলনচাঁপা, কোথায় ছিল ভুল ?

কার দোষে কে নিঃস্ব মরু, নদী হারায় কূল –

 

স্বপ্নগুলো ল্যাসোর ফাঁসে, তারকাঁটাতে দিন

ঘরে-বাইরে নিঃস্ব একা , উপায়ান্তহীন –

বাজেয়াপ্ত দূর আগামী, দিয়েছে ছেঁটে ডানা ,

ক্রাচ নিয়েও হাঁটতে যেতে, জুজুবুড়ির মানা ।

 

সব খোয়ানো জুয়াড়ি সেজে , দেখছি চোখে ধু ধু

মানুষ নামে ফানুস ঘেটে, মিলেছে ধোঁকা শুধু ।

লাল-গোলাপী অনুভবের, আহা কী পরিণতি –

ক’জন বোঝে বুকের ব্যথা, কোথা ক্ষরণ-ক্ষতি !

 

বলা তো যায় বহু কথাই, তবু নীরব থাকি ,

উপর দিকে ছুঁড়লে থু থু , পড়বে মুখে— না কি ?

ঘোর বিপাকে পাশে ছিলাম— এই কি প্রতিদান !

কোন নিয়মে লেখে মানুষ, স্মৃতি সংবিধান ?

 

আপনই তো, আপন সবে, ভেঙেছে যারা ঘর

এমনতর আপন থেকে, ভালো মরুর ঝড় ।

লুকিয়ে ছুরি ছল চাতুরি, সুযোগ মতো গাঁথে

ফুলের ঝুড়ি বাড়িয়ে দিয়ে, থাকছি তবু সাথে !

 

গাঁথে আমূল বিষের ছুরি, ট্যাটাবিদ্ধ বুক-

সারাবে কারা অতি লোভের, তাঁতীদের অসুখ !

বদ্ধ ঘরে প্রহর গুনি, কখন হবে ছুটি –

মিটিয়ে সব, পাওনা-দেনা, রোদেলা খুনসুটি !

সাঙ্গ্য হবে ভুলের খেলা, তছনছিয়া গান-

সন্ধ্যেপাখি ফিরবে ঘরে , ঘুচিয়ে পিছুটান ।

 

আনিসুর রহমান অপু:  নিউ ইয়র্ক প্রবাসী কবি। 

আরো পড়ুন: বদরুজ্জামান আলমগীরের কবিতা