সাঈদ কামালের একগুচ্ছ অনুগল্প

মন

মনটা ভেঙে গেছে অনেক কারণে। কোন উপায় না দেখে ভালো একটা মনের নিমিত্তে বের হই। পিঁয়াজের দামের মত মনের দাম তো আর বাড়েনি যে কিনতে ব্যর্থ হব।
সকাল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, তাই ছাতা নিই। ইদানীং আকাশের কান্না বিশ্রী রকমের অসহ্য লাগে। ওর কোন সময় নাই। যখন তখন আসে।

গাছের নিচে দাঁড়ানো এক বুড়ো আমাকে ডাকলো। তার শরীর ভেজা, শুভ্র দাঁড়ি বেয়ে জল পড়ছে; স্থির গলায় বললেন,- ‘কই যান, বাবা?’ আমি জবাব দিই,- ‘মনটা ভেঙে গেছে, নতুন মন কিনতে বের হয়েছি।’
বুড়ো হেসে বললো,- ‘বুড়ো মন হলে হবে?’ আমি বলি,- ‘না চাচা, আমার একটা সতেজ মন লাগবে।’

বুড়োর মুখের ভাব আশ্বিনের মেঘলা আকাশের মতো হয়ে যায়, চুল থেকে বৃষ্টির পানি মুছতে মুছতে বলে,- ‘বাবা কম টাকায় দিয়ে দেবো। নিয়ে যান।’ আমি বলি, -‘না চাচা, বুড়োতো হইনি যে বুড়ো মন নিবো, বরং আপনি বুড়ো কাউকে খুঁজুন।’
আর বাক্য খরচা না করে দ্রুত হাঁটা শুরু করি। পঞ্চানন্দপুর ব্রিজের কাছে এসে দেখি এক তরুণী ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই কথা বলতে শুর করে, বলে- ‘মনটা খুব খারাপ।’জানতে চাইলাম,- ‘কেনো?’ মেয়েটি বললো,- ‘একজনকে ভালোবাসতাম, কিন্তু জানতাম না ওর মনটা নষ্ট।’

খারাপ, নষ্ট, ভাঙা, বুড়ো মন ছাড়া জগতে কি আর মন নেই? কচি লাউ পাতার মতো তরতাজা মনের কি খুব অভাব? নিজেকে প্রশ্ন করি। মেয়েটিকে বললাম, আপনার উনাকে মন পাল্টাতে বলুন। নষ্ট মন বেচে ভালো মন কিনতে বলুন।’মেয়েটি ফ্যালফ্যাল দৃষ্টে তাকিয়ে বললো,- ‘আপনি মন বেচেন নাকি?’ আমি ঈষৎ বিরক্ত ভাব নিয়ে বলি,- ‘আমি মন কিনতে বের হয়েছি, নিজেরটাই ভেঙে গেছে।’

দ্রুত হাঁটা শুরু করি। স্কুলের বারান্দায় ঝুড়িতে মন নিয়ে এক লোক বসে আছে। বললো,- ‘ভাই মন নিবেন? হলুদ, শাদা, লাল, মন আছে, নিবেন?’ আমি ছাতা বন্ধ করে বারান্দায় দাঁড়াই, বলি,- ‘শাদা মন কতো করে?’ সে বলে,- ‘দামাদামি না করলে পনেরো টাকা।’আমি ঝুড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি মনগুলো হাঁসের বাচ্চার মতো বসে আছে। বললাম,- ‘বৃষ্টির দিনে মন তো সস্তা থাকার কথা। আজকাল মন কিনে আর কজনে!

আমি পাঁচটা শাদা মন নেবো, দশ টাকা করে হলে দ্যান।’সে মাথা নাড়িয়ে বলে,- ‘তের টাকা করে কিনে এনেছি, পাঁচটা মন বেচলে দশ টাকা লাভ হবে। এর মধ্যে গাড়ী ভাড়া আছে। কম পারব না।’আমি ছাতা মেলে যখন সামনে
এগোচ্ছি, সে বললো,- ‘নিয়ে যান ভাই, লস হলে আমারই হোক।’

সে কালো পলিথিন ব্যাগে পাঁচটা মন দেয়। বাসায় এসে ভাঙা মন পাল্টাতে গিয়ে দেখি, নতুন কিনে আনা মনটা নষ্ট। ওঠা ফেলে দিয়ে দ্বিতীয় মন লাগাই, দেখি ওঠা হতাশাগ্রস্থ। তৃতীয় মন লাগিয়ে দেখি, ওঠা বেশ পুরানো, বহু আঘাতপ্রাপ্ত। চতুর্থ মন লাগাই, ওঠা লোভী মন এবং পঞ্চমটা হিংসুক মন। জানালা দিয়ে মনগুলো ছুঁড়ে ফেলি,পঞ্চাশ টাকার জন্য কষ্ট হয়। আমি পুনরায় আমার ভাঙা মন লাগাই।

ঘুম

আলামতারা পুকুর পাড় দিয়ে যাওয়ার সময়ে খাঁচা মাথায় দাঁড়িয়ে এক লোককে দেখে মজনু দাঁড়ালো।
‘ঘুম নিবেন?’- মাথা থেকে খাঁচা নামাতে নামাতে লোকটি বললো।

মনে মনে মজনু ভাবলো, আজকাল তাহলে পুকুর পাড়ে ঘুমও বিক্রি হয়, জিজ্ঞেস করে – ‘কতো করে?’ লোকটা খাঁচা মাটিতে রেখে বললো,- ‘এক কেজি বারো টাকা।’খাঁচার দিকে তাকিয়ে দ্যাখলো সে চুলের মতো কালো কালো ঘুম। বললো,- ‘দশ টাকা হলে এক কেজি দ্যান।’লোকটা কি যেন ভেবে বললো,- ‘‘১১টাকা দিয়েন। ১০টাকা আমার কেনা। কেজিতে এক টাকা লাভ হবে।’
কালো পলিথিন ব্যাগে ভরে সে এক কেজি ঘুম দেয়। সেদিন রাতে স্বপ্নের মতো কি যে নিদারুণ ঘুম হলো মজনুর। ঘুম ভাঙলো এগারোটা পঁচিশ মিনিটে।

পরদিন ঘুমঅলাকে খুঁজলো। পুকুর পাড়ে, রাস্তায়, দোকানে দোকানে, কিন্তু কোথাও পেলো না। তারপর ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। ঘুমঅলা যদি আসে এই আশায়। ঘুমঅলা আর এলো না। কাউকে জিজ্ঞেস করলো,-‘ঘুমঅলাকে দ্যাখেছেন?’ সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

মজনু বলে, – ‘লোকাটা শাদা জামা পরে, কাঁধে লাল গামছা থাকে, মাথায় খাঁচা। মজনুর কথা শুনে লোকটা আর দাঁড়ায় না। মজনু অন্য একজনকে জিজ্ঞেস করে,- ‘কাল যে এখানে ঘুম বেচেছিল, লোকটাকে চিনেন?’ লোকটা খানিক হেসে বলে,-‘ভাই, বাসায় যায়া ঘুম দ্যান।’

খানিক হেঁটে বাসায় যাওয়ার পথে এক তরুণীকে রিকশা থেকে নামতে দেখে মজনু জিজ্ঞেস করে,- ‘আপনি ঘুমঅলাকে চিনেন?’
তরুণী হাসে। অদ্ভুত রকম তাকিয়ে রিকশাঅলার দিকে তাকিয়ে বলে,- ‘চেহারা পোশাকতো ভালোই মনে হয় কিন্তু মাথা নষ্ট হয়া গ্যালো।’
মজনু আর দাঁড়ায় না এখানে। অন্যদিকে যায়। ঘুমঅলাকে খোঁজে।

 

চেঞ্জিং

এনামুল গত কাল অনেক পছন্দ করে মায়ের জন্য একটা শাড়ী কিনেছিল। হলুদ রঙের মধ্যে নীল ফুল আঁকা শাড়ী আঁচল সবুজ রঙের। কিন্তু দুপুরেই শাড়ী পাল্টিয়ে নিতে আসে। দোকানে অনেক ভিড়। এনামুল দোকানের এক পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বলে,- ‘ভাই, শাড়ীটা পাল্টিয়ে নিতে হবে।’
‘কেনো?’- দোকানি জিজ্ঞেস করে।
এনামুল কথা বলে না।
-‘কোথাও ছেঁড়া আছে?’ রঙ পছন্দ হয়নি?’
এনামুল মাথা নেড়ে না করে।
‘তবে পাল্টাবেন কেনো?’-দোকানি বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে।
এনামুল ম্লান গলায় বলে,- ‘মায়ের পছন্দ শাদা রঙের। একটা শাদা রঙের শাড়ী দেন।’
‘শুধু শাদা রঙের তো শাড়ী নাই।’-দোকানি এনামুলের দিকে আড়দৃষ্টে চেয়ে থাকে।
‘ওই যে ওখান থেকে দেন।’এনামুল হাত উঁচু করে দেখায়। দোকানি অন্য এক কাস্টমারকে বিদায় করে, টাকা গুণে ক্যাশে রাখে।
-‘ভাই, ওখানে তো শাড়ী নাই, মজা করেন নাকি?
এনামুল মাথা নেড়ে আবারো হাত উঁচু করে নিচের তাক দেখিয়ে বলে,- ‘ওখান থেকে দেন।’
‘এগুলো তো কাফনের কাপড়। ঈদে এই কাপড় নিবেন?’
প্রায় দুঃখী গলায় এনামুল বলে,- ‘হ, মা রঙিন কাপড় পছন্দ করেননি,শাদা কাপড় পছন্দ করেছেন।’
দোকানি অল্পসময় এনামুলের দিকে তাকায়। নিদারুণ দুঃখী মুখ অথচ সকালেই এই মুখটা কতো হেসেছিল।
-‘ভাই, বুঝতে পারছি, একটা কাপড়ই তো পাল্টিয়ে নিবেন, নেন। এদিকে এসে বসুন।’
এনামুল ধীর পায়ে হেঁটে দোকানির পাশে বসে। শাদা রঙের ভালো কাপড়ের শাড়ী পছন্দ করে।

জেলে ও জঙ্গল

বহুদিন আগের কথা। এক জঙ্গলে বাস করতো জেলে দম্পত্তি। জেলের ছিল ছয় সন্তান। চার মেয়ে দুই ছেলে। জেলে সারা রাত মাছ ধরে সকালে হাটে নিয়ে বিক্রি করে চাল ডাল কিনতো। একদিন রাতে মাছ ধরে ফেরার সময়ে জেলে দেখে তার সবচেয়ে ছোট মেয়েটিকে নেকড়ে ধরে নিয়ে যায়। জেলে চিৎকার করে না, প্রতিবাদ করে না, সামনে এগিয়ে আসে না। ঘরে ফিরে স্ত্রীকে বলে, -‘কান্না করে লাভ নাই, এখন থেকে সাবধানে থাকবা।’
স্ত্রী কান্না থামায় না। আপন স্বরে কাঁদতে থাকে।
সকালে জেলে হাটে যায়। মাছ বেচে। তরকারি ডাল আলু কিনে। স্ত্রী রান্না করে, জেলে সন্তানদের নিয়ে দুঃখমাখা হৃদয় নিয়ে খেতে বসে।

পরের রাতে মাছ ধরে ফেরার সময় জেলে দেখে ছোট ছেলেকে নেকড়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। জেলে এবারো কথা বলে না, চিৎকার করে না, সামনে এগোয় না। নিজের প্রাণে বড় মায়া তার। তাছাড়া আরোও সন্তান আছে, স্ত্রী আছে, এখন প্রাণ দিলে ওদের দেখার কেউ থাকবে না।
স্ত্রীকে সান্তনা দেয়। নিয়তি, যা হয়েছে তা। কান্না করার কিছু নাই। আল্লাহর জিনিশ আল্লাহ নিয়া গেছেন কিছু করার নাই। স্ত্রী কান্না থামায় না। ডুকরিয়ে কাঁদে।
পরের দিন জেলে হাটে যায়, মাছ বেচে চাল ডাল কিনে ঘরে ফিরে। স্ত্রী রান্না করে, হৃদয়ে শোক নিয়ে সবাই খেতে বসে।

এর পরের চার রাত জেলে একই দৃশ্য দেখে। এবং সে চুপ থাকে, প্রতিবাদ করে না, সামনে এগোয় না। সে জানে যে নেকড়ের কোন মন নাই, না সে অধিকার বুঝে, না স্বাধীনতা বুঝে, না গণতন্ত্র বুঝে এবং পরের দিন ছয় সন্তান হারিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় জঙ্গল ত্যাগ করবে কিন্তু যেদিকে তাকায় জঙ্গল ছাড়া কিছু দেখে না। এরি মধ্যে সে দেখে বাঘ হরিণকে দৌড়ায়। কোন বাঘ গাছের আড়ালে ঝোঁপের এক পাশে লুকিয়ে থাকে।

সে আর জঙ্গল থেকে বের হতে পারে না। কারণ যতোদূর দৃষ্টি যায় সে জঙ্গলই দেখে এবং সে অপেক্ষা করে বাঘের খাদ্য হওয়ার।

 

শূন্যতা

দীর্ঘ পঁচানব্বই বছর আগের স্নিগ্ধ হাওয়ার বিকেলে শূন্যতা নত হয়ে শূন্য গলায় প্রেম নিবেদন করে বুকে টেনে নিল। আমি কংশ নদের অনুদ্ধত জলে তাকিয়ে শূন্যতাকে আলিঙ্গন করে নিলে জল হেসে অভিবাদন জানাল। আমি আর শূন্যতা এক সঙ্গে হাত উঁচু করে জলকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিই।
আমরা দু’জন পাশাপাশি হাঁটি। ছোট রাস্তা। দু’পাশে ছোট বড় অনেক রকম গাছ। শূন্যতা আমার হাত ধরে হঠাৎ বলল,-খুব খুশি লাগছে, তুমি খুশি হওনি? আমি তৎক্ষণাৎ বলি, -হ্যাঁ, খুব খুশি।
-‘তোমার মুখ শুকনো লাগছে যে!’
-‘পান খাইনি তো। পান না খেলে এমনই লাগে।’

শূন্যতা হেসে হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, পানে বেশ মানায় তোমাকে। সামনেই বাজার। তোমাকে পান খাওয়াব।’
আমরা হাঁটতে থাকি। সন্ধ্যা হয়ে গেলে শূন্যতা বলল,- ‘মানুষের মতো আমাদের ঘর নাই। আমরা এসো পৃথিবীতে বিলীন হয়ে যাই, যেন কেউ আমাদের না দ্যাখে।’
আমি বলি, ‘তাই হোক।’

শূন্যতা হঠাৎ মিলিয়ে গেল। ক্ষীণ গলায় বলল সে, ‘ভুল করে ফেলেছি, তোমার হাত ধরতে মনে নাই তাই সঙ্গে নিতে পারছি না আর। বিশ্বাস করো, কষ্ট হচ্ছে তোমাকে ছাড়া। তবে চিন্তে করো না, আমি আবার আসব। নিশ্চয় আসব। তোমাকে নিয়ে পৃথিবীতে মিলিয়ে যাবো।’
আমি বললাম,- ‘আচ্ছা।’
তারপর পঞ্চাশ বছর কেটে গেলো। শূন্যতা প্রতিদিন বিকেলে আসে। সঙ্গ দেয় আমাকে। হাত ধরে নদের পাড়ে হাঁটে। জড়িয়ে ধরে। চুমু দেয়। কিন্তু সে প্রতিদিন ব্যর্থ হয়। আমাকে সঙ্গে না নিয়েই মিলিয়ে যায়।
আমার মন্দ লাগে না। বিকেলটা বেশ কাটে।

 

আরো পড়ুন- অপরুপ দোজখ গল্প

ফলো করুন- সাহিত্য পত্রিকা