অমিতরূপ চক্রবর্তীর কবিতাগুচ্ছ

মৎসকন্যা

বাইরে কান্না পড়ছে। তত তীব্র নয় অবশ্য, কিছুটা মন্থর। আমাদের টিনের চাল তো, তাই সেই কান্নার আওয়াজ জোরে জোরে হয়। আমার মনে আছে তুমি একসময় এরকমভাবে কাঁদতে। আমি হাত মুঠো করে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত পায়চারি করতাম। যেন একটি অখ্যাত সার্কাস দলের মনিব। সম্বল তুমি, একটি চুমকি-খসা ঝালর আর ছিদ্র দিয়ে আকাশের বেঁটে, নাদুসনুদুস তারা দেখা যায়- এমন একটি তাঁবু। তুমি কাঁদছ। অনবরত দোল খেতে খেতে তোমার ঊরুর দিকটা কেমন মৎসকন্যার মতো লম্বা হয়ে গেছে। খাটের শেষে পুচ্ছটি বেরিয়ে ঝুলে আছে। আমি চকিতে তোমার এই মৎসকন্যার অবয়ব দেখে সেনেটরের মতো খানিকটা দুঃখ বোধ করি। কী আর করার আছে আমার? কীই-বা করার ছিল তোমার? হর্ষধ্বনির লোভ, করতালির লোভ বা অন্তরালে কিছুটা ভাল থাকার লোভ আমাকে তোমাকে এক আশ্চর্য শৃঙ্খলায় গেঁথে ফেলেছে কিনা বলো? বাইরে কান্না পড়ছে। যে দিন যায়, সে যাবার আগে তার দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। এখনও তোমার নিম্নাংশ মৎসকন্যার মতোই রয়ে গেছে। এই যে এখন তুমি আমোদপ্রিয় এক মহিলার মতো আয়নার কাছে বসে প্রসাধন করছ, চুলের গোছায় আটকে থাকা কবেকার ভাঙা নক্ষত্র, ভাঙা চাঁদের টুকরোগুলি বেছে বেছে ফেলে নিজেকে ক্রমাগত জীবনে ফেরাচ্ছ, ফেরানোর চেষ্টা করছ- সেও তো যে দিনগুলি চলে গেছে, বিদায়ের আগে তাদের আমাদের জন্য রেখে যাওয়া হিতাকাঙ্খা অথবা যে কথা নিরর্থক, তেমনই এক কথা। আমাকেই দ্যাখো, কীরকম ধীবর বস্তির মতো দূরে দূরে আলো জ্বেলে বেঁচে আছি। ঝুপরির ভেতরে ধারাল পাখির মতো কতরকম শিশুর চিৎকার, ধমক।

কখনো নিজের স্তিমিত গাল ঘষতে ঘষতে ভেবেছি নিজের চারিদিকে এই যে অ্যাতো জংগল, অ্যাতো বিষাক্ত গুল্ম লতিয়ে উঠেছে, এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াই ভাল। ভাবি, মনে মনে আঁটোসাটো পরিকল্পনা করে কোনোদিন তোমাকে অবাক, বিস্মিত করে ছেঁড়া, ধুলো জমা পুরনো কিংখাবটা পরে মজারুর মতো থপ থপ করে তোমার দিকে এগিয়ে আসব। তুমি অসন্তোষে ভুরু কোঁচকাবে। হিংস্র দাঁতে কিছু একটা বলে বাইরে গলমান পৃথিবীর দিকে তাকাবে। হিমবাহের মতো এই পৃথিবীও প্রতিদিনই কিছু না কিছু গলে। তার জল সমুদ্রে যায়। সমুদ্র আয়তনে, উচ্চতায় বাড়ে। তেমনই একটি গলমান পৃথিবীর দিকে তাকাবে। যেভাবে সচরাচর কেউ সমুদ্র ভাবে না, তেমনই তুমিও ভাববে না। শুধু গলমান পৃথিবীর দিকে তাকাবে। রাস্তা দিয়ে রাজযাত্রার মতো সভ্যতা পার হয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট সুখ-শান্তির মতো দোকানপাট। মানুষের হৃদয়, মানুষের রক্তমাংস আছে- তেমন সুন্দর মানুষ। দৈব আশীর্বাদের মতো তাদের গালে কোনো গাছের ছায়ার কলকা। তুমি বিষণ্ণ হবে। মুখ নীচু করে দেখে নেবে মৎসকন্যার মত তোমার নিম্নাংশ। পায়ের পাতার বদলে কী কষ্টে শুধু পুচ্ছের ওপরে দাঁড়িয়ে আছ! আমি জানি তোমার ভেতরে তখন বিদ্যুত ঝলসে ওঠে। এই নোনতা ঘরদুয়ার, এই কুণ্ঠিত কয়েকধাপ সিঁড়ি, অচল মুদ্রার মতো এই স্থলের সংসার, জাল তোমার অসহ্য লাগে। দ্যাখো তো, কীভাবে সভ্যতা চলেছে রণবাদ্য নিয়ে, জয়োল্লাস নিয়ে, উড়ন্ত নিশান নিয়ে! তোমারই এক টুকরো হয়তো অন্য টুকরোকে প্রশ্ন করে ‘কী পেলে?’ তুমি তর্জনি ঘুরিয়ে শুধু পেছনে উজবুকের মতো আমাকে দেখিয়ে দাও। হাঁদা এক জোকারের মতো আমাকে দেখিয়ে দাও।

আমি পুরনো সেই ছ্যাঁদাওলা তাঁবুর ভেতরে ফিরে গিয়ে আকাশে তাকিয়ে দেখি, সত্যিসত্যিই একটা নপুংসক চাঁদ আকাশের কুঁজে চড়ে কেমন গাধার মতো বসে আছে।

 

আরো পড়ুন- কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবিতে রীট দায়ের

 

এই অবধি এসে

এই অবধি এসে আমরা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করি। যেন দু’জনেরই গা থেকে বিশ্বস্ত বাকল খসে পড়েছে। চোখের আশেপাশে স্পর্ধা সরে গিয়ে এসেছে বিকেলের মতো মোম মোম রঙ। থুতনির ভাঁজ অনেকটা চিড়বিড়ে পতঙ্গের মতো। এ-সময় করতল মানুষের প্রয়োজন হয়। এ-সময় আঙুলের ভূমিকা পদ্মবসনা ঈশ্বরের মতো। আকাশে গুটিয়ে যাচ্ছে হিম কুড়োনোর দিন। এ-সময় নররক্তের লোভে বনটিয়ারা ঝাঁকে ঝাঁকে যুদ্ধবিমানের মতো উড়ে যায়। আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করি। বুঝি কী অপ্রয়োজনে আমরা আমাদের তুলনামূলকভাবে সাদা, মোটা ত্বকের করতল নিজেদের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছি। বহন করছি দৃশ্যমান আপাত কর্মঠ আঙুল। থুতনির ভাঁজ চিড়বিড়ে পতঙ্গের মতো গলা বেয়ে বুকে, নরম পাথরে নেমে আসে। দৃঢ় ঘাসে নেমে আসে। আমরা পরস্পর পরস্পরকে এড়াতে অন্যদিকে দেখি। দেখি উট অধ্যুষিত এক অঞ্চল। হলুদ পাথরের পাহাড়, সমতল। পিঙ্গল রঙের গাছ পাহারায় থাকা সৈনিকের মতো। এ দৃ্শ্য আমাদের ভাল লাগে না। যেন বাগদাদ বা সিরিয়ার সূর্যাস্তের ছবি। বারুদ উড়ছে, আমাদের দেশে যেমন বক ওড়ে বা তাড়ালে চড়ুইয়ের দল উড়ে যায়-সেরকম। মুখ ফেরাতেই আবার এ অন্যকে দেখে ফেলি। গাঢ় শ্যাওলার মতো মায়া হয়, কিন্তু তা তো বলাও যাবে না।

 

নির্ভরতার পাশে একটি ফুলদানি রাখা। তার অদূরে একটি কাচের জানালা। ছ’টা ফ্রেমে ভাগ করা। সেই জানালা দিয়ে তৃপ্ত মানুষের বেড়াতে যাবার রাস্তা আর রাস্তার মেটে, ধূসর সব ফলকগুলি দেখা যাচ্ছে। এমন একটি ঘরের দরজায় তেলতেলে কাঠের কারুকাজ। হয়তো এককালীন মুগ্ধতার মতো একটুকরো বারান্দা, তাতে সিঁড়ির প্রলেপ। আমরা কি এমনই কোনো সীমানায়, দরজার কাছে পৌঁছতে চাই? তৃপ্ত মানুষের বেড়াতে যাবার রাস্তাটি এগিয়ে গিয়ে ডাইনে বেঁকে আড়াল হয়েছে। আড়াল হলেও অনুমান করা যায় রাস্তাটি কীভাবে, কতদূর যেতে পারে। ঘরে দেওয়ালে টিকটিকির মতো স্থির হয়ে থেকে এমন রাস্তা, পথচারী তৃপ্ত মানুষের ঢল দেখাও তো শান্তির, বিস্ময়ের। আমরা যা পারিনি, অন্যেরা তা পারছে। করতলে মুঠো করে ধরে ধরে আছে অন্য কঠোর হাত। আঙুল চেপে বসেছে পিচ্ছিল কিলবিলে সাপের মতো শিরা-উপশিরায়। আশেপাশে অন্যান্য বাড়িগুলির তলপেট, কখনও বা ফাট ধরা মেদ। মৃদু ঝাঁঝালো গন্ধ। বোঝা যায় ওরা সব সন্তানবতী। অন্ধকারে দ্যুতিমান মধুকূপী ঘাসের জংগল। এরা কেউ উট অধ্যুষিত অঞ্চল দেখেনি। হলুদ পাথরের পাহাড় সমতল দেখেনি। নয়ন নামের কোনো কাকতাড়ুয়া এখনও স্মৃতির ভেতরে একটি মাঠে দু’দিকে দু’হাত মেলে হয়তো বহু আলোকবর্ষ দাঁড়িয়ে আছে।  ঠোঁটে আকর্ণ মৃত আনন্দের অমলিন হাসি।

 

আমরা গোপন করি যেসব বাকল আমাদের গা থেকে ক্রমাগত খুলে, খসে পড়ে যায়।

 

শাসক

আমার মুখ তুমি শুঁকে দ্যাখো সেখানে অন্য আনন্দের গন্ধ আছে কি না। অন্য আনন্দের গন্ধ অথবা অন্য আত্মার গন্ধ অথবা অন্য বাস্তবের গন্ধ। তুমি আমার মুখে অত্যন্ত গাঢ় হয়ে এসে শুঁকে দ্যাখো। পুরোনো সৌধের মতো আমি দাঁড়িয়ে থাকি। যেন এমনই নিয়ম, যেন এমনই সব খানা-তল্লাশির পরে তবেই মলিন উর্দিটি ফিরে পাওয়া যায়, তবেই বিকট সরীসৃপের মতো হাত-পায়ের শৃঙ্খল ফিরে পাওয়া যায়। খোলা ছাতার মতো প্রকট কঙ্কালটি খুঁজে পাওয়া যায়। শঙ্কু আকৃতির আকাশে তখন অজস্র বেপরোয়া তারার সমারোহ। অতিকায় ছনের বেড়ার মতো সব প্রচ্ছন্ন গাছপালা। অন্য আনন্দের গন্ধ বা অন্য আত্মার গন্ধ বুঝি খুব ভয়াবহ, খুব কটু। আমি যখন যে জলধারা আমার আদেশমাত্রই কলহাস্য করতে করতে মুক্তির আবেগে একটি মেঘভারাক্রান্ত বালতি কিম্বা একটি আতুর মগকে উতক্ত্য করবে- সেই জলধারার দিকে এগিয়ে যাই, তুমি সপ্রশ্ন মুখে তখনো দরজার আবছায়ার নীচে নিঃশব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। আমাদের চতুর্পাশ্বে অনেক অনেক শুকনো পাতার বালিয়ারি। কখনো অস্তাচলে যায় না এমন একফালি বহুদূরের উৎস থেকে ভেসে আসা নরম অবসন্ন রোদ। এই বাস্তবে আমার কালো সুতোর মতো শরীরটি শুধু রকমারি গুমোটকে অতিক্রম করে করে যাবে। নতুন স্বাদের একটি বুনো মৈথুনের জন্য পাণিপ্রার্থী হবে। তাই না, এমনই নয় কি না বলো? তুমি আমার অন্তরাত্মা অবধি দেখতে পাও, তুমি আমার নুড়িপাথর আর বিষাক্ত কাঁকড়া অবধি দেখতে পাও, জলজ শ্যাওলা অবধি দেখতে পাও।

দৈবত্ব প্রাপ্ত হয়েই যেন ফিরে আসি। এই বাস্তবে দৈবত্ব ছাড়া, ক্রমাগত সুগন্ধি দাসত্ব ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই। মুহূর্তে মুহূর্তে রূপ বদলানো ছাড়া ভাবো তো, সত্যিই তেমন অন্যকিছুর উপযোগিতা আছে? একটি ঘি রঙের তুলতুলে নরম কুকুরের মতো আমি যখন কুঁইকুঁই করে দু’পা তুলে কৌচের কোনায় গিয়ে বসব, তখনই আমার জন্য একপ্রস্থ সৌম্য জলখাবার আসবে। তোমার কিছু গাল বা নাসাদেশীয় রোমও আসবে। কিম্বা আমি যখন একদল পতঙ্গ হয়ে উড়তে থাকব এই হৃদয়ে কঠিন দেওয়ালগুলির কাছে অথবা বীভৎস সবুজ মুখোসের মতো আলোগুলির কাছে, তখন আমার জন্য এবং আমাদের জন্য প্রচণ্ড শান্তির একঝলক বাতাস বয়ে যাবে। এই কঠোর দৈবত্ব ছাড়া আর কিছু কি অর্থবহ আছে বলো? এই যে আমাদের চতুর্পাশ্বে অনেক অনেক শুকনো পাতার বালিয়ারির পর বালিয়ারি, কখনো অস্তাচলে যায় না এমন একফালি বহুদূরের উৎস থেকে ভেসে আসা নরম অবসন্ন রোদ- এই বাস্তবে? এমন রক্তগোধুলির মতো শাসনে? রাজত্বে? আমি জানি আমার মুখ শুঁকে তুমি যদি কখনো অন্য আনন্দের গন্ধ পাও অথবা অন্য আত্মার গন্ধ পাও অথবা অন্য বাস্তবতার গন্ধ পাও, সেদিন আর আমি আমার ছেঁড়া মলিন উর্দিটি ফিরে পাব না। বিকট সরীসৃপের মতো হাত-পায়ের শৃঙ্খল ফিরে পাব না। খোলা ছাতার মতো প্রকট কঙ্কালটি খুঁজে পাব না। রূপবদল করতে চাইলেও দেখা যাবে প্রতিবার ব্যর্থ হয়ে নির্বোধের মতো কেবলই হেসে উঠছি। ভেজা বারুদের মতো কেবলই হেসে হেসে উঠছি।

 

শিশু

তোমাকে আঁকড়ে ধরে শিশুর মতো ঘুমোব। কী দৈত্যাকার সব স্বপ্ন! কী দৈত্যাকার সব গাছ আকাশ থেকে নেমে নরম জংগল তৈরি করেছে! সেখানে কী অফুরন্ত ভয়াল ভয়াল ফুল! ভোরবেলা জানালা ছাড়িয়ে এই একটুকরো সূর্য শুধু। ঠাণ্ডা ফয়েলের মতো বাতাস কেমন নির্মমভাবে নিরীহ পর্দাগুলিকে ফালাফালা করে উড়িয়ে দেয়। দেওয়ালে যে বুদ্ধ চোখ বুজে আছে, তাঁর চোখ সহসাই কী রক্তিম হয়ে খুলে যায়। তাঁর গোঁফের রেখা ঘন, আরও ঘন হয়ে ওঠে। পৃথিবীকে ক্ষুদ্র দানার মতো আঙুলে বসিয়ে মুখের খুব কাছে নিয়ে আসে কারা? তাদের গায়ে কী রঙের জামাকাপড়? ভগবান করুক, আর যেন কোনো প্রবল ঝোড়ো হাওয়া আমাদের ওপর দিয়ে বয়ে না যায়। হাওয়াকে অনুসরণ করে যেসব নির্ভার পাথরগুলো উড়তে উড়তে আসে, তারা যেন না আসে। আমার শিশ্ন ছুঁয়ে দ্যাখো কী কোমল, কী কোমল যেন মরমে মরে আছে! আমার বাহু ধরো, দেখবে ক্ষীণ কয়েকপরত পেশীই শুধু বেয়াদপের মতো টান হয়ে আছে। আমার মাথায় হাত রাখো, দেখবে চুলের শেষাংশই শুধু তীক্ষ্ণকায়। পৃথিবীকে যারা অতি যত্নে আঙুলে বসিয়ে মুখের খুব কাছে এনে শুঁকে দ্যাখে, তারপর হলুদ শ্বদন্ত বের করে এ অন্যের দিকে তাকিয়ে পাঁজর ফাটিয়ে হেসে ওঠে- তারা চায় লম্বা সুতোয় আর যেন চাঁদ ঝুলে না পড়ে এই মল-মূত্রে ভরা জগতের ওপর। ধারালো আনন্দের মতো যাতে চিকচিক না করে ওঠে অন্ধকার পেরোনো নদীর জল।

আমার শিশ্ন ছুঁয়ে দ্যাখো কী কোমল, কী কোমল যেন মরমে মরে আছে! কিন্তু তবুও আমি তোমার অপরিচিত নই। আমার খুলির মোড়ক হরিনাম সংকীর্তনে বসা মানুষের মতো হলেও আমি একটি নক্ষত্র থেকে আরেকটি নক্ষত্রের ব্যবধান লক্ষ্য করতে করতে পেচ্ছাপ করি। কূট অভিসন্ধির তাড়নায় ভাবি, আহ এখন যদি কয়েকটি বাঘ প্রত্যেকটি গাঢ় শোবার ঘরে এসে গর্জন করত! সবাই কি মেনে নিত বাঘের বিস্রস্ত গন্ধ? আমি তোমার অপরিচিত নই। এই ভাবনা, এই কূটের আবর্ত, এই নীরব স্পর্শাতীত নক্ষত্রের সমাবেশ তো তাই-ই প্রমাণ করে। যারা পৃথিবীকে আঙুলে বসিয়ে মুখের খুব কাছে এনে শুঁকে দ্যাখে, তারা ঈশ্বরের অধিক ঈশ্বর হয়তো। তাদের ভারী অলংকার, তাদের জুতোর মসমস কিম্বা তাদের অধীনস্ত ঘোড়া এই মল-মূত্রে ভরা জগতের কেউ নয়। বসন একটু ঢিলে করে দিলে, পেছন থেকে নিঃশব্দে এসে আমার পিঠে মুখ ঠেকিয়ে রাখলে বা আমার চোখে তোমার দ্যুতিময় চোখ রাখলে এখনো সব রহস্য কেমন মুহূর্তে সরল হয়ে যায়। কেমন ভয়মুক্ত হয়ে বলা যায় ‘চলো আজ খাওয়াদাওয়া সেরে বারান্দায় একটু বসি। হ্যাঁ, ওই দুটো বেতের চেয়ারে। না না, বেড়ালটিকে তাড়িয়ে দিও না। ও হয়তো আস্তাকুড়ের দিকে যাচ্ছে। দ্যাখো, এইসব দৈতাকার গাছগুলিকে কেমন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরা লতার মতো লাগছে! নরম যে জংগল, তা তোমার অত্যন্ত গভীর নন্দিত দুই স্তনের মতোই’।

শিস

চশমার ওপারে তোমার চোখ। কিছুটা পাথরের, কিছুটা কাচের। তারও পেছনে ফাঁকা প্রান্তর। যুদ্ধ করতে আসা সৈনিকের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা খর, নিষ্পত্র সব গাছ। আকাশ পেরিয়ে গিয়ে ডুবে যাবার আগে শেষবার ভীষণ উচ্ছ্বসিত সূর্য। যেন স্থুল স্তন আর ভারী গহনার ওপরে কণ্ঠস্বর তুলে বাকি পৃথিবীকে বলছে ভাল থাকার কথা। আমি দৃষ্টি সরিয়ে আনি। চশমার ওপারে তোমার চোখ। কিছুটা পাথরের, কিছুটা কাচের। দলে দলে কুমারী হরিণ এ-সময় লতাপাতা ভেঙে দৌড়য়। আনন্দে, হর্ষে দৌড়য়। উঁচু নীচু ভূমি ছুঁয়ে দৌড়য়। ওদের পেছনে কোনো শিকারি থাকে না, হিংস্র গর্জন থাকে না। কখনো এমন স্বচ্ছ হলুদ মণির মতো দ্যুতিময় মুহূর্ত আসে তোমার আমার। আবার নতুন করে সাক্ষাৎ হয়। তোমার আমার মধ্যে অলীক একটি মোম শিহরিত হয়ে হয়ে জ্বলে। ‘কী যে বলব, বুঝতে পারছি না।‘ তুমি অনেক দ্বিধার জাল, মৃত শঙ্খের জাল দুলিয়ে, নাড়িয়ে দিয়ে বলো। আমি তখন পায়ে পায়ে তোমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শাণিত একটি ছুরি মুঠোয় লুকিয়ে তোমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

আহ, এ-সময় মোমের শিখাটি দপদপ করে। সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড থেকে অসংখ্য কর্মব্যস্ত কঙ্কাল একযোগে আমাদের দিকে ঘুরে তাকায়। তোমার একফালি চুল হয়তো-বা বিষয়টি বুঝতে পেরে তোমার গালে এসে পড়ে। আমার ভেতরে তখন থিকথিক করে রাত। দলে দলে কুমারী হরিণ এ-সময় লতাপাতা ভেঙে, আমাকে ভেঙে সশব্দে ভেঙে দৌড়য়। রাষ্ট্র নামক এক অনুপম প্রাসাদে তখন আলো। মহার্ঘ মানুষের কথায়, ঠাট্টায় সে-প্রাসাদের উঁচু উঁচু বারান্দাগুলি গমগম করে। তুমি এ-সব বোঝো না। শুধু আঙুলে কাল্পনিক আংটি ঘোরাতে ঘোরাতে মন্থর ধোঁয়ার মতো বলো ‘কীভাবে ফের আবার আমাদের দেখা হয়ে গ্যালো। কতকিছু আজ আবার মনে পড়ে যাচ্ছে। কী অসভ্যের মতো তুমি ডান ঊরুতে উল্কি আঁকিয়েছিলে। আমার এখনো ভাবলে হাসি পায়। সেটা ছিল কি না এক বিপ্লবীর মুখ!’ আহ, এমন স্বচ্ছ হলুদ মণির মতো দ্যুতিময় মুহূর্ত কখনো আসে তোমার আমার। বাইরে শিস বাজিয়ে বৃষ্টি হতে থাকে। তোমার মুখ দিয়ে তোমার পূর্বপুরুষেরা কথা বলতে থাকেন। আমার অন্ধকারে আমার পূর্বপুরুষেরা ।

*অমিতরূপ চক্রবর্তী: আলিপুরদুয়ার, পশ্চিমবঙ্গ।  

ফেসবুকে ফলো করুন- দিব্যপাঠ সাহিত্য পত্রিকা